নির্বাচন যত ঘনিয়ে আসছে, ততই বাড়ছে নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ। এরই মধ্যে সীমান্ত দিয়ে অবৈধ অস্ত্র প্রবেশের তথ্য সামনে আসছে, যা নির্বাচনী সহিংসতায় ব্যবহারের শঙ্কা তৈরি করেছে। অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, সীমান্ত পেরিয়ে আসা এসব আগ্নেয়াস্ত্র চক্রের মাধ্যমে হাতবদল হয়ে চট্টগ্রাম, ঢাকা ও দেশের বিভিন্ন এলাকায় অপরাধীদের হাতে পৌঁছাচ্ছে।
নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের মতে, ২০২৪ সালের গণ-অভ্যুত্থানে বিভিন্ন থানা থেকে লুট হওয়া অস্ত্র এবং সীমান্ত দিয়ে আসা আগ্নেয়াস্ত্র আসন্ন নির্বাচনে সহিংসতার ঝুঁকি বাড়াচ্ছে। চোরাচালানের রুট বন্ধ না হলে নির্বাচন ঘিরে নিরাপত্তাহীন পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে বলে তারা সতর্ক করেছেন।
শরীফ ওসমান হাদি হত্যা, মুসাব্বির হত্যাসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় সংঘটিত অন্তত এক ডজন হত্যাকাণ্ড বিশ্লেষণে দেখা গেছে, এসব ঘটনায় আগ্নেয়াস্ত্র ব্যবহার করা হয়েছে। হত্যাকাণ্ডের পেছনে রাজনৈতিক বিরোধ, আধিপত্য বিস্তার কিংবা দখল-বাণিজ্যের মতো ভিন্ন ভিন্ন কারণ থাকলেও অস্ত্রের উৎস প্রায় একই। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর উদ্ধার করা অস্ত্রের বড় অংশই বিদেশি পিস্তল ও রিভলভার।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও বিভিন্ন সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, দেশে প্রবেশ করা বেশিরভাগ অস্ত্রই সীমান্ত দিয়ে আসছে। নির্দিষ্ট রুটের সঠিক হিসাব না থাকলেও রাজশাহী, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, জয়পুরহাট, দিনাজপুর, নওগাঁ, যশোর, কুষ্টিয়া, সিলেট ও সুন্দরবন এলাকা দিয়ে অস্ত্র প্রবেশের তথ্য পাওয়া গেছে। তবে সবচেয়ে বেশি অস্ত্র ঢোকার তথ্য মিলছে মিয়ানমার সীমান্ত দিয়ে।
বাংলাদেশ-মিয়ানমার সীমান্ত মূলত নাফ নদী, পাহাড় ও জঙ্গলবেষ্টিত এলাকা নিয়ে গঠিত, যার বেশ কয়েকটি অংশ অরক্ষিত। সীমান্ত এলাকায় বিজিবির টহল জোরদার থাকলেও অস্ত্র চোরাচালান পুরোপুরি বন্ধ করা যাচ্ছে না বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানিয়েছে।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে একটি সূত্র জানায়, ঈদগড়, বাইশফাঁড়ি, নাইক্ষ্যংছড়ি, ফুলছড়ি, সোনাইছড়ি ও বালুছড়ি সীমান্ত দিয়ে অস্ত্র ঢুকছে। জি-৩, জি-৪ ও চীনা তৈরি অস্ত্র মিয়ানমার থেকে রোহিঙ্গাদের মাধ্যমে দেশে আসে এবং পরে ঢাকা, চট্টগ্রাম ও আশপাশের এলাকায় পাচার করা হয়।
মাঠপর্যায়ের অনুসন্ধানে বান্দরবানের নাইক্ষ্যংছড়ি সীমান্ত এলাকায় অস্ত্র চোরাচালান চক্রের সদস্যদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, সীমান্তে কড়াকড়ি থাকায় চক্রগুলো আরও গোপনে কাজ করছে। চীন, ভারত, থাইল্যান্ড ও মিয়ানমারের তৈরি অস্ত্র এসব পথে দেশে ঢুকছে বলে তারা দাবি করেন।
চক্রের কয়েকজন সদস্য জানিয়েছেন, মামলার বোঝা মাথায় নিয়েই তারা এই কাজে জড়িত। তবে সুযোগ পেলে স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে চান বলে তারা জানান।
নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের মতে, ভারত ও মিয়ানমার সীমান্ত মিলিয়ে প্রায় ৩৬টি সন্ত্রাসী গ্রুপ সক্রিয় রয়েছে। বাংলাদেশ-মিয়ানমার সীমান্তের ২৭১ কিলোমিটারের অন্তত ১৪টি রুট দিয়ে অস্ত্র প্রবেশ করছে, যার বেশিরভাগই কার্যকর নজরদারির বাইরে। এসব চোরাচালানে জড়িত প্রায় ১০টি গ্রুপ সক্রিয়, যাদের বড় অংশ রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর বলে জানা গেছে।
বিজিবির তথ্য অনুযায়ী, গত বছরের প্রথম নয় মাসে দেশের বিভিন্ন সীমান্ত এলাকা থেকে দেশি-বিদেশি মিলিয়ে এক হাজার ২০০টির বেশি আগ্নেয়াস্ত্র জব্দ করা হয়েছে। সাম্প্রতিক অভিযানেও মিয়ানমার সীমান্ত এলাকায় অস্ত্র উদ্ধার অব্যাহত রয়েছে।
অস্ত্র চোরাচালান রোধে চ্যালেঞ্জের কথা তুলে ধরে কক্সবাজার ব্যাটালিয়ন (৩৪ বিজিবি) অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল এস এম খায়রুল আলম বলেন, মিয়ানমার সীমান্ত একটি জটিল এলাকা। সেখানে নন-স্টেট অ্যাক্টর সক্রিয় থাকায় নিয়মিত যোগাযোগ ও সমন্বয় করা কঠিন, যা চোরাচালান প্রতিরোধে বড় বাধা।
নিরাপত্তা বিশ্লেষক লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) ড. মোহাম্মাদ মাহফুজুর রহমান বলেন, সীমান্তে কার্যকর নিরাপত্তা বলয় গড়ে তোলা না গেলে আসন্ন নির্বাচনে বিশৃঙ্খলা ও অস্ত্রের ব্যবহার বাড়তে পারে।







