|এক|
ছাত্র জনতার গণ-অভ্যুত্থানের মুখে পালিয়ে যাওয়া স্বৈরাচার শেখ হাসিনার একটা ব্যাপার বেশ প্রসিদ্ধ হয়ে উঠেছিল। যখন যে জিনিসের দাম বেড়ে যেত তখনই তিনি হাজির হতেন নতুন কোনো আজগুবি রেসিপি নিয়ে। মিষ্টি কুমড়া দিয়ে বেগুনি, মাংসের পরিবর্তে কাঁঠালের বার্গার, সয়াবিন তেলের পরিবর্তে বাদামের তেল, কাঁচামরিচের গুড়ার মত নানান পদের রেসিপি নিয়ে তিনি হাজির হতেন। কখনও সংসদে কখনওবা জনসমাবেশে। সোশ্যাল মিডিয়ায় এসব নিয়ে চলতো তুমুল হাস্যরস। হা হা রিয়্যাক্ট এর বন্যা বয়ে যেত। কিন্তু তাতে থোরাই কেয়ার। উনি চলতেন ওনার গতিতেই। মূলতঃ তিনি চেষ্টা করতেন জনগণকে তার দুঃশাসনের চিত্র থেকে অন্যদিকে ঘুরিয়ে দিতে। যেন মানুষ তার এসব বালখিল্যপনা নিয়ে ব্যস্ত সময় কাটায়। পেছন থেকে রাষ্ট্রের হাজার কোটি টাকা লোপাটের তথ্য যেন কেউ না জানতে পারে।
|দুই|
৫ আগস্টের ঐতিহাসিক গণ-অভ্যূত্থানের পর ড. ইউনুস সাহেব মসনদে বসলেন। রাজনীতির ময়দানে তখন আর খুনী হাসিনা নেই। রাজপথে আর দাপিয়ে বেড়ায় না হেলমেট পরিহিত, রামদা আর চাপাতি সজ্জিত ছাত্রলীগ-যুবলীগ নামক ডিজিটাল মঙ্গলবাহিনী। কিন্তু প্রকৃতি নাকি শূণ্যস্থান পছন্দ করে না। ময়দানে হাজির হয়ে গেল দুর্ধর্ষ মঙ্গলবাহিনীর বেশে নতুন বাহিনী। ৫ আগস্ট’২৪ হাসিনা তার খুনী বাহিনীসহ পালিয়ে যাওয়ার পর থেকে ১২ ফেব্রুয়ারী’২৬ জাতীয় নির্বাচনের আগের দিন পর্যন্ত ছাত্রদল, যুবদল, স্বেচ্ছাসেবকদল তথা বিএনপি সন্ত্রাসীদের হাতে নিহত হয়েছেন ২৩১ জন। আর নির্বাচনোত্তর সরকার গঠনের পর ২৮ এপ্রিল’২৬ পর্যন্ত এই সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ২৭১ জনে। এর একটা বড় অংশ জুড়ে রয়েছে চাঁদাবাজি, দখলবাজিকে কেন্দ্র করে দলীয় অন্তর্কোন্দল। এ তো গেল নব্য মঙ্গলীয় বাহিনী তথা বিএনপি সন্ত্রাসীদের হাতে নিহতদের সংখ্যা। আহতের সংখ্যা তো দশ হাজার ছাড়িয়ে গেছে আরও দু’মাস আগেই। এ যেন ১৭ বছর অভূক্ত থাকা হায়েনার দল ঝাঁপিয়ে পড়েছে দেশের মানুষের ওপর।
|তিন|
সীমাহীন চাঁদাবাজি, টেন্ডারবাজি, দখলবাজির ফলে ফের গণমানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়ে গেছে। ড. ইউনুস সাহেব সরকার গঠনের পর থেকে নির্বাচন পর্যন্ত নিত্যপণ্যের বাজারসহ দ্রব্যমূল্য যেমন ছিল ক্রেতা সাধারণের হাতের নাগালে, তেমন ছিল স্থিতিশীল। কিন্তু নির্বাচনের পর থেকে কোনো এক জাদুর পরশে বাজারে দ্রব্যমূল্য ফের লাগামছাড়া পাগলা ঘোড়ার মত ছুটতে শুরু করলো। মানুষের ভোগান্তি শুরু হলো নতুন করে। আর এসব আড়াল করতেই যেন বিএনপির দলীয় প্রধানের জবান থেকে তসবির দানার মত একের পর এক কার্ডের ঘোষণা আসতে লাগলো। স্বৈরাচার হাসিনা যেভাবে একের পর এক রেসিপি দিয়ে দেশের জনগণকে ব্যস্ত রাখার চেষ্টা করতো, ঠিক যেন সেই একই তরিকায় একের পর এক কার্ডের ঘোষণা দিয়ে জনগণকে ব্যস্ত রাখার চেষ্টা করা হলো। বলা হলো নারীদেরকে ফ্যামিলি কার্ড দেয়া হবে। কিন্তু দেখা গেল বিএনপির স্থানীয় পর্যায়ের নেতারা এই ফ্যামিলি কার্ড দেয়ার নাম করে ফুসলিয়ে নারীদের ধর্ষণ করতে শুরু করেছে। গতকালকেও রংপুরের মিঠাপুকুরে ফ্যামিলি কার্ড দেওয়ার কথা বলে বাসায় ঢুকে এক গৃহবধূকে ধর্ষণ করেছে এনামুল হক নামের স্থানীয় এক বিএনপি নেতা। জানা গেছে এই ধর্ষক উক্ত উপজেলার ভাংনী ইউনিয়ন বিএনপির সহ-সাংগঠনিক সম্পাদক।
|চার|
জাতীয় সংসদে দাঁড়িয়ে বলা হলো ২ কোটি ৭৫ লাখ কৃষককে কৃষি কার্ড দেওয়া হবে হবে। ঢাক ঢোল পিটিয়ে এসব প্রচার করার পর যা জানা গেল তাতে তো আকাশ থেকে পড়ার মত অবস্থা! পত্রিকা মারফত জানতে পারলাম কথিত এই কৃষক কার্ডের মাধ্যমে ভূমিহীন, প্রান্তিক ও ক্ষুদ্র কৃষকদের কার্ডের মাধ্যমে বছরে আড়াই হাজার টাকা দেওয়া হবে। আর এই কার্ড যারা পাবেন তাদের সংখ্যাটাও ২ কোটি ৭৫ লাখ নয়, ২ লাখ ৭৫ হাজারও নয়, গণমাধ্যম বলছে মাত্র ২০ হাজার ৬৭১ জন কৃষক নাকি এই সুবিধা পাবেন। আর এই ২০ হাজার ৬৭১ জন কথিত কৃষকের মধ্যে কতজন প্রকৃত কৃষক আর কতজন দলীয় গুন্ডাবাহিনীর সদস্য সে খবর তো আর আমাদের গণমাধ্যম প্রকাশ করার হিম্মত রাখে না। এখন কথা হচ্ছে- এক বছর বসে পাওয়া কার্ডের এই ২৫০০ টাকায় তো কৃষকদের বিড়ি খাওয়ার খরচও মিটবে না! জাতীয় সংসদে দাঁড়িয়ে আড়াই কোটিরও বেশি কৃষককে কথিত এই কৃষক কার্ড বা কৃষি কার্ড দেয়ার ঘোষণা দিয়ে আড়াই হাজার কৃষককে বছরে আড়াই হাজার টাকা দেয়ার ব্যাপারটা ছোটবেলার গণিত বইয়ের তৈলাক্ত বাঁশ বেয়ে বানরের ওঠা নামা করার অঙ্কের কথাই বারবার মনে করিয়ে দেয়। অথবা এসব জোচ্চুরির সাথে আপনি বানরের রুটি ভাগের গল্পও মেলাতে পারবেন।
|পাঁচ|
ইরান-আমেরিকা যুদ্ধের ফলে হরমুজ প্রণালী দিয়ে আমদানী ব্যহত হওয়ায় দেশে দেখা দিল জালানী সঙ্কট। রহস্যজনকভাবে দেশজুড়ে পেট্রোল পাম্পগুলোর সামনে বাড়লো ভীড়। মানবেতর ভাবে তেল সংগ্রহ করতে হলো জনগণকে। কিছু একটা কারসাজি হচ্ছে এটা সবাই বুঝলেও জনগণ ছিল নিরূপায়। বিবিসি বাংলার অনুসন্ধানে জানা গেল অকটেনের দেশের চাহিদার একটা বড় অংশ দেশে উৎপাদিত অকটেন দিয়েই মেটানো সম্ভব। দৈনিক যুগান্তর জানালো আরেক রহস্যজনক খবর। জ্বালানি তেল নিয়ে দুর্ভোগ চরমে থাকার পরেও দেশে উৎপাদিত অকটেন নিচ্ছে না সরকার তথা বিপিসি। এরই মধ্যে এলো জ্বালানি তেলের মূল্য বৃদ্ধির গুঞ্জন। আমরা ভাবলা হয়তো ২-৫ টাকা বাড়বে। কিন্তু একি! একলাফে লিটারপ্রতি ডিজেলের দাম বাড়িয়ে দেয়া হলো ১৫ টাকা, অকটেন ২০ টাকা, পেট্রল ১৯ টাকা ও কেরোসিন ১৮ টাকা! বাংলাদেশে জ্বালানি বা বিদ্যুৎ-গ্যাসের মূল্য বৃদ্ধিতে বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (BERC)-এর গণশুনানী আইনত বাধ্যতামূলক। কিন্তু এক্ষেত্রে এ আইনের কোনো তোয়াক্কাই করা হলো না। আর এখন গণমাধ্যম সূত্রে জানা যাচ্ছে- ভোক্তারা অকটেন ক্রয়ের ক্ষেত্রে প্রতি লিটারে আমদানি ব্যয়ের চেয়ে ৩৪.২৭ টাকা বেশি পরিশোধ করছেন। এই বাড়তি অর্থের মধ্যে ২৭.৫৭ টাকাই আমদানি শুল্ক, ভ্যাট, উন্নয়ন সারচার্জ, পরিবহন ব্যয় ও রাষ্ট্রায়ত্ত পরিবেশক সংস্থাগুলোর মুনাফা হিসেবে সরকারের কোষাগারে যাচ্ছে। এর সাথে স্থানীয় পরিবহন খরচ ও ডিলারদের কমিশন যোগ করার পর প্রতি লিটারে মোট খরচ দাঁড়ায় ১৫১.৬১ টাকা—যা খুচরা বিক্রয়মূল্যের চেয়ে ১১.৬১ টাকা বেশি। সরকার এই বাড়তি অংশটিকেই নাকি ভর্তুকি হিসেবে গণ্য করছে। অথচ এখান থেকেই তৈরি হচ্ছে এক অদ্ভুত বৈপরীত্য: সরকার একদিকে লিটারপ্রতি ২৭.৫৭ টাকা কর ও চার্জ আদায় করছে, আবার অন্যদিকে ১১.৬১ টাকা ভর্তুকি দিচ্ছে। অর্থাৎ সরকার আদৌ অকটেনে ভর্তুকি দিচ্ছে না। শুভঙ্করের ফাঁকি প্রবাদের এ যেন এক উজ্জ্বল উদাহরণ। ঘটনা যাইহোক, কার্ডবাজি এখানেও ছিল যথারীতি। নানা ভোগান্তির মধ্যেও জ্বালানী কার্ড ও জ্বালানী পাসের কথা ছিল ক্রেতা সাধারণের মুখে মুখে।
|ছয়|
এরই মধ্যে আবার হঠাৎ করে বাড়িয়ে দেয়া হলো এলপিজির দাম। ১২ কেজি এলপিজি সিলিন্ডারের দাম ছিল ইউনুস সরকারের সময় ১ হাজার ২শ টাকা। সেখানে দাম বাড়াতে বাড়াতে সরকারি দামই বেড়ে হয়েছে ১ হাজার ৯৪০ টাকা। আর ভোক্তা পর্যায়ে এর দাম ২২শ থেকে ২৫শ পর্যন্ত পৌঁছে গেছে। ধরলাম যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে সরকার দাম বাড়াচ্ছে। কিন্তু বিষয়টি আসলে তেমন? আমাদের পার্শ্ববর্তী ভারতের পশ্চিমবঙ্গে ১৪ কেজি সিলিন্ডারে দাম বেড়েছে মাত্র ৬০ টাকা। আর সেখানে আমাদের অবস্থা দেখলে মনে হয় যুদ্ধটা আমেরিকার সাথে ইরানের নয়, বাংলাদেশের হচ্ছে! কিন্তু তারপরও আমাদের হতাশ হওয়ার কিছু নেই। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী সেখানেও নাকি একটি কার্ড দেয়ার ঘোষণা দিয়েছেন!
গণমাধ্যমের খবরে জানতে পারলাম জনাব তারেক রহমান নাকি ঘোষণা করেছেন, ‘‘আমরা যেমন সারা দেশের মায়েদের কাছে ফ্যামিলি কার্ড পৌঁছে দিচ্ছি, সেরকম আরেকটি কার্ড দিতে চাই; সেটি হবে ‘এলপিজি কার্ড’। এলপিজি গ্যাস আমরা মা-বোনদেরকে পৌঁছে দেবো যেন তাদের রান্নার জন্য আর কষ্ট করতে না হয়।’’
সরকার বাহাদুরের কাছে একটা বিনীত আবেদন রেখে আপাতত আজকের লেখার ইতি টানতে চাই। নারীদের ফ্যামিলি কার্ডের মত এলপিজি কার্ড দেন, সমস্যা নাই। কিন্তু বিতরণকালে আপনাদের দলের ধর্ষকদের হাতে এই কার্ড দিয়েন না। ফ্যামিলি কার্ডের প্রলোভন দেখিয়ে যতগুলো নারী নিগ্রহ ও ধর্ষণের খবর পড়েছি, এলপিজি কার্ডের লোভ দেখিয়ে মা-বোনদের একই রকম খপ্পরে পড়তে দেখতে চাইনা। ভিক্ষা চাই না, আপনার দলের নেতাদের ঠেকান।
লেখক: ব্লগার ও কলামিস্ট







