একসময় মানুষ ভয় পেত অন্ধকারকে, ভয় পেত হিংস্র প্রাণী কিংবা অজানাকে। কিন্তু মানুষ তখনও মানুষের ওপর আস্থা রাখত। নির্জন পথে কাউকে পাশে পেলে সাহস ফিরে আসত, নিরাপত্তাবোধ জন্ম নিত। সময়ের নির্মম বাস্তবতায় আজ সেই চিত্র অনেকটাই বদলে গেছে। এখন মানুষই মানুষের সবচেয়ে বড় আতঙ্ক হয়ে উঠছে। সহমর্মিতা, মমত্ববোধ ও মানবিকতার জায়গা দখল করছে ঘৃণা, প্রতিশোধ, অসহিষ্ণুতা ও সহিংসতা। পারিবারিক কলহ, সামাজিক দ্বন্দ্ব কিংবা সামান্য মতবিরোধও অনেক সময় ভয়াবহ হত্যাকাণ্ডে রূপ নিচ্ছে। শিশু হত্যা, নারী নির্যাতন, ধর্ষণ, গণপিটুনি, রাজনৈতিক সহিংসতা ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ঘৃণার বিস্তার সমাজকে ক্রমেই অস্থির ও ভয়ংকর বাস্তবতার দিকে ঠেলে দিচ্ছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, দেশের বিভিন্ন স্থানে সাম্প্রতিক সময়ে যেসব নৃশংস হত্যাকাণ্ড ও সহিংস ঘটনার খবর প্রকাশিত হচ্ছে, সেগুলো কেবল বিচ্ছিন্ন অপরাধ নয়; বরং সমাজের গভীর মনস্তাত্ত্বিক ও নৈতিক সংকটের বহিঃপ্রকাশ। আমেরিকান মনোরোগ বিশেষজ্ঞ সান্ড্রা ব্লুমের মতে, সহিংসতা ও অপরাধ বিস্তারের জন্য শুধু ব্যক্তি নয়, সমাজও বড়ভাবে দায়ী। যে সমাজে আগ্রাসনকে প্রশ্রয় দেওয়া হয় কিংবা যেখানে আইন ও সামাজিক কাঠামো দুর্বল, সেখানে অপরাধ প্রবণতা বৃদ্ধি পায়। বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে, শৈশবের মানসিক আঘাত, পারিবারিক সহিংসতা, যৌন নির্যাতনের অভিজ্ঞতা, মাদকাসক্তি এবং মানসিক ভারসাম্যহীনতা মানুষের মধ্যে সহিংস প্রবণতা বাড়িয়ে তোলে।
জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের কমিউনিটি ও সোশ্যাল সাইকিয়াট্রি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ডা. মুনতাসীর মারুফ বলেন, সিগমুন্ড ফ্রয়েডের মতবাদ অনুযায়ী মানুষের মধ্যে এক ধরনের অবচেতন ধ্বংসাত্মক প্রবৃত্তি কাজ করে, যা নিয়ন্ত্রণ হারালে আগ্রাসী আচরণে রূপ নেয়। অন্যদিকে আলবার্ট বান্দুরার সামাজিক শিক্ষার তত্ত্ব বলছে, মানুষ আশপাশের মানুষ, পরিবার, সমাজ, গণমাধ্যম, সিনেমা কিংবা অনলাইন কনটেন্ট দেখে আচরণ শেখে। ফলে সমাজে যখন অপরাধীদের প্রভাবশালী বা পুরস্কৃত হতে দেখা যায়, তখন অন্যদের মধ্যেও অপরাধপ্রবণতা বাড়ার ঝুঁকি তৈরি হয়।
বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, সামাজিক বিচ্ছিন্নতা, পারিবারিক বন্ধনের দুর্বলতা, মূল্যবোধের অবক্ষয়, মাদকের বিস্তার, রাজনৈতিক অসহিষ্ণুতা এবং অনলাইনে সহিংস ও উসকানিমূলক কনটেন্টের প্রভাব মানুষকে ক্রমেই সহিংস করে তুলছে। বিচারহীনতার সংস্কৃতি ও আইনের দুর্বল প্রয়োগ অপরাধীদের মধ্যে শাস্তিহীনতার মানসিকতা তৈরি করছে। উদ্বেগের বিষয় হলো, ঘনঘন সহিংস ঘটনার কারণে সমাজের একাংশের মধ্যে এক ধরনের মানসিক অসাড়তা তৈরি হচ্ছে। ভয়াবহ হত্যাকাণ্ড কিংবা নির্যাতনের খবরও অনেকের কাছে যেন স্বাভাবিক ঘটনায় পরিণত হচ্ছে।
সাম্প্রতিক কয়েকটি ঘটনা সমাজের এই ভয়াবহ চিত্র আরও স্পষ্ট করেছে। গত ৯ মে গাজীপুরের কাপাসিয়ায় শারমিন আক্তার, তার তিন সন্তান এবং রসুল মিয়াসহ পাঁচজনের লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে, পারিবারিক কলহ, আর্থিক লেনদেন ও পরকীয়াজনিত বিরোধের জেরে এ হত্যাকাণ্ড ঘটে। শুধু গাজীপুর নয়, প্রতিদিনই দেশের বিভিন্ন এলাকায় হত্যা, ধর্ষণ ও সহিংসতার ঘটনা ঘটছে। ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের তথ্যমতে, শুধু মার্চ মাসেই রাজধানীতে ২৪টি হত্যাকাণ্ড এবং নারী ও শিশু ধর্ষণের ৫৬টি ঘটনা ঘটে।
আইন ও সালিশ কেন্দ্রের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের প্রথম চার মাসে ১১৫ শিশু হত্যার শিকার হয়েছে। এর মধ্যে ৩৪ শিশু শারীরিক নির্যাতনে এবং ২৫ শিশু পারিবারিক সহিংসতায় মারা গেছে। একই সময়ে ধর্ষণের পর হত্যা করা হয়েছে ১১ জনকে। অন্যদিকে চার মাসে নারীদের বিরুদ্ধে ১৪১টি সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে। ধর্ষণের শিকার হয়েছেন অন্তত ১৮০ নারী, যার মধ্যে গণধর্ষণের ঘটনা ছিল ৫৬টি। শিশুদের বিরুদ্ধেও সহিংসতা উদ্বেগজনক হারে বেড়েছে। সম্প্রতি নেত্রকোনার মদনে ১২ বছরের এক কিশোরীর সাত মাসের অন্তঃসত্ত্বা হওয়ার ঘটনা দেশজুড়ে তীব্র আলোড়ন সৃষ্টি করেছে।
জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের চেয়ারম্যান ড. ফারহানা জামান বলেন, দারিদ্র্য, বেকারত্ব, সামাজিক অবক্ষয়, প্রযুক্তিনির্ভর জীবনযাত্রা ও মাদকাসক্তি সমাজে সহিংসতা বাড়াচ্ছে। স্মার্টফোন ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম মানুষের ধৈর্য ও সহনশীলতা কমিয়ে দিচ্ছে। মানুষ দ্রুত সফলতা ও তাৎক্ষণিক ভোগের সংস্কৃতিতে অভ্যস্ত হয়ে পড়ছে, যা হতাশা ও আক্রমণাত্মক মনোভাব বাড়াচ্ছে। তিনি বলেন, অনেকের শৈশব কাটে বঞ্চনা ও মানসিক অবহেলার মধ্যে, যা পরবর্তীতে সহিংস আচরণে রূপ নিতে পারে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্রিমিনোলজি বিভাগের চেয়ারম্যান রেজাউল করিম সোহাগ বলেন, যৌথ পরিবার ব্যবস্থা দুর্বল হয়ে যাওয়ায় সামাজিক নিয়ন্ত্রণ কমে গেছে। মানুষ এখন একাকিত্ব, হতাশা ও মানসিক চাপে ভুগছে। এই হতাশা অনেককে মাদকের দিকে ঠেলে দিচ্ছে, যা পরবর্তীতে সহিংস অপরাধে জড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি বাড়ায়। তার মতে, অপরাধ দমনে শুধু আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর উদ্যোগ যথেষ্ট নয়; পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, গণমাধ্যম ও সমাজের সব অংশীজনকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে।
সুপ্রিমকোর্টের সিনিয়র আইনজীবী অ্যাডভোকেট মনজিল মোরশেদ বলেন, বিচারহীনতা ও দীর্ঘসূত্রতা অপরাধ বৃদ্ধির অন্যতম কারণ। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই মামলার নিষ্পত্তি দীর্ঘ সময় ধরে ঝুলে থাকে, ফলে অপরাধীরা শাস্তির ভয় হারিয়ে ফেলে। বিচারব্যবস্থার ওপর অতিরিক্ত চাপ ও সীমিত সংখ্যক বিচারকের কারণে সাধারণ মানুষের আস্থাও কমছে।
অন্যদিকে ইসলামিক ফাউন্ডেশন বাংলাদেশের গভর্নর ড. মূহাম্মাদ খলিলুর রহমান বলেন, নৈতিকতা, ধর্মীয় শিক্ষা ও আল্লাহভীতির অভাব সমাজে অপরাধ বাড়ার অন্যতম কারণ। ইসলাম আত্মিক শুদ্ধি, পারিবারিক শিক্ষা ও সামাজিক ন্যায়বিচারের মাধ্যমে সহিংসতা প্রতিরোধের শিক্ষা দেয়। তিনি বলেন, অশ্লীলতা, মাদক এবং মূল্যবোধের অবক্ষয় সমাজকে ধ্বংসের দিকে ঠেলে দিচ্ছে।
বিশেষজ্ঞদের অভিমত, সমাজে বাড়তে থাকা এই হিংস্রতা ঠেকাতে পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, রাষ্ট্র ও সমাজকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে। আইনের কঠোর প্রয়োগ, দ্রুত বিচার, মানসিক স্বাস্থ্যসেবা সহজলভ্য করা, সামাজিক সচেতনতা বৃদ্ধি এবং মানবিক মূল্যবোধ পুনর্গঠনের মাধ্যমে সহিংসতা রোধ করা সম্ভব। অন্যথায় ভবিষ্যৎ প্রজন্ম আরও ভয়াবহ বাস্তবতার মুখোমুখি হতে পারে।







