ভারত ও বাংলাদেশ পার্শ্ববর্তী দেশ হওয়ায় অভ্যন্তরীণ নির্বাচন ও অন্যান্য আবহ দুই দেশের নাগরিকদের চায়ের টেবিলের আলোচনার কারণ হয়ে থাকে। ভারতে বিধানসভা নির্বাচন শেষ হয়েছে। বাংলাদেশের মানুষরা তামিলনাড়ুর নির্বাচনের খবরা-খবর আগ্রহ নিয়ে বোঝার চেষ্টা করেছেন। কারণ দক্ষিণ সিনেমার নায়ক থালাপতি বিজয়ের রাজনৈতিক দল তামিলাগা ভেট্রি কাঝাগম সেই অঞ্চলের নির্বাচনে পূর্ণাঙ্গ সিট নিয়ে অংশগ্রহণ করেছে।
মাত্র ২ বছর আগে অর্থাৎ ২০২৪ সালে থালাপতির হাত ধরে এই দলটি প্রতিষ্ঠিত হয়। প্রতিষ্ঠাকালীন সময় থেকে দলটির জনপ্রিয়তা দ্রুততার সঙ্গে বৃদ্ধি পেতে থাকে। সে সময় ভারতের বুদ্ধিজীবী, সমালোচক ও রাজনৈতিক ব্যক্তিবর্গ তাকে এবং দলটিকে সমালোচনা করে বলেছিলেন, “সিনেমার নায়ক হয়ে ওঠা আর রাজনীতির মঞ্চ এক নয়। কাঝাগম খুব বেশিদূর এগিয়ে যেতে পারবে না। এবারের রাজ্য নির্বাচনে দলটি তাদের ভরাডুবি অবস্থা দেখতে পাবে।”
মাদুরাইয়ের দ্বিতীয় রাজ্য সম্মেলনে থালাপতি বিজয় এইসব ব্যক্তিবর্গের উদ্দেশ্যে বলেছিলেন, “অনেকে বলেছে আমি রাজনীতিতে প্রবেশ করব না, তারপর সমর্থন পাব না, তারপর সম্মেলন পরিচালনা করতে পারব না। এখন তারা বলছে আমি নির্বাচনে জিততে পারব না। সেই বিশ্লেষকদের উদ্দেশ্যে আমি বলছি—এই জনতা কেবল সমর্থন নয়, আমরা ইতোমধ্যেই রাজ্যের প্রতিটি ঘরে প্রবেশ করেছি।”
তামিলনাড়ুর রাজনীতিতে দীর্ঘদিন ধরে প্রভাব বিস্তার করে আসছে বড় দুই শক্তি DMK ও AIADMK নামের রাজনৈতিক দল। ২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনে ২৩৪টি আসনের ১০৮টিতে জয় লাভ করেছে থালাপতি বিজয়ের দল। আর তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে DMK মাত্র ৫৯টি আসনে জয় লাভ করেছে। যা শুধু ভারতেই নয়, বরং সমগ্র ভারতবর্ষে এক বিস্ময়ের জন্ম দিয়েছে।
এখানে প্রশ্ন থাকছে, কীভাবে দলটি এত অল্প সময়ের মধ্যে জনপ্রিয়তা পেল? এর পেছনের কারণ কি শুধু থালাপতি সিনেমার নায়ক বলে, নাকি অন্য কোনো কারণ আছে?
শুধুমাত্র সিনেমার নায়ক হয়ে এ যাবৎ পর্যন্ত কেউ এতটা সফল হতে পারেননি। তবে সিনেমার নায়ক থেকে মুখ্যমন্ত্রী হওয়ার ঘটনাও ইতিপূর্বে ঘটেছে। তামিলনাড়ুতে চিত্রনায়ক রামাচন্দ্রন ‘গরিবের বন্ধু’ সিনেমার ইমেজে রাজনীতিতে আসেন। DMK থেকে বের হয়ে তৈরি করেন AIADMK। তারপর ১৯৭৭ সালে তিনি ক্ষমতায় আসেন। বর্তমান সময়ের বাস্তবতার নিরিখে বলা যায়, জনপ্রিয় নায়ক থেকে কেউ রাজনীতিতে প্রবেশ করতে চাইলে তাকে প্রথমে দেশের কোনো বৃহত্তম দলের স্মরণাপন্ন হতে হয়। কিন্তু এত বড় একটি দেশে সেই পদ্ধতি অবলম্বন না করে থালাপতি নিজেই বিস্ময়কর সিনেমার মতো একক দল তৈরি করার চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করেছেন এবং তারপর বিপুল আসনে জয় অর্জন করেছেন। এইসব চ্যালেঞ্জ, সংগ্রাম ও সফলতার পেছনে রয়েছে অনেকগুলো কারণ।
১. থালাপতির সিনেমার ভূমিকা
থালাপতি বিজয়ের পিতা ছিলেন একজন পরিচালক ও প্রযোজক। সেই কারণে ছোটবেলা থেকে বাবার শুটিং স্পটে সময় কাটানোর সুযোগ পেয়েছেন। এতে তার সিনেমার প্রতি ঝোঁক তৈরি হয়। ১৯৮৪ সালে Vetri সিনেমায় শিশু শিল্পী হিসেবে প্রথম অভিনয়জগতে প্রবেশ করেন থালাপতি।
সিনেমার কাহিনি ও চরিত্রের বৈশিষ্ট্যগুলো বিশ্লেষণ করলে বোঝা যায়, তিনি দর্শকদের শুধু নিছক বিনোদন দিতে সিনেমাজগতে আসেননি। এর মাধ্যমে ফুটিয়ে তুলতে চেষ্টা করেছেন সেই রাষ্ট্র ও অঞ্চলের মানুষের কষ্ট, দুর্দশা, বিভিন্ন বাধা, অবজ্ঞা ও লাঞ্ছনার চিত্র।
উল্লেখযোগ্য যে, Kaththi (২০১৪) — কৃষক, পানি ও কর্পোরেট দখলকে ঘিরে সিনেমাটি নির্মিত হয়। কৃষকেরা পানির অভাবে ফসল হারাতে থাকে, জীবন দুর্বিষহ হয়ে ওঠে। সিনেমায় থালাপতি এই অন্যায়ের বিরুদ্ধে আন্দোলন গড়ে তোলে।
Mersal (২০১৭) — স্বাস্থ্যব্যবস্থার অন্ধকার দিক নিয়ে সিনেমাটি নির্মিত হয়। যেখানে দেখানো হয় ভারতের স্বাস্থ্যব্যবস্থা ধনী-কেন্দ্রিক হয়ে গেছে। আর সাধারণ মানুষ চিকিৎসার নামে শোষিত হচ্ছে।
Sarkar (২০১৮) — ভোটাধিকার ও রাজনৈতিক দুর্নীতি সম্পর্কে সিনেমাটি নির্মিত হয়। যেখানে থালাপতি সুন্দর রামাস্বামী চরিত্রে অভিনয় করেন। বিদেশ থেকে ভারতে ফিরে ভোট দিতে গিয়ে তিনি দেখেন তার ভোট আগেই কেউ ব্যবহার করেছে।
এই সিনেমাগুলোতে সূক্ষ্ম অভিনয়ের মাধ্যমে থালাপতি দর্শকদের কাছে নিজের ইমেজ তৈরি করতে পেরেছেন। যার ফলে সাধারণ জনগণের মনে হতে থাকে থালাপতি তাদেরই একজন। তিনি সিনেমায় অভিনয় করার সময়ই উপলব্ধি করতে পেরেছিলেন, এইসব মানুষের জন্য কিছু করতে হলে সিনেমার নায়ক থেকে একজন রাজনীতিবিদ হওয়া অত্যন্ত জরুরি।
তাছাড়া দেশের চলমান সংকট, বিশৃঙ্খলা ও দুর্নীতির মতো অপ-রাজনীতির কারণে দেশের রাজনীতি ও রাজনীতিবিদদের প্রতি অনেক আগেই তার মনে অনাস্থা তৈরি হয়েছিল। যার ফলে তিনি অনলাইনে রাষ্ট্রের বিভিন্ন গাফিলতির সমালোচনা করে সাহসিকতার পরিচয় দেন। যা সেই অঞ্চলের নাগরিকদের প্রভাবিত করতে পারে এবং তার প্রতি সমর্থন তৈরি করে। এতে থালাপতি দলটি প্রতিষ্ঠা করতে সাহস পান।
২. সাদামাটা জীবন
রাজনীতিবিদদের বিলাসবহুল জীবন দেখতে দেখতে নাগরিকরা তাদের জনপ্রতিনিধির চেয়ে শোষক হিসেবে দেখতে শুরু করেন। ফলে সেখানকার নাগরিকরা তামিল রাজনীতিতে নতুন নেতৃত্বের অভাব অনুভব করেন।
থালাপতি একজন জনপ্রিয় নায়ক এবং অর্থশালী মানুষ ছিলেন। তারপরও জীবনটাকে খুব সাদামাটাভাবে কাটানো জনসাধারণের নজরে এসেছিল। একজন সাধারণ মানুষের মধ্যে সাধারণত্ব সবাইকে খুব একটা আকৃষ্ট করতে পারে না। কিন্তু একজন অসাধারণ মানুষের মধ্যে সাধারণত্ব সহজেই সবাইকে আকৃষ্ট করতে পারে। থালাপতি ছিলেন সেই ধরনেরই একজন মানুষ, যার জীবনধারণ ও আচার-আচরণ ছিল সাদামাটা। যার কারণে জনগণ সহজেই তার প্রতি আকৃষ্ট হয়ে পড়েন। যা এই নির্বাচনে জনসমর্থনের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
৩. কাঝাগমের দলীয় নীতি ও বিধানসভা নির্বাচনী ইশতেহার
ভারতের বাম রাজনীতি বিভিন্ন অভিযোগে জনসমর্থন হারাতে থাকে। ১৯৭৭ সালের পর থেকে কোনো না কোনো রাজ্যে তারা নিজেদের জয় দেখেছে। কিন্তু ২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনে এই প্রথম বামপন্থিরা কোনো রাজ্যে জয় লাভ করতে পারেনি।
থালাপতি বিজয় তার পূর্ববর্তী তামিল সংগ্রামের আকাঙ্ক্ষিত নীতি ও বর্তমান সংকটগুলোর অনেকটাই বুঝে উঠতে পেরেছিলেন। যার ভিত্তিতে তিনি মধ্য-বামপন্থি নীতি অবলম্বন করে দলীয় ইশতেহার ঘোষণা করেন। যার মূল বিষয়গুলোর মধ্যে ছিল—
দৃষ্টিভঙ্গি:
ধর্মনিরপেক্ষতা ও নিম্নবর্ণের মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠাকে কাঝাগম দলটি প্রাধান্য দিয়েছে। আর এই কারণে নিম্নবর্ণের এবং মুসলিম ধর্মের নাগরিকেরা তার প্রতি আস্থা রাখার সাহস পান। এটি আরও শক্তিশালী হয়, যখন তিনি রমজানে মুসলিমদের সঙ্গে ইফতারে অংশগ্রহণ করেন। তিনি শুধুমাত্র মঞ্চের বক্তব্যে নয়, বরং তিনি যা করতে চাচ্ছেন তার নমুনা জনসম্মুখে আনার চেষ্টা করেছিলেন।
শিক্ষা ও চিকিৎসা:
ভারতে দরিদ্র ও নিম্নবিত্ত পরিবারের ছেলে-মেয়েরা প্রাথমিক ও মাধ্যমিক জীবন শেষ করার আগেই অর্থের অভাবে ঝরে যায়। আবার কোনো কোনো পরিবার অর্থাভাবে শিক্ষাকেন্দ্রের সীমানায়ও যেতে পারে না।
থালাপতি বিজয় তার নির্বাচনী ইশতেহারের মাধ্যমে জনসাধারণকে এই বার্তা দিয়েছিলেন যে, তারা ক্ষমতায় এলে রাজ্যের কোনো মানুষ অশিক্ষিত অবস্থায় জীবন পার করবে না। সেই লক্ষ্যে উচ্চশিক্ষার জন্য শিক্ষার্থীদের ২০ লাখ টাকা পর্যন্ত জামানতবিহীন শিক্ষা ঋণের ব্যবস্থা করতে চেয়েছেন।
আবার অর্থের অভাবে যেসব নাগরিক ভালো চিকিৎসা পান না, প্রতিদিন যাদের মৃত্যু ঘটে—তাদের জন্য শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে বাজেট বৃদ্ধি এবং মানোন্নয়নের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। যা সেই শ্রেণির নাগরিকদের দলটির প্রতি আস্থা তৈরি করতে পেরেছে।
নারী অধিকার:
ভারতের নারীরা বিভিন্নভাবে নির্যাতন, নিপীড়ন ও ধর্ষণের শিকার হন। আইনি প্রক্রিয়ায় সব কিছুর বিচার সম্ভব হয় না। তিনি প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন, ক্ষমতায় এলে নারীদের নিরাপত্তাব্যবস্থা জোরদার করবেন।
এছাড়া নারীদের জন্য নতুন কর্মসংস্থান বৃদ্ধি এবং ৬০ বছরের নিচের নারীদের জন্য মাসিক ২,৫০০ টাকা ভাতার ব্যবস্থা করতে চেয়েছেন। তাছাড়া নারীদের স্বনির্ভর করতে উদ্যোক্তাদের জন্য ৫ লাখ টাকা পর্যন্ত সুদমুক্ত ঋণের ব্যবস্থার কথাও বলেছেন। স্বাভাবিকভাবেই এই অঞ্চলের কর্মসংস্থানের সঙ্গে যুক্ত থাকা কিংবা সচেতন নারীদের মধ্যে তার প্রতি সমর্থন তৈরি হয়েছে।
কর্মসংস্থান সৃষ্টির আশ্বাস:
অঞ্চলের শিক্ষিত বেকারদের হতাশা থেকে বাঁচাতে বেকার স্নাতকদের জন্য মাসে ৪,০০০ টাকা ভাতা এবং ডিপ্লোমাধারীদের জন্য মাসে ২,০০০ টাকা ভাতার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন।
তাছাড়া তরুণ উদ্যোক্তাদের জন্য ২৫ লাখ টাকা পর্যন্ত জামানতবিহীন ঋণের কথা বলেছেন। স্বনির্ভর নারীদের জন্য ৫ লাখ টাকা পর্যন্ত সুদমুক্ত ঋণের প্রতিশ্রুতিও দিয়েছেন। যার ফলে সেই অঞ্চলের মানুষ নতুন করে বাঁচার স্বপ্ন দেখতে পেয়েছেন। আর এটিকে বাস্তবায়নের জন্য থালাপতির ওপর আস্থাশীল হয়ে পড়েন। যার কারণে সেই অঞ্চলের শিক্ষিত বেকার ও কর্মসন্ধানী নারীরা তাকে যোগ্য প্রার্থী হিসেবে মনে করেছেন।
কৃষকের জীবনমান উন্নয়নের ভাবনা
TVK তাদের নির্বাচনী ইশতেহারে সেচের জন্য কৃষকদের কম খরচে পানি সরবরাহ, গ্রামে কোল্ড স্টোরেজ ও প্রসেসিং ইউনিট গড়ে তুলে কৃষিপণ্যের অপচয় কমানোর কথা বলেছে। এছাড়া বয়স্ক কৃষকদের জন্য পেনশন বা সামাজিক সুরক্ষাব্যবস্থা চালু করতে চেয়েছে।
সুতরাং কৃষকরা নিজেদের স্বার্থে এই নির্বাচনে থালাপতিকে শুধু নায়ক হিসেবে নয়, বরং রাজনৈতিক প্রতিনিধি হিসেবেও সমর্থন করেছেন।
এছাড়াও দরিদ্র নারীদের বিয়ের জন্য ৮ গ্রাম স্বর্ণ (এক ‘সোভরেন’ স্বর্ণ) ও একটি সিল্ক শাড়ি দিয়ে বিবাহের অর্থনৈতিক চিন্তা লাঘব, তাঁতি, জেলে এবং প্রতিবন্ধীদের বিভিন্ন বিষয়ে অগ্রাধিকার দেওয়ার কথাও বলা হয়েছে।
চন্দ্রশেখর বিজয় ওরফে থালাপতি বিজয় এখন তামিলনাড়ুর বিধানসভার মুখ্যমন্ত্রী। তিনি সিনেমার মাধ্যমে যে বার্তা দিয়েছেন, রাজনীতির মঞ্চে যে প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন—এখন দেখার বিষয়, তিনি তার অঞ্চলের জনগণকে কতটা সাফল্য এনে দিতে পারেন।
ভারতের রাজনীতির ইতিহাসে এক নতুন অধ্যায়ে তার প্রতিটি পদক্ষেপই নির্ধারণ করবে, তিনি সত্যিই মানুষের আশা-ভরসার প্রতীক হয়ে উঠতে পারবেন কি না, নাকি সময়ের স্রোতে হারিয়ে যাবেন আরেকটি ক্ষণস্থায়ী আলোচনার বিষয় হয়ে।
*তরুণ লেখক ও কবি







