বাংলাদেশের রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক অঙ্গনে সম্প্রতি নতুন করে একটি শব্দ বেশ সাড়া ফেলেছে, আর তা হলো ‘কিচেন কেবিনেট’। বিগত অন্তর্বর্তী সরকারের কয়েকজন সাবেক উপদেষ্টার বিস্ফোরক বক্তব্যের পর এই শব্দটি ঘিরে সাধারণ মানুষ ও রাজনৈতিক মহলে তৈরি হয়েছে ব্যাপক কৌতূহল, আলোচনা এবং নতুন বিতর্ক। মূলত সরকারের নীতিনির্ধারণী প্রক্রিয়ায় একটি অনানুষ্ঠানিক ও প্রভাবশালী বিশেষ গোষ্ঠীর অতি-সক্রিয় ভূমিকার অভিযোগ থেকেই বিষয়টি সশব্দে সামনে আসে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, রাষ্ট্রীয় পরিভাষায় ‘কিচেন কেবিনেট’ বলতে মূলত সরকারপ্রধানের অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ, অনুগত ও বিশ্বস্ত এমন একটি গোপন বলয়কে বোঝানো হয়, যারা আনুষ্ঠানিক মন্ত্রিসভার অংশ না হয়েও পর্দার আড়াল থেকে গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্তে সরাসরি প্রভাব বিস্তার করে। এই অনানুষ্ঠানিক উপদেষ্টারা অনেক সময় মূল মন্ত্রীদের চেয়েও বেশি ক্ষমতার অধিকারী হয়ে ওঠেন, যা শাসনব্যবস্থায় এক ধরনের ক্ষমতার ভারসাম্যহীনতা তৈরি করে।
ইতিহাস ঘেঁটে দেখা যায়, ‘কিচেন কেবিনেট’ শব্দটির উৎপত্তি হয়েছিল সুদূর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে। উনিশ শতকের শুরুর দিকে, বিশেষ করে ১৮৩০-এর দশকে যুক্তরাষ্ট্রের সপ্তম প্রেসিডেন্ট অ্যান্ড্রু জ্যাকসনের শাসনকালেই এই ধারণার জন্ম হয়। সে সময় প্রেসিডেন্ট জ্যাকসন তার আনুষ্ঠানিক মন্ত্রিসভার চেয়েও ব্যক্তিগতভাবে কিছু ঘনিষ্ঠ বন্ধু, রাজনৈতিক সহযোগী এবং সংবাদপত্রের সাংবাদিকদের পরামর্শের ওপর অতিরিক্ত নির্ভর করতেন বলে তীব্র সমালোচনা তৈরি হয়। অভিযোগ ছিল, গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্ত গ্রহণে তিনি নিয়মিতভাবে সরকারি মন্ত্রীদের বাইরে থাকা এই অনানুষ্ঠানিক গোষ্ঠীর মতামতকে বেশি গুরুত্ব দিতেন।
এই অনানুষ্ঠানিক উপদেষ্টা বলয়ের সদস্যরা হোয়াইট হাউসের আনুষ্ঠানিক প্রশাসনিক কাঠামোর অংশ না হলেও প্রেসিডেন্টের নীতি নির্ধারণে বড় চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করতেন। তারা অনেক সময় সরকারি বৈঠকের বাইরে, ব্যক্তিগত পরিবেশে বিশেষ করে প্রেসিডেন্টের বাসভবনের রান্নাঘর বা অনানুষ্ঠানিক কক্ষে গোপন আলোচনায় অংশ নিতেন। এই পরিস্থিতিকে ব্যঙ্গ করে তৎকালীন সমালোচকেরা তাদের ‘কিচেন কেবিনেট’ নামে অভিহিত করতে শুরু করেন। পরবর্তীতে এই শব্দটি শুধু যুক্তরাষ্ট্রেই সীমাবদ্ধ থাকেনি, বরং ধীরে ধীরে এটি বিশ্ব রাজনীতিতে ছড়িয়ে পড়ে একটি সাধারণ রাজনৈতিক পরিভাষায় পরিণত হয়।
বাংলাদেশে এই বিষয়টি হঠাৎ করে আলোচনায় আসে সাবেক পররাষ্ট্র উপদেষ্টা তৌহিদ হোসেনের একটি টেলিভিশন সাক্ষাৎকারের পর। তিনি সরাসরি দাবি করেন, অন্তর্বর্তী সরকারের গুরুত্বপূর্ণ নীতিগত সিদ্ধান্তগুলো মূলত একটি ‘সাত সদস্যের প্রভাবশালী অনানুষ্ঠানিক বলয়’ থেকে নিয়ন্ত্রিত হতো। তার ভাষ্যমতে, এই অদৃশ্য গোষ্ঠীটি প্রতি মঙ্গলবার প্রধান উপদেষ্টার বাসভবন যমুনায় বিশেষ বৈঠকে বসত এবং প্রশাসনের গুরুত্বপূর্ণ সব এজেন্ডা নির্ধারণ করত। তিনি আরো অভিযোগ করেন, প্রশাসনিক অভিজ্ঞতার চরম ঘাটতি থাকা সত্ত্বেও ওই বিশেষ বলয়ের মতামতকে সরকারে অতিরিক্ত গুরুত্ব দেওয়া হতো।
সাবেক পররাষ্ট্র উপদেষ্টা তৌহিদ হোসেন আরও জানান, নিজের মন্ত্রণালয়ে অন্যদের এমন অনাকাঙ্ক্ষিত হস্তক্ষেপ ও প্রভাব বিস্তারে তিনি এতটাই বিরক্ত ও ক্ষুব্ধ ছিলেন যে দীর্ঘ কার্যকালে তিনবার পদত্যাগের কথাও গুরুত্বের সাথে ভেবেছিলেন। তবে দেশের ও সরকারের ভাবমূর্তির কথা চিন্তা করে শেষ পর্যন্ত তিনি সেই সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসেন। তাঁর এই স্বীকারোক্তি প্রশাসনের ভেতরের টানাপোড়েনকে জনসমক্ষে উন্মোচন করে দেয়।
অন্যদিকে, সাবেক উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়াও অন্তর্বর্তী সরকারে ‘কিচেন কেবিনেট’ বা একটি নির্দিষ্ট অভ্যন্তরীণ বলয় সক্রিয় থাকার বিষয়টি সংবাদমাধ্যমের কাছে স্বীকার করেছেন। যদিও তিনি জোর দাবি করেন যে, নিজে কোনোদিন ওই বলয়ের সদস্য ছিলেন না। এরও আগে সাবেক উপদেষ্টা ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) এম সাখাওয়াত হোসেনের বিভিন্ন বক্তব্যেও এমন একটি অভ্যন্তরীণ ক্ষমতার বলয়ের স্পষ্ট ইঙ্গিত পাওয়া গিয়েছিল। সব মিলিয়ে, ‘কিচেন কেবিনেট’ এখন শুধু একটি তাত্ত্বিক শব্দ নয়, বরং অন্তর্বর্তী সরকারের ভেতরের ক্ষমতার কাঠামো ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের স্বচ্ছতা নিয়ে নতুন এক রাজনৈতিক বিতর্কের কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে।







