ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর দীর্ঘ সময় পার হলেও রাজনৈতিক অবস্থান পরিবর্তন বা দল পুনর্গঠনে বড় কোনো সংস্কারের ইঙ্গিত নেই বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতৃত্বে। দলটিকে রাজনৈতিকভাবে পরিশুদ্ধ বা ‘রিফাইন্ড’ করার ধারণা নিয়ে ভেতরে-বাইরে কিছু আলোচনা থাকলেও দলের সভাপতি শেখ হাসিনা এতে একেবারেই আগ্রহী নন। এই পরিস্থিতিতে দলটির সাধারণ নেতা-কর্মীদের রাজনীতিতে ফেরার পথ এখনো সম্পূর্ণ অস্পষ্ট রয়ে গেছে। দলের বড় একটি অংশ এখন চরম হতাশায় ভুগছেন, আর বাকিরা বর্তমান সরকারের বড় কোনো ভুল বা অজনপ্রিয় হয়ে ওঠার অপেক্ষায় দিন গুনছেন।
দলীয় দায়িত্বশীল সূত্রগুলো জানিয়েছে, গত ফেব্রুয়ারি মাসে অনুষ্ঠিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে এবং পরে বন্ধুপ্রতিম দেশ ও শুভাকাঙ্ক্ষীদের পক্ষ থেকে তুলনামূলক কম বিতর্কিত নেতাদের সামনে এনে দল সংস্কারের একটি জোরালো প্রস্তাব শেখ হাসিনার কাছে পাঠানো হয়েছিল। তবে তিনি দলের সভাপতির পদ ছাড়তে সাফ অস্বীকৃতি জানান। বড়জোর তাঁর পছন্দের এবং বিদেশে অবস্থানরত কোনো নেতাকে দলের মুখপাত্র হিসেবে দায়িত্ব দেওয়ার একটি বিকল্প ইঙ্গিত তিনি দেন, যা শুভাকাঙ্ক্ষীদের সন্তুষ্ট করতে পারেনি। ফলে ‘রিফাইন্ড আওয়ামী লীগ’ গঠনের সেই পরিকল্পনা এখন কার্যত স্থগিত হয়ে পড়েছে।
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার গণ–অভ্যুত্থানে সরকার পতনের পর বর্তমানে দলটির অনলাইন কার্যক্রম ও মাঠপর্যায়ের তৎপরতায় দেখা যাচ্ছে যে, দলে বিতর্কিত ও কট্টরপন্থীরাই বেশি সক্রিয়। অতীত শাসনকালের ভুল স্বীকার বা কোনো ধরনের অনুশোচনা প্রকাশের বদলে তারা ঝটিকা মিছিল ও স্লোগান দিয়ে রাজপথে উত্তেজনা সৃষ্টির চেষ্টা করছে। এর ফলে সংস্কারের মাধ্যমে দলের একটি ইতিবাচক ভাবমূর্তি ফিরিয়ে আনার বিষয়ে যারা আশাবাদী ছিলেন, দলের সেই অংশটি এখন পুরোপুরি নিশ্চুপ হয়ে গেছেন।
বর্তমানে শেখ হাসিনা নিজেই দলের সব নীতিনির্ধারণ করছেন এবং এতে তাঁর পরিবারের সদস্যরাও যুক্ত রয়েছেন। আত্মগোপনে ও দেশে থাকা নেতা-কর্মীদের সংগঠিত করার কাজে সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য জাহাঙ্গীর কবির নানক এবং যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আ ফ ম বাহাউদ্দিন নাছিম সক্রিয় আছেন। এছাড়া ভারতের কলকাতায় অবস্থানরত সাবেক এক মন্ত্রী প্রশাসনের ভেতরে যোগাযোগ রাখছেন এবং সাবেক তথ্য প্রতিমন্ত্রী মোহাম্মদ এ আরাফাত ও দপ্তর সম্পাদক বিপ্লব বড়ুয়াসহ কয়েকজন নেতা বিদেশি সংস্থাগুলোর সাথে চিঠিপত্র আদান-প্রদানের দায়িত্ব পালন করছেন।
আওয়ামী লীগের একটি অংশের ধারণা, সংস্কার না করায় আন্তর্জাতিক মহলে দলটির গ্রহণযোগ্যতা কমেছে এবং কোনো বিদেশি শক্তি তাদের রাজনীতিতে ফেরাতে বড় ভূমিকা রাখবে না। অনেকের ধারণা ছিল বিএনপি ক্ষমতায় এলে আওয়ামী লীগের ওপর কঠোরতা কমবে, তবে শেখ হাসিনার নেতৃত্বে পুরোনো আওয়ামী লীগকে কেউ সহজভাবে গ্রহণ করবে না। দলটির বর্তমান রাজনীতি অনেকটাই দিশাহীন। শেখ হাসিনা আগে দলীয় নেতাদের দেশে ফিরে মামলা মোকাবিলার নির্দেশ দিলেও জামিন না পাওয়ার অনিশ্চয়তা এবং গ্রেপ্তারের ভয়ে বিদেশে বা আত্মগোপনে থাকা নেতাদের কেউই এখন পর্যন্ত সেই নির্দেশ মানেননি।
২০২৪ সালের গণ–অভ্যুত্থানের পর দলটির কার্যক্রম নিষিদ্ধ হওয়ায় তারা বর্তমানে মারাত্মক সাংগঠনিক সংকটে রয়েছে। অধিকাংশ শীর্ষ নেতা বিদেশে পলাতক এবং অনেকে কারাগারে আছেন। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, আওয়ামী লীগকে দেশের রাজনীতিতে যদি কখনো ফিরতে হয়, তবে অবশ্যই তাদের অতীত শাসন আমলের জবাবদিহি ও ভুল স্বীকার করতে হবে। কিন্তু দলটি সেই পথে না হেঁটে কেবলই এক অনিশ্চিত রাজনৈতিক পরিবর্তনের অপেক্ষায় দিন পার করছে, যার কোনো সুনির্দিষ্ট দিক বা সময়সীমা নেই।







