পুলিশ কর্মকর্তার সামনে দাঁড়িয়ে কাঁদছিলেন এক তরুণ। জিজ্ঞাসাবাদের মুখে বলছিলেন, তিনি কিছুই জানেন না। একপর্যায়ে কর্মকর্তার পায়ে ধরার চেষ্টা করেন। আরেক ঘটনায়, এক তরুণ শুধু জানতে চেয়েছিলেন ঘটনা কী? উত্তরে নেমে আসে লাঠির আঘাত। মুহূর্তেই মাটিতে লুটিয়ে পড়েন তিনি।
উপস্থিত কয়েকজনের ধারণ করা এমন দুটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। ভিডিও দুটি ২৩ ফেব্রুয়ারি সোহরাওয়ার্দী উদ্যান এ পুলিশের মাদকবিরোধী অভিযানের। অভিযানে নেতৃত্ব দেন রমনা বিভাগের উপকমিশনার (ডিসি) মো. মাসুদ আলম।
ঘটনার পর প্রশ্ন উঠেছে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ ও প্রমাণ ছাড়া মাদকবিরোধী অভিযানের নামে পুলিশ কি কাউকে আটক, হয়রানি বা মারধর করতে পারে?
আইনজীবীর বক্তব্য: “লাঠি দিয়ে আঘাত করা অপরাধ”
সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী সারা হোসেনের মতে,
“পুলিশ কাউকে মারধর করতে পারে না। লাঠি দিয়ে আঘাত করা অপরাধ। যার অপরাধ চিহ্নিত হয়নি, তাকে আটক করা যায় না। এখানে পুলিশের আত্মরক্ষার কোনো বিষয়ও ছিল না। পুলিশ মানেই কথায় কথায় মারতে পারেন এমন নয়।”
অন্যদিকে, ডিসি মো. মাসুদ আলম প্রথম আলোকে বলেন,
“পুলিশ মারতে পারে না, আমরাও মারতে চাই না। কিন্তু কেউ আইন ভাঙলে দু-একটা বাড়ি না মারলে ভয় পায় না। পুলিশ গায়ে হাত দিয়ে বুঝিয়ে কথা বললে পরদিন মাদক ব্যবসায়ী ও সেবীরা আবার চলে আসবে। তারা ভাববে, পুলিশ কিছুই করে না।”
তিনি আরও দাবি করেন, অভিযানে গেলে অনেক সময় অস্বাভাবিক পরিস্থিতি তৈরি হয়। তাঁর ভাষ্য,
“মাদক বিক্রেতাদের মাধ্যমে কম বয়সী মেয়েরা মাদক এনে বিক্রি করে। অভিযান চালালে হামলার ঘটনাও ঘটে। কেউ আটক এড়াতে কাপড় খুলে ফেলে, কেউ নিজেদের বাচ্চার গলায় ছুরি ধরে পরিস্থিতি জটিল করে।”
শিক্ষামন্ত্রীর বক্তব্য ও চাঁদপুরে অভিযান
নবনির্বাচিত সরকারের শিক্ষামন্ত্রী এহছানুল হক (চাঁদপুর-১ আসনের সংসদ সদস্য) গত শুক্রবার চাঁদপুরের কচুয়া উপজেলা পরিষদ মিলনায়তনে প্রশাসনের কর্মকর্তাদের সঙ্গে মতবিনিময় সভায় বলেন,
রাতে কিশোরেরা অযাচিতভাবে ঘোরাফেরা করে; জানতে চাইলে তারা ‘মব অ্যাটাক’ করে।
তিনি ঘোষণা দেন, কচুয়া থেকে যেমন নকলমুক্ত কার্যক্রম শুরু হয়েছে, তেমনি মাদকমুক্ত কার্যক্রমও সেখান থেকেই শুরু হবে।
এরপর রোববার চাঁদপুরে অভিযানে ২১ জনকে আটক করা হয়, যাঁদের মধ্যে অন্তত ১২ জন কিশোর। একই সময়ে রাজধানীর ধানমন্ডি ৩২ নম্বর ও সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে অভিযানের সময় কয়েকজনকে হেনস্তার অভিযোগ ওঠে।
২৩ ফেব্রুয়ারি সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে ডিসি মাসুদ আলমের সঙ্গে তর্কে জড়ানোর পর পুলিশের মারধরের শিকার হন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়–এর এক শিক্ষার্থী। ঘটনার প্রতিবাদে শিক্ষার্থীরা রাজু ভাস্কর্যের সামনে মানববন্ধন ও শাহবাগ থানার সামনে অবস্থান কর্মসূচি পালন করেন। তাঁরা সংশ্লিষ্ট পুলিশ সদস্যদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থাসহ তিন দফা দাবি জানান।
নাগরিক উদ্বেগ
নতুন রাজনৈতিক প্ল্যাটফর্ম নেটওয়ার্ক ফর পিপলস অ্যাকশন (এনপিএ) এর মুখপাত্র ফেরদৌস আরা রুমী বলেন, তাঁর নিজের ২০ বছর বয়সী ছেলে রয়েছে। পুলিশের এভাবে বিনা কারণে কিশোর-তরুণদের আটক ও হেনস্তার ঘটনায় তিনি উদ্বিগ্ন।
তার ভাষায়,
“মাদকবিরোধী অভিযান চালিয়ে জননিরাপত্তা নিশ্চিত করা পুলিশের দায়িত্ব। কিন্তু প্রমাণ ছাড়া আটক বা মারধর করার অধিকার নেই। জনসাধারণের জন্য উন্মুক্ত স্থানে এমন ঘটনা উদ্বেগজনক।”
ডিসি মাসুদ আলম জানান, শিক্ষামন্ত্রীর বক্তব্যের আগেই তাঁরা নিয়মিত অভিযান চালাচ্ছেন। গত দুই মাসে অন্তত ১০০ জন মাদক বিক্রেতাকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে, যাঁদের মধ্যে নারীর সংখ্যা বেশি। নির্বাচনের সময় অভিযানে ছেদ পড়ায় পরিস্থিতি খারাপ হয়েছে বলে দাবি তাঁর।
কোন আইনে কতটা ক্ষমতা?
ডিসি মাসুদ আলমের বক্তব্য অনুযায়ী, ফৌজদারি কার্যবিধি (সিআরপিসি) ১৮৯৮, দণ্ডবিধি ১৮৬০ ও সাক্ষ্য আইন ১৮৭২–সহ বিভিন্ন আইনের আওতায় সন্দেহভাজন ব্যক্তিকে তল্লাশি ও আটক করার ক্ষমতা পুলিশের আছে।
তবে সংবিধান ও অন্যান্য আইন কী বলছে?
সংবিধান
বাংলাদেশের সংবিধান এর ৩৫(৫) অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে কাউকে যন্ত্রণা দেওয়া যাবে না কিংবা নিষ্ঠুর, অমানবিক বা লাঞ্ছনাকর দণ্ড দেওয়া যাবে না।
নির্যাতনবিরোধী আইন
জাতিসংঘ সনদের আলোকে প্রণীত নির্যাতন এবং হেফাজতে মৃত্যু (নিবারণ) আইন, ২০১৩ এর ৫ ধারায় বলা হয়েছে, সংক্ষুব্ধ ব্যক্তি চাইলে সরাসরি আদালতে আবেদন করতে পারেন, যদি তিনি মনে করেন পুলিশের মাধ্যমে সুষ্ঠু তদন্ত সম্ভব নয়।
মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইন, ২০১৮
এই আইনের ২১ ধারায় বলা হয়েছে, কোনো ক্ষমতাপ্রাপ্ত কর্মকর্তা যুক্তিসংগত বিশ্বাসের ভিত্তিতে প্রকাশ্য স্থানে বা যানবাহনে তল্লাশি করতে পারেন তবে কারণ লিপিবদ্ধ করতে হবে। সন্দেহভাজন ব্যক্তিকে আটক করলেও তার পেছনে যুক্তিসংগত কারণ থাকতে হবে।
অর্থাৎ, যেকোনো ব্যক্তিকে যখন-তখন তল্লাশি বা আটক করার অবাধ ক্ষমতা আইনে নেই।
বিতর্কিত ধারার ব্যবহার
ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ অধ্যাদেশ, ১৯৭৬ এর ৮৬ ধারা অনুযায়ী সূর্যাস্ত থেকে সূর্যোদয়ের মধ্যে সন্দেহভাজন মনে হলে পুলিশ কাউকে আটক করতে পারে। তবে ২০০৪ সালে প্রয়াত অ্যাটর্নি জেনারেল হাসান আরিফ এই ধারার বৈধতা চ্যালেঞ্জ করেন। হাইকোর্ট ৮৬ ধারায় গ্রেপ্তারে নিষেধাজ্ঞা দেন। পরে সরকার আপিল করে; বিষয়টি এখনো বিচারাধীন।
এ ছাড়া ভবঘুরে ও নিরাশ্রয় ব্যক্তি (পুনর্বাসন) আইন, ২০১১ প্রয়োগ নিয়েও সমালোচনা রয়েছে।
ফৌজদারি কার্যবিধির ৫৪ ধারায় পরোয়ানা ছাড়া গ্রেপ্তারের সুযোগ থাকলেও ‘যুক্তিসংগত কারণ’ থাকার শর্ত রয়েছে। ৪৬ থেকে ৫৩ ধারায় গ্রেপ্তারের প্রক্রিয়া নির্ধারণ করে অপ্রয়োজনীয় বলপ্রয়োগ নিষিদ্ধ করা হয়েছে এবং গ্রেপ্তার ব্যক্তির অধিকার সুরক্ষার কথা বলা হয়েছে।
ক্ষমতার সীমা কোথায়?
আইনবিশেষজ্ঞদের মতে, প্রচলিত কোনো আইনেই পুলিশকে ‘যেকোনো সময়, যেকোনো ব্যক্তিকে’ আটক বা মারধরের অবাধ ক্ষমতা দেওয়া হয়নি।
মাদকবিরোধী অভিযান জননিরাপত্তার জন্য জরুরি তবে সেই অভিযানে আইনের সীমা অতিক্রম করা হলে প্রশ্ন উঠবে।
সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের ঘটনার পর সেই প্রশ্নই এখন জনমনে আইন প্রয়োগের নামে কি মানবাধিকার লঙ্ঘন হচ্ছে? নাকি কঠোরতা ছাড়া অপরাধ দমন সম্ভব নয়?
বিতর্কের কেন্দ্রে তাই একটিই প্রশ্ন: আইন প্রয়োগের সীমারেখা কোথায় টানা হবে?







