মধ্যপ্রাচ্যের রণক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলি বাহিনী এক নজিরবিহীন অস্তিত্ব সংকটের মুখে পড়েছে। গত তিন সপ্তাহের লড়াইয়ে ইরান ও তার মিত্রদের পাল্টাহামলায় দুই ডজন সামরিক বিমান হারিয়েছে এই দুই দেশ। এর মধ্যে মার্কিন বিমান বাহিনীর ১৬টি অত্যাধুনিক এয়ারক্রাফট রয়েছে, যার মধ্যে ১২টিই হলো বহুমূল্যবান ‘এমকিউ-নাইন রিপার’ ড্রোন। প্রতিটি ড্রোনের দাম প্রায় ৫ কোটি ৬০ লাখ ডলার হওয়ায় কেবল ড্রোন হারিয়েই পেন্টাগনের ক্ষতি হয়েছে ৫০ কোটি ডলারের বেশি।
আকাশপথে যুক্তরাষ্ট্রের এই বিপর্যয় কেবল ড্রোন হারানোর মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই। গত ২ মার্চ কুয়েতে রহস্যজনকভাবে তিনটি এফ-ফিফটিন যুদ্ধবিমান ধ্বংস হয় এবং ১২ মার্চ ইরাকে একটি কেসি-ওয়ান থার্টি ফাইভ রিফুয়েলিং ট্যাঙ্কার বিধ্বস্ত হয়ে ছয়জন ক্রু সদস্যের মৃত্যু ঘটে। তবে সবচেয়ে বড় ধাক্কাটি আসে ১৯ মার্চ, যখন ইরানি আকাশসীমায় ঢুকে পড়া একটি অত্যাধুনিক স্টিলথ এফ-থার্টি ফাইভ যুদ্ধবিমান আঘাতপ্রাপ্ত হয়ে জরুরি অবতরণ করতে বাধ্য হয়। বিশ্বের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো কোনো দেশ যুক্তরাষ্ট্রের এই ২ ট্রিলিয়ন ডলারের প্রজেক্টভুক্ত ‘অজেয়’ ফাইটারকে আঘাত করতে সক্ষম হলো।
ভূমিভিত্তিক প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাতেও ইরান বড় ধরনের সাফল্য দাবি করেছে। তাদের দাবি অনুযায়ী, জর্ডান, সংযুক্ত আরব আমিরাত এবং সৌদি আরবে মোতায়েন করা মার্কিন ‘থাড’ (THAAD) ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার অন্তত চারটি রাডার এরই মধ্যে অকেজো করে দেওয়া হয়েছে। প্রতিটি ৫০০ মিলিয়ন ডলার মূল্যের এই রাডারগুলো ধ্বংস হওয়ায় ওই অঞ্চলের আকাশ সুরক্ষা এখন নড়বড়ে হয়ে পড়েছে। এছাড়া কাতারের আল-উদেইদ ঘাঁটিতে থাকা শত কোটি ডলার মূল্যের আর্লি ওয়ার্নিং রাডারটিও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, যা ৫ হাজার কিলোমিটার দূর থেকে ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র শনাক্ত করতে পারত।
সমুদ্রপথেও যুক্তরাষ্ট্রের সংকট ঘনীভূত হচ্ছে। মার্কিন নৌবাহিনীর গর্ব ‘ইউএসএস জেরাল্ড আর ফোর্ড’ রণতরীটি বর্তমানে গ্রিসের ক্রিট দ্বীপে মেরামতের অপেক্ষায় রয়েছে। তবে বিস্ময়কর তথ্য হলো, শত্রু দেশের হামলায় নয়, বরং টানা ১০ মাস সমুদ্রে থাকায় ক্লান্ত ও অসন্তুষ্ট নাবিকদের সম্ভাব্য নাশকতার কারণে জাহাজটিতে অগ্নিকাণ্ড ঘটেছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। গত ১২ মার্চ জাহাজের লন্ড্রি সেকশনে শুরু হওয়া সেই আগুন নেভাতে ৩০ ঘণ্টা সময় লেগেছিল। মার্কিন নৌবাহিনী এখন তদন্ত করছে যে, ঘরে ফেরার আকুলতা থেকে নাবিকরাই ইচ্ছে করে এই আগুন লাগিয়েছিল কি না।
এই যুদ্ধ মার্কিন অর্থনীতির ওপর এক বিশাল বোঝা হয়ে দাঁড়িয়েছে। প্রতিদিন কেবল গোলাবারুদ খরচেই পেন্টাগনের ব্যয় হচ্ছে প্রায় ২০০ কোটি ডলার। ইতোমধ্যে ৩০০টির বেশি টমাহক ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করা হয়েছে, যার প্রতিটির দাম প্রায় সাড়ে তিন মিলিয়ন ডলার। ওয়াশিংটন পোস্টের রিপোর্ট অনুযায়ী, ফুরিয়ে যাওয়া অস্ত্র ভাণ্ডার পূর্ণ করতে হোয়াইট হাউস কংগ্রেসের কাছে অতিরিক্ত ২০০ বিলিয়ন ডলারের জরুরি বরাদ্দ চেয়েছে। এই বিপুল আর্থিক ক্ষতি এবং অত্যাধুনিক প্রযুক্তির ব্যর্থতা বিশ্বমঞ্চে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক শ্রেষ্ঠত্বকে এক কঠিন চ্যালেঞ্জের মুখে ঠেলে দিয়েছে।







