দেশের বেসরকারি ব্যাংকিং খাতে দীর্ঘদিন ধরে আলোচিত একটি নাম ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ লিমিটেড। প্রতিষ্ঠানটির নিয়োগ প্রক্রিয়া, মালিকানা প্রভাব এবং আর্থিক অনিয়ম নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠছে। সংশ্লিষ্টদের দাবি, অতীতে গড়ে ওঠা একটি প্রভাবশালী ‘নিয়োগ সিন্ডিকেট’ আবারও সক্রিয় হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে মোট কর্মকর্তা-কর্মচারীর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে প্রায় ২১ হাজার। এর মধ্যে ২০১৭ সাল থেকে ২০২৪ সালের আগস্ট পর্যন্ত নিয়োগ দেওয়া হয় প্রায় ১১ হাজার জনকে যা মোট জনবলের অর্ধেকেরও বেশি।
অভিযোগ রয়েছে, এই নিয়োগের বড় একটি অংশই হয়েছে কোনো ধরনের নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ, লিখিত পরীক্ষা বা মৌখিক যাচাই ছাড়াই। এমনকি অনেক ক্ষেত্রে শিক্ষাগত যোগ্যতা ও সার্টিফিকেট যাচাই-বাছাইও হয়নি বলে অভিযোগ রয়েছে।
নিয়োগের ক্ষেত্রে ভৌগোলিক বৈষম্যও স্পষ্টভাবে উঠে এসেছে। মোট নিয়োগপ্রাপ্তদের মধ্যে ৭ হাজার ২২৪ জনই চট্টগ্রাম অঞ্চলের। এর মধ্যে ৪ হাজার ৫২৪ জনই একটি নির্দিষ্ট উপজেলা পটিয়ার বাসিন্দা।
এই পটিয়াই এস আলম গ্রুপের চেয়ারম্যান সাইফুল আলম-এর নিজ এলাকা হিসেবে পরিচিত। ফলে নিয়োগ প্রক্রিয়ায় পক্ষপাতিত্ব ও স্বজনপ্রীতির অভিযোগ আরও জোরালো হয়েছে।
ব্যাংক খাত সংশ্লিষ্টদের মতে, এই নিয়োগ কেবল কর্মসংস্থান সৃষ্টির উদ্দেশ্যে ছিল না। বরং এর মাধ্যমে একটি শক্তিশালী ‘অনুগত বলয়’ তৈরি করা হয়, যারা প্রশাসনিক ও আর্থিক সিদ্ধান্তে নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর প্রভাব নিশ্চিত করে।
অভিযোগ রয়েছে, এই কর্মীদের একটি অংশকে ব্যবহার করে ব্যাংকের অভ্যন্তরীণ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা দুর্বল করা হয়। ফলে ঋণ অনুমোদন, অর্থ স্থানান্তর ও বিভিন্ন আর্থিক কার্যক্রমে অনিয়মের সুযোগ তৈরি হয়।
শুধু ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ লিমিটেড-ই নয়, এস আলম গ্রুপের প্রভাবাধীন আরও কয়েকটি ব্যাংকেও একই ধরনের নিয়োগ প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। এসব ব্যাংকে প্রায় ২০ হাজার লোককে একইভাবে নিয়োগ দেওয়া হয়।
বিশ্লেষকদের মতে, এর ফলে একটি বৃহৎ নেটওয়ার্ক তৈরি হয়, যা ব্যাংকিং খাতের একটি অংশে একক প্রভাব প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হয়।
অভিযোগ রয়েছে, তৎকালীন সরকারের সময় গোয়েন্দা সংস্থার সহায়তায় এস আলম গ্রুপ ধীরে ধীরে কয়েকটি ব্যাংকের নিয়ন্ত্রণ নেয়। এরপরই শুরু হয় এই গণহারে নিয়োগ কার্যক্রম। এই প্রক্রিয়ার মাধ্যমে ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ ও ব্যবস্থাপনায় প্রভাব বিস্তার করা সহজ হয় বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
ব্যাংক সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন সূত্রের দাবি, এই নিয়োগপ্রাপ্তদের একটি অংশকে ব্যবহার করে হাজার হাজার কোটি টাকা ঋণ হিসেবে বিতরণ করা হয়, যার বড় অংশই পরে খেলাপি হয়ে যায় বা ফেরত আসেনি।
অভিযোগ রয়েছে, নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর সঙ্গে যোগসাজশের মাধ্যমে এসব অর্থ স্থানান্তর করা হয়। ফলে ব্যাংকের আর্থিক ভিত্তি দুর্বল হয়ে পড়ে এবং আমানতকারীদের আস্থায় ধাক্কা লাগে।
সাম্প্রতিক সময়ে আবারও এই নিয়োগপ্রাপ্তদের ঘিরে নানা আলোচনা শুরু হয়েছে। কেউ কেউ আশঙ্কা করছেন, অতীতের সেই প্রভাবশালী বলয়কে পুনরায় সক্রিয় বা পুনর্বহালের চেষ্টা চলছে।
যদিও এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে কিছু জানায়নি, তবে বিষয়টি নিয়ে ব্যাংকিং খাতে উদ্বেগ বাড়ছে।
অর্থনীতিবিদ ও ব্যাংকিং বিশেষজ্ঞরা বলছেন,
অস্বচ্ছ নিয়োগ ব্যাংকের দক্ষতা ও জবাবদিহিতা নষ্ট করে একটি নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর প্রভাব পুরো প্রতিষ্ঠানের ঝুঁকি বাড়ায় আর্থিক খাতে স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে স্বচ্ছতা ও কঠোর নিয়ন্ত্রণ জরুরি তাদের মতে, অতীতের এসব নিয়োগ ও আর্থিক কার্যক্রমের নিরপেক্ষ তদন্ত হওয়া প্রয়োজন।







