ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসন আর বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু সরকারের সমস্ত সামরিক ও রাজনৈতিক হিসাব-নিকাশ উল্টে দিয়ে মধ্যপ্রাচ্যে এক নতুন ভূরাজনৈতিক সমীকরণের জন্ম দিয়েছে ইরান। সাম্প্রতিক যুদ্ধ পরিস্থিতি প্রমাণ করে দিয়েছে যে, মধ্যপ্রাচ্যের আকাশ এখন কার নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। সৌদি আরবের তেলক্ষেত্রে ধেয়ে আসা ক্ষেপণাস্ত্রগুলো শুধু যে ইরাক বা ইরান থেকে এসেছে তা নয়, বরং দক্ষিণ দিক অর্থাৎ ইয়েমেন থেকেও একযোগে আঘাত হেনেছে। আপাতদৃষ্টিতে সুন্নি দেশগুলোর যে নতুন আঞ্চলিক জোট গড়ে উঠছে, তারা হয়তো নিজেদের প্রকাশ্যে ইসরায়েল-বিরোধী বলবে না, কিন্তু পর্দার আড়ালের সত্য হলো এই জোটের শক্তিশালী উপস্থিতি ইসরায়েলের জন্য মোটেও কোনো শুভ বার্তা বয়ে আনছে না।
চলমান যুদ্ধে পরাজয়ের মুখ থেকে কোনোমতে নিজেদের মুখরক্ষা করতে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ‘ট্রুথ সোশ্যাল’-এ একের পর এক বিভ্রান্তিকর পোস্ট দিয়ে যাচ্ছেন। তিনি এখন ইরানকে অবাস্তবভাবে ‘আব্রাহাম একর্ড’ বা আব্রাহাম চুক্তিতে অন্তর্ভুক্ত করার শেষ খড়কুটো আঁকড়ে ধরার চেষ্টা করছেন। ট্রাম্প দাবি করছেন, ইরানের সাথে এই চুক্তি নাকি এক ঐতিহাসিক ঘটনা হবে এবং বিশ্বের বড় বড় নেতারা ইরানকে এই জোটে পেয়ে সম্মানিত বোধ করবেন। কিন্তু রূঢ় বাস্তব হলো, ট্রাম্পের এই অনুনয়-বিনয়কে রিয়াদ বা তেহরান একেবারেই পাত্তাই দিচ্ছে না, ফলে ওয়াশিংটনের ভাগ্যে জুটছে কেবলই এক বধির নীরবতা।
মাটির পৃথিবীর বাস্তব চিত্র এখন সম্পূর্ণ ভিন্ন রূপ নিয়েছে। ইরান বর্তমানে পারস্য উপসাগরের সবচেয়ে প্রভাবশালী খেলোয়াড় হিসেবে নিজেকে শক্ত অবস্থানে প্রতিষ্ঠিত করেছে। ওমানের সাথে কাঁধ মিলিয়ে তেহরান বিশ্ব বাণিজ্যের অন্যতম প্রধান রুট হরমুজ প্রণালির ওপর কার্যত এমন একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করেছে, যা তারা আর কখনোই হাতছাড়া করবে না। তেহরানের নীতি নির্ধারকদের কাছে তাদের সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের চেয়েও এই প্রণালির কৌশলগত নিয়ন্ত্রণ অনেক বেশি মূল্যবান। ট্রাম্প এবং নেতানিয়াহু যতই দাবি করুন যে তারা ইরানের বিমানবাহিনী বা নৌবাহিনী ধ্বংস করে দিয়েছেন, ড্রোন, ক্ষেপণাস্ত্র আর নৌ-মাইনের শক্তিতে বলীয়ান ইরানের প্রকৃত সামরিক ক্ষমতাকে তারা বিন্দুমাত্র স্পর্শও করতে পারেননি।
ইরান এখন হরমুজ প্রণালিকে পানির কলের মতো নিজের ইচ্ছে অনুযায়ী যখন খুশি চালু করতে পারে, আবার যখন খুশি বন্ধ করতে পারে। সাম্প্রতিক দিনগুলোতে মার্কিন নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে চীনের দিকে রওনা হওয়া তেলবাহী ট্যাংকারগুলোর নির্বিঘ্ন চলাচলই প্রমাণ করে যে, এই অঞ্চলের মূল বাণিজ্যপথের চাবিকাঠি এখন সম্পূর্ণ কার হাতে রয়েছে। এই অভূতপূর্ব বিজয় মধ্যপ্রাচ্যের প্রতিরোধ আন্দোলনগুলোকে এক নতুন সঞ্জীবনী সুধা এনে দিয়েছে। পেজার বিস্ফোরণ আর একের পর এক ইসরায়েলি বিমান হামলায় লেবাননের হিজবুল্লাহকে যারা পুরোপুরি মৃত বলে ধরে নিয়েছিল, তারা এখন রণক্ষেত্রে হিজবুল্লাহর এক শক্তিশালী নতুন প্রজন্মের উত্থান দেখছে।
অভ্যন্তরীণ যোগাযোগ ব্যবস্থা হ্যাক হওয়ার পর হিজবুল্লাহর নতুন যোদ্ধারা এখন ফোন বা যেকোনো ডিজিটাল ডিভাইস ধরা সম্পূর্ণ বন্ধ করে দিয়েছে। এর বদলে তারা যুদ্ধক্ষেত্রে নিয়ে এসেছে রাডার ফাঁকি দিতে সক্ষম অত্যন্ত আধুনিক ‘এফপিভি ড্রোন’। এই ড্রোনের নিখুঁত আঘাতে লেবানন সীমান্ত রক্ষা করতে তারা লেবানন সরকারের চেয়েও ঢের বেশি কার্যকর ভূমিকা রাখছে। ইরানের এই প্রতিরোধ শুধু মধ্যপ্রাচ্যেই সীমাবদ্ধ নেই, এটি বৈশ্বিক ক্ষমতার ভারসাম্যকেও নাড়িয়ে দিয়েছে। বিশ্বমঞ্চে ট্রাম্পের মতো নেতাকে এখন চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের সামনে তীব্র অসহায় ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা যাচ্ছে, যেখানে জিনপিং সরাসরি তাইওয়ান ইস্যুতে ওয়াশিংটনকে কড়া হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করছেন।
বিখ্যাত রাষ্ট্রবিজ্ঞানী ফ্রান্সিস ফুকুয়ামা বর্তমান বৈশ্বিক পরিস্থিতি মূল্যায়ন করে যথার্থই বলেছেন যে, এখন আমেরিকারই বিশ্বের কাছে ‘দুষ্ট রাষ্ট্র’ হিসেবে গণ্য হওয়ার পালা, আর চীন আবির্ভূত হচ্ছে আন্তর্জাতিক স্থিতিশীলতা ও শান্তি চুক্তির মূল বিশ্বস্ত কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে। গত ২৫ বছরে বড় কোনো যুদ্ধে না জড়ানো পরাশক্তি চীন এখন বিশ্বের কাছে অন্যতম বিশ্বস্ততার প্রতীক। ইরানের এই মাথা নত না করার লড়াই আরব বিশ্বের সাধারণ মানুষকে এক শক্তিশালী বার্তা দিচ্ছে। সেই বার্তাটি হলো, যদি বুকে যথেষ্ট সংকল্প আর চরম ত্যাগ স্বীকারের মানসিকতা থাকে, তবে মধ্যপ্রাচ্যের মাঝারি শক্তির দেশগুলোও মার্কিন ও ইসরায়েলি ঔপনিবেশিক আধিপত্যের বিরুদ্ধে অনায়াসে জয়ী হতে পারে।
এদিকে যুদ্ধবিরতির চুক্তি স্বাক্ষরের পর পরিস্থিতি কোন দিকে মোড় নেবে, তা নিয়ে আন্তর্জাতিক মহলে চরম উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। ধারণা করা হচ্ছে, ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহু নিজের পরাজয় লুকাতে লেবানন ও গাজায় আরও তীব্র গতিতে বর্বর বোমাবর্ষণ শুরু করবেন। লিটানি নদীর দক্ষিণের সমস্ত বাড়িঘর, গ্রাম ও শহর মাটির সাথে মিশিয়ে দিয়ে তিনি নিজের রাজনৈতিক ব্যর্থতা ঢাকতে চাইবেন। হয়তো গাজাকে সম্পূর্ণ নিরস্ত্রীকরণ করতে পুরো উপত্যকা নতুন করে দখল করার দুঃসাহসও তিনি দেখাবেন। কিন্তু ইতিহাস বলছে, এই আগ্রাসন হবে নেতানিয়াহুর নিজের রাজনৈতিক কবর খোঁড়ার শামিল, কারণ কোনো সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য অর্জন ছাড়াই ইসরায়েলকে এই যুদ্ধ থেকে ফিরতে হবে।
ট্রাম্প এবং নেতানিয়াহু কেউই আজ নিজেদের দেশের মানুষের চোখের দিকে তাকিয়ে বুক ফুলিয়ে দাবি করতে পারবেন না যে তারা এই যুদ্ধে জয়ী হয়েছেন। ইসলামিক প্রজাতন্ত্র ইরানের কাছে তাদের কৌশলগত পরাজয় এখন বিশ্ববাসীর সামনে সুনিশ্চিত। যুদ্ধ শেষ হওয়া মাত্রই ট্রাম্প হয়তো কিউবার ওপর নতুন করে অবরোধ আরোপের মতো অন্য কোনো আন্তর্জাতিক ইস্যুতে মানুষের নজর ঘোরানোর চেষ্টা করবেন, যাতে গত তিন মাসের এই অজনপ্রিয় ও ব্যয়বহুল যুদ্ধের জবাবদিহিতা থেকে প্রশাসন বাঁচতে পারে।
ইসরায়েলের চাপিয়ে দেওয়া এই যুদ্ধ শুধু যে নতুন প্রজন্মের মার্কিন ইহুদিদের সমর্থন কেড়ে নিয়েছে তা নয়, বরং আমেরিকার কট্টর রিপাবলিকান খ্রিস্টানদের মনেও এখন এই ধারণার জন্ম দিয়েছে যে ইসরায়েল আসলে খোদ যুক্তরাষ্ট্রকেই ভেতরে ভেতরে দখল করে রেখেছে। এই চরম পরাজয়ের পর আবুধাবির মতো আরব রাজতন্ত্রের শাসকদের এখন তেহরানের ক্ষমতার পরিবর্তন নিয়ে ভাবার সময় নেই, বরং তাদের নিজেদের সিংহাসন আর কতদিন টিকবে, সেই চিন্তাই এখন তাদের প্রধান মাথাব্যথা হয়ে দাঁড়িয়েছে।







