আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে যা ছিল বীরত্ব ও চরম কৃতিত্বের, পরিবর্তিত রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে তদন্ত শুরু হতেই তা যেন এখন হয়ে উঠেছে বড় এক দায়। আর সেই দায় এড়াতে নিজের জ্যেষ্ঠতা ও চেইন অব কমান্ডকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে পুরো অভিযানের দায় অধস্তনের ওপর চাপানোর এক ন্যাক্কারজনক চেষ্টা করছেন খোদ পুলিশের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা। আলোচিত এই কর্মকর্তার নাম মোহাম্মদ আশিকুর রহমান, যিনি পুলিশের বিশেষায়িত শাখা সোয়াতের (SWAT) সাবেক কমান্ডার এবং বর্তমানে রাজশাহীর ইন-সার্ভিস ট্রেনিং সেন্টারে অ্যাডিশনাল ডিআইজি হিসেবে কর্মরত আছেন।
ঘটনাটি ২০১৬ সালের ৮ অক্টোবর গাজীপুরের নোয়াগাঁও পাটারটেক এলাকায় পরিচালিত জঙ্গিবিরোধী ‘অপারেশন স্পেট-৮’-কে ঘিরে, যেখানে ৭ জন মাদ্রাসাপড়ুয়া শিক্ষার্থী নিহত হয়েছিল। তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী একে ‘নব্য জেএমবি’র বিরুদ্ধে সফল অভিযান বললেও, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পটপরিবর্তনের পর নিহতদের পরিবার একে ‘পরিকল্পিত গুম ও হত্যা’ দাবি করে ট্রাইব্যুনালে মামলা করে। এই অভিযানের মূল নায়ক হিসেবে ২০১৭ সালে পুলিশের সর্বোচ্চ রাষ্ট্রীয় পদক ‘বাংলাদেশ পুলিশ মেডেল (বিপিএম)-সাহসিকতা’ পেয়েছিলেন তৎকালীন এডিসি আশিকুর রহমান।
সম্প্রতি আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে দেওয়া জবানবন্দিতে অ্যাডিশনাল ডিআইজি আশিকুর রহমান সম্পূর্ণ উল্টো সুর গেয়ে দাবি করেছেন, তিনি ওই অভিযানের নেতৃত্বে ছিলেন না। বরং তাঁর অধীনস্থ কর্মকর্তা সহকারী কমিশনার (এসি) এসএম জাহাঙ্গীর হাসান ওই অপারেশনের কমান্ড ও সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। জবানবন্দিতে তিনি আরও উল্লেখ করেন, তৎকালীন সিটিটিসি প্রধান মনিরুল ইসলাম ও গাজীপুরের এসপি হারুন অর রশীদ সরাসরি গুলি চালানোর নির্দেশ দেন এবং তিনি নিজে কোনো গুলিই করেননি, বরং মনিরুল ইসলাম জোর করে জিডিতে তাঁর নামে গুলি বণ্টন দেখিয়েছেন।
তবে অনুসন্ধানে দেখা গেছে, ট্রাইব্যুনালে দেওয়া আশিকুরের এই জবানবন্দি সম্পূর্ণ মিথ্যা এবং সরকারি নথির সাথে সরাসরি সাংঘর্ষিক। ঘটনার পরপরই ২০১৬ সালের অক্টোবরে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট সাইফুল ইসলামের জমা দেওয়া তদন্ত প্রতিবেদন এবং জয়দেবপুর থানার সাধারণ ডায়েরি (জিডি)—উভয় সরকারি নথিতেই স্পষ্ট লেখা রয়েছে যে, ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নির্দেশে কমান্ডার মোহাম্মদ আশিকুর রহমানের নেতৃত্বেই সোয়াত টিম সেখানে অবস্থান নেয়, ঘেরাও করে এবং অপারেশন পরিচালনা করে। নথির কোথাও জুনিয়র কর্মকর্তা জাহাঙ্গীরের নেতৃত্বের কথা উল্লেখ নেই।
সবচেয়ে চাঞ্চল্যকর বিষয় হলো, আশিকুর রহমান নিজের পিঠ বাঁচাতে যার ওপর সমস্ত দায় চাপিয়েছেন, সেই এসি জাহাঙ্গীর হাসান অভিযানের শুরুতেই জঙ্গিদের গুলিতে বুকে আঘাত পেয়ে কার্যত নিষ্ক্রিয় ও গুরুতর আহত হয়ে পড়েছিলেন। প্রত্যক্ষদর্শী সোয়াত কর্মকর্তা এএসআই রাশেদুল ইসলাম নিশ্চিত করেছেন যে, বুলেটপ্রুফ ভেস্টে গুলি লেগে জাহাঙ্গীর আহত হওয়ার পর তাঁকে উদ্ধার করে হাসপাতালে পাঠানো হয়। সোয়াতের মতো কঠোর চেইন অব কমান্ডের ইউনিটে কমান্ডারের উপস্থিতিতে একজন আহত জুনিয়র কর্মকর্তার পক্ষে অভিযানের নেতৃত্ব দেওয়া কোনোভাবেই সম্ভব নয়।
মিথ্যা জবানবন্দির বিষয়ে বিস্ময় প্রকাশ করে এসি জাহাঙ্গীর হাসান সংবাদমাধ্যমকে জানান, বড় স্যারদের নির্দেশে আশিকুর স্যারই তাঁদেরকে ৩টি দলে ভাগ করে ভেতরে ঢোকার নির্দেশ দিয়েছিলেন। সিনিয়র কর্মকর্তার উপস্থিতিতে জুনিয়রের কমান্ড করার কোনো সুযোগ নেই উল্লেখ করে আশিকুর রহমান কেন এমন অসত্য বললেন, তা তাঁর বোধগম্য নয়। এই গুরুতর জালিয়াতি ও দায় এড়ানোর বিষয়ে জানতে চাইলে অ্যাডিশনাল ডিআইজি আশিকুর রহমান সুকৌশলে মন্তব্য এড়িয়ে গিয়ে বলেন, বিষয়টি যেহেতু বর্তমানে আইনগত তদন্তাধীন (সাব-জুডিশিয়াল), তাই এই মুহূর্তে তিনি কোনো কথা বলতে চান না।
বর্তমানে ৫ আগস্টের পর চাঁপাইনবাবগঞ্জ, কল্যাণপুর ও গাজীপুরের এই কথিত জঙ্গিবিরোধী অভিযানগুলো নিয়ে ট্রাইব্যুনালে একের পর এক হত্যা ও গুমের মামলা হওয়ায় পুলিশের কাউন্টার টেররিজম (সিটিটিসি) ও সোয়াতের ভেতরে চরম আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। ইতিমধ্যে সিটিটিসির একাধিক শীর্ষ কর্মকর্তা কারাগারে রয়েছেন এবং অন্তত ২০ জন ক্যাডার কর্মকর্তা গ্রেপ্তার বা হয়রানির ভয়ে কর্মস্থলে অনুপস্থিত থেকে আত্মগোপনে চলে গেছেন।







