পাইকারি ও খুচরা পর্যায়ে বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। এ লক্ষ্যে বিদ্যুৎ উৎপাদন ও বিতরণকারী সংস্থাগুলো তাদের প্রস্তাব বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি)-এর কাছে জমা দিয়েছে। এসব প্রস্তাবের ওপর আজ বুধবার থেকে রাজধানীর কৃষিবিদ ইনস্টিটিউশনে দুই দিনব্যাপী গণশুনানি শুরু হচ্ছে।
প্রস্তাব অনুযায়ী, পাইকারি পর্যায়ে প্রতি ইউনিট বিদ্যুতের দাম ১.২০ টাকা (১৭ শতাংশ) থেকে ১.৫০ টাকা (২১ শতাংশ) পর্যন্ত বাড়ানো হতে পারে। একই সঙ্গে খুচরা পর্যায়ে গ্রাহক পর্যায়ে প্রতি ইউনিটে ১.২৯ টাকা (১৪.২১ শতাংশ) থেকে ১.৬১ টাকা (১৭.৭৬ শতাংশ) পর্যন্ত মূল্যবৃদ্ধির প্রস্তাব করা হয়েছে।
বিইআরসি সূত্র জানিয়েছে, বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (পিডিবি), পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ড, ডেসকো, ডিপিডিসি, ওজোপাডিকো এবং নেসকোর প্রস্তাবগুলো বর্তমানে পর্যালোচনা করা হচ্ছে।
শুনানি শেষে চূড়ান্ত অনুমোদন মিললে আগামী জুন মাসের শুরু থেকেই নতুন মূল্যহার কার্যকর করতে চায় সংশ্লিষ্ট বিতরণ কোম্পানিগুলো। সরকারের পক্ষ থেকেও এ বিষয়ে ইতিবাচক মনোভাব রয়েছে বলে জানা গেছে।
বিদ্যুৎ বিভাগের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানান, বর্তমানে প্রতি ইউনিট বিদ্যুৎ উৎপাদনে ব্যয় হচ্ছে ১২ টাকার বেশি, অথচ গড় বিক্রয়মূল্য মাত্র সাত টাকার কিছু বেশি। ফলে সরকারকে প্রতি ইউনিটে প্রায় পাঁচ টাকা ভর্তুকি দিতে হচ্ছে।
তিনি আরও জানান, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে বিদ্যুৎ খাতে ৩৮ হাজার ৬৩৭ কোটি টাকা ভর্তুকি দেওয়ার পরও ১৭ হাজার ২১ কোটি টাকা লোকসান হয়েছে। চলতি অর্থবছর শেষে এ ঘাটতি ৫৬ হাজার কোটি টাকায় পৌঁছাতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। সরকারের লক্ষ্য, দাম বাড়িয়ে অন্তত ১০ হাজার কোটি টাকা ভর্তুকি কমানো।
তবে এ উদ্যোগের সমালোচনা করেছেন জ্বালানি খাতের বিশেষজ্ঞরা। তাদের মতে, বিগত দেড় দশকে বিদ্যুৎ খাতে ব্যাপক অনিয়ম ও লুটপাটের দায় এখন সাধারণ জনগণের ওপর চাপানো হচ্ছে।
বিদ্যুৎ বিভাগের পাঠানো চিঠিতে বলা হয়েছে, মধ্যপ্রাচ্যের চলমান পরিস্থিতি বিবেচনায় নিয়ে বিদ্যুতের পাইকারি ও খুচরা মূল্য সমন্বয়ের বিষয়ে মন্ত্রিসভায় আলোচনা হয়েছে। এ লক্ষ্যে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীর নেতৃত্বে একটি কমিটিও গঠন করা হয়েছে।
পিডিবির হিসাবে, ২০২৬-২৭ অর্থবছরে বিদ্যুৎ উৎপাদন ও ক্রয়ে মোট ব্যয় দাঁড়াতে পারে ১৪ লাখ ৩১ হাজার ৮৭ দশমিক ১ মিলিয়ন টাকা। এতে প্রতি ইউনিট বিদ্যুতের গড় সরবরাহ ব্যয় হবে ১২.৯১ টাকা। বিদ্যমান ট্যারিফে সম্ভাব্য রাজস্ব আয় হবে ৭ লাখ ৭৫ হাজার ৫৩৮ দশমিক ৪ মিলিয়ন টাকা, ফলে বিশাল ঘাটতি তৈরি হবে।
স্ল্যাব পরিবর্তনের প্রস্তাব
দাম বৃদ্ধির পাশাপাশি আবাসিক গ্রাহকদের জন্য বিদ্যমান ৭৬-২০০ ইউনিট স্ল্যাব পরিবর্তন করে শূন্য থেকে ২০০ ইউনিট পর্যন্ত নতুন স্ল্যাব চালুর প্রস্তাব দিয়েছে পিডিবি।
এতে সরকার চলতি অর্থবছরে প্রায় ২ হাজার ৬৫৭ কোটি টাকা এবং আগামী অর্থবছরে প্রায় ২ হাজার ৮৪৫ কোটি টাকা অতিরিক্ত ভর্তুকি কমাতে পারবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
পিডিবির দাবি, নতুন স্ল্যাব ব্যবস্থার মাধ্যমে দরিদ্র গ্রাহকদের সুরক্ষা নিশ্চিত করা সম্ভব হবে এবং মধ্যবিত্ত গ্রাহকরা বিদ্যুৎ সাশ্রয়ে আরও সচেতন হবেন। একই সঙ্গে অপেক্ষাকৃত সচ্ছল গ্রাহকদের জন্য ভর্তুকির পরিমাণ কমে আসবে।
পিডিবির এক কর্মকর্তা জানান, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে প্রতি ইউনিট বিদ্যুতের উৎপাদন ব্যয় ছিল ১১.৮৩ টাকা, অথচ বিক্রি করা হয়েছে ৬.৯৯ টাকায়। ফলে প্রতি ইউনিটে প্রায় ৫.৯৯ টাকা লোকসান গুনতে হয়েছে প্রতিষ্ঠানটিকে। বর্তমানে এই লোকসান আরও বেড়েছে বলে তিনি উল্লেখ করেন।







