রাজধানীর মিরপুরের রূপনগরে শতকোটি টাকার সরকারি জমি দখলে নেওয়ার জন্য একজোট হয়েছেন স্থানীয় বিএনপি এবং কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা। গত ৯ মে জাতীয় গৃহায়ণ কর্তৃপক্ষের (জাগৃক) মালিকানাধীন ওই বিশাল জমিটি তারা নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নেন। রূপনগরের দুয়ারীপাড়া সেকশন-৮-এর ক ও খ ব্লকের রাস্তা সংলগ্ন এই সরকারি জায়গাটিতে লোহার পাইপ, অ্যাঙ্গেল এবং টিনের বেষ্টনী দিয়ে বাউন্ডারি দিয়ে দিয়েছেন দখলকারীরা। এই নজিরবিহীন জালিয়াতির ঘটনায় রূপনগর থানায় একটি লিখিত অভিযোগ ও সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেছে জাগৃক কর্তৃপক্ষ।
জাতীয় গৃহায়ণ কর্তৃপক্ষের ঢাকা উপবিভাগ-১-এর লিখিত অভিযোগ সূত্রে জানা গেছে, বহু বছর আগে ১৯৯০ সালের ২০ সেপ্টেম্বর প্রকাশিত সরকারি গেজেটের মাধ্যমে এই জমিটির অধিগ্রহণ সম্পন্ন করা হয়। এরপর ভূমির বৈধ দখল জাতীয় গৃহায়ণ কর্তৃপক্ষ বরাবর হস্তান্তর করা হয়েছিল। কিন্তু গত ৯ মে সকাল ১০টার দিকে ২০ থেকে ২৫ জনের একটি সশস্ত্র দখলদার দল আচমকা ওই জমিতে ঢুকে পড়ে। তারা ১ থেকে ৫ নম্বর রোডের পূর্বদিকের ৪০ ফুট প্রস্থের সরকারি রাস্তাসহ মূল জমিটি দখল করে লোহার পাইপ ও শিট দিয়ে ঘিরে ফেলে। কর্তৃপক্ষের লোকজন বাধা দিলেও তারা তা অমান্য করে কাজ চালিয়ে যায়।
থানায় দেওয়া লিখিত অভিযোগে জাগৃক কর্তৃপক্ষ সরকারি জমি দখলদার চক্রের মূল হোতাদের নাম উল্লেখ করেছে। অভিযুক্তদের মধ্যে মোবারক হোসেন মেম্বার ও মো. রাজু (চান্দি রাজু) কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের নেতা হিসেবে পরিচিত। আর বাকি অভিযুক্তদের মধ্যে শিপু মোল্লা, আমজাদ হোসেন মোল্লা, জাকির হোসেন শান্ত, মো. সিয়াব উদ্দিন, মো. নজরুল ইসলাম, ফার্নিচার নাসির, দুলাল, আক্তার হোসেন, স্বপন, আইজল, আরিফ, সুমন ও সোহেল স্থানীয় বিএনপি, যুবদল ও স্বেচ্ছাসেবক দলের রাজনীতির সঙ্গে জড়িত। দল ভিন্ন হলেও সরকারি জমি গ্রাস করতে তারা একজোট হয়েছেন।
সরকারি খাসজমি দখলের পাশাপাশি এই সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে এলাকায় তীব্র চাঁদাবাজিরও অভিযোগ উঠেছে। স্থানীয় ভুক্তভোগীরা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানিয়েছেন, এই চক্রের সদস্যরা ওই এলাকার নির্মাণাধীন বাড়িগুলোতে গিয়ে বাড়ির মালিকের বদলে তাদের কাছে বাসা ভাড়ার টাকা পরিশোধ করার জন্য ভাড়াটেদের হুমকি দিচ্ছে। এছাড়া নতুন কোনো প্লটে সাধারণ মানুষ বা মালিকরা নির্মাণকাজ শুরু করতে গেলে এই চক্রটি মোটা অঙ্কের চাঁদা দাবি করে কাজ বন্ধ করে দেওয়ার ভয়ভীতি দেখাচ্ছে।
দুয়ারীপাড়ায় জাতীয় গৃহায়ণ কর্তৃপক্ষের এই জায়গাটি ঘিরে দখলদারির ইতিহাস বেশ পুরনো। এর আগে ১৯৭২-৭৩ সালের এল.এ. কেস মূলে জমিটি অধিগ্রহণ করে ৪৭৪টি প্লট তৈরি করে বিভিন্ন ব্যক্তির নামে বরাদ্দ দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু অবৈধ দখলের কারণে দীর্ঘদিন প্রকৃত মালিকদের জমি হস্তান্তর করা সম্ভব হয়নি। পরবর্তীতে ২০১৯ সালে সরকার এক বিশাল উচ্ছেদ অভিযান চালিয়ে অবৈধ দখলদারদের তাড়িয়ে সীমানাপ্রাচীর নির্মাণ করে। কিন্তু ২০২৪ সালের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর সেই পুরনো ভূমিদস্যুরাই রাজনৈতিক খোলস পাল্টে আবারও সরকারি জমিটি দখলে মেতে উঠেছে।
সরকারি সম্পত্তি রক্ষায় অবৈধ দখল বন্ধ, টিনের বেষ্টনী উচ্ছেদ এবং এই অপরাধী চক্রের বিরুদ্ধে দ্রুত আইনগত ব্যবস্থা নিতে পুলিশি টহল বাড়ানোর জোর দাবি জানিয়েছে জাতীয় গৃহায়ণ কর্তৃপক্ষ। এই চাঞ্চল্যকর জমি দখলের বিষয়ে বিস্তারিত জানতে রূপনগর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. নোমান হোসেনের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলে তাৎক্ষণিকভাবে তাঁর বক্তব্য পাওয়া যায়নি। একই সাথে জাগৃকের সংশ্লিষ্ট উপসহকারী প্রকৌশলী মাহমুদুর রহমানের ফোনে যোগাযোগ করা হলেও তাঁর পক্ষ থেকে কোনো সাড়া মেলেনি।







