আশির দশকের শেষ দিকে চীনের অর্থনীতি যখন কেবল উন্মুক্ত হতে শুরু করেছে, তখন এক দৃঢ়প্রতিজ্ঞ তরুণ ৬০০ জোড়া জুতা নিয়ে বেইজিংয়ের পথে পা বাড়িয়েছিলেন। হাইস্কুলের পাঠ চুকানোর আগেই পড়াশোনা ছেড়ে দেওয়া সেই ১৭ বছর বয়সী তরুণের নাম ডিং শিজং। কমিউনিস্ট পার্টির কঠোর নজরদারিতে চীনে যখন পুঁজিবাদের পালে হাওয়া লাগছিল, ডিং ছিলেন সেই সময়েরই একজন উদীয়মান উদ্যোক্তা। আত্মীয়র কারখানায় তৈরি সেই জুতা বিক্রি করে যে টাকা পেয়েছিলেন, তা দিয়েই গড়ে তোলেন নিজের প্রথম ওয়ার্কশপ এবং সেখানে অন্য কোম্পানির জন্য জুতা তৈরি শুরু করেন।
ডিংয়ের সেই ছোট্ট ব্যবসা আজ বিশ্ব ক্রীড়াসামগ্রীর বাজারে এক দানবীয় শক্তিতে পরিণত হয়েছে, যার নাম ‘আন্তা’ (Anta)। ১৯৯১ সালে ফুজিয়ান প্রদেশের জিনজিয়াং শহরে একটি ছোট কারখানা হিসেবে আন্তার যাত্রা শুরু হয়েছিল। সরকারের পরিকল্পিত শিল্পায়নের অংশ হিসেবে কৃষিপ্রধান জিনজিয়াং দ্রুত বিশ্বের ‘জুতার রাজধানী’তে পরিণত হয়। নাইকি ও অ্যাডিডাসের মতো বিশ্বসেরা ব্র্যান্ডগুলো উৎপাদন খরচ কমাতে এখানে বিনিয়োগ শুরু করলে চেন্দাই শহরের মাত্র ৪০ বর্গকিলোমিটার এলাকায় গড়ে ওঠে হাজার হাজার কারখানা। ২০০৫ সাল নাগাদ বিশ্বের মোট জুতার প্রায় এক-পঞ্চমাংশই উৎপাদিত হতো ফুজিয়ানে।

বিদেশি কোম্পানিগুলোর জন্য পণ্য তৈরি করতে গিয়ে চীনারা কেবল উৎপাদনই শেখেনি, বরং কীভাবে আরও উন্নত, দ্রুত এবং মানসম্মত পণ্য তৈরি করা যায়, সেই কৌশলও রপ্ত করে ফেলেছে। ২০০৭ সালে হংকং স্টক এক্সচেঞ্জে তালিকাভুক্ত হয়ে আন্তা রেকর্ড ৪৫০ মিলিয়ন ডলার সংগ্রহ করে। আন্তা শুরু থেকেই পশ্চিমা ব্র্যান্ডগুলোর মতো ক্রেতাদের টার্গেট করে এগোচ্ছিল। তারা শুধু সাব-কন্ট্রাক্টর হিসেবে থাকতে চায়নি, বরং নিজেদের একটি পরিচিত ব্র্যান্ড হিসেবে গড়ে তোলার দিকে মনোনিবেশ করেছিল। চীনের অন্যান্য জায়ান্ট যেমন শাওমি, ডিজেআই কিংবা বিওয়াইডির মতোই আন্তার এই উত্থান।
বিশ্বজুড়ে আধিপত্য বিস্তারে আন্তা এখন ‘মাল্টি-ব্র্যান্ড স্ট্র্যাটেজি’ বা বহুমুখী ব্র্যান্ড কৌশল গ্রহণ করেছে। ২০০৯ সালে তারা ইতালীয় ব্র্যান্ড ফিলার (Fila) চীনা স্বত্ব কিনে নেয়। ২০১৯ সালে ফিনিশ ব্র্যান্ড আমের স্পোর্টস কিনে নেওয়ার মাধ্যমে আর্কটেরিক্স, সলোমন এবং উইলসনের মতো বিশ্বখ্যাত ব্র্যান্ডের মালিকানা পায় আন্তা। সম্প্রতি তারা জার্মান ব্র্যান্ড পুমার বড় একটি অংশীদারত্বও কিনে নিয়েছে। বাস্কেটবল তারকা ক্লে থম্পসন এবং কাইরি আরভিংয়ের মতো তারকাদের সঙ্গে চুক্তি করে তারা বিশ্বজুড়ে নিজেদের পরিচয় ছড়ানোর চেষ্টা করছে।
পশ্চিমা বিশ্বে আন্তা এখনো ঘরোয়া নাম হয়ে ওঠেনি ঠিকই, কিন্তু চীনে তাদের ১০ হাজারেরও বেশি দোকান রয়েছে। ফ্রিস্টাইল স্কিয়ার আইলিন গু-র মতো শীর্ষ অ্যাথলেটদের স্পনсор করছে তারা। গত ফেব্রুয়ারিতে যুক্তরাষ্ট্রের লস অ্যাঞ্জেলেসের অভিজাত এলাকা বেভারলি হিলসে নিজেদের প্রথম ফ্ল্যাগশিপ স্টোর খুলেছে আন্তা। ডোনাল্ড ট্রাম্প যখন ট্যারিফ বা শুল্ক আরোপের মাধ্যমে কলকারখানার কাজ যুক্তরাষ্ট্রে ফিরিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করছেন, তখন আন্তার এ বিশ্বব্যাপী বিস্তার প্রমাণ করে যে পণ্য উৎপাদনের ক্ষেত্রে চীনা সাপ্লাই চেইন কতটা অপরিহার্য ও প্রতিযোগিতামূলক হয়ে উঠেছে।
বর্তমানে ডিংয়ের লক্ষ্য নাইকি এবং অ্যাডিডাসকে টেক্কা দেওয়া। ২০০৫ সালেই তিনি নিজের লক্ষ্য পরিষ্কার করে বলেছিলেন, ‘আমরা চীনের নাইকি হতে চাই না, বরং বিশ্বের আন্তা হতে চাই’। নাইকি ও অ্যাডিডাস যখন বিশ্ববাজারে এবং খোদ চীনে বিভিন্ন চ্যালেঞ্জের মোকাবিলা করছে, তখন আন্তা সুবিধাজনক অবস্থানে রয়েছে। নাইকির ই-কমার্স কৌশল ব্যর্থ হওয়া এবং চীনে বিলাসপণ্যের চাহিদা কমে যাওয়ায় নাইকি ও অ্যাডিডাসের বিক্রি কমেছে, আর এ সুযোগকেই কাজে লাগাতে চায় আন্তা। তবে পশ্চিমা বিশ্বের সঙ্গে বেইজিংয়ের বর্তমান রাজনৈতিক সম্পর্ক এবং বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে স্নায়ুযুদ্ধের কারণে আন্তাকে বেশ কিছু চ্যালেঞ্জের মুখেও পড়তে হচ্ছে।







