দেশজুড়ে হাম পরিস্থিতি ক্রমেই নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাচ্ছে এবং আক্রান্ত ও মৃত্যুর মিছিল দিন দিন দীর্ঘ হচ্ছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার আগাম সতর্কতা সত্ত্বেও টিকাদানের হার কমে যাওয়ায় বাংলাদেশে হামের এই নতুন প্রাদুর্ভাব ইতিহাসের অন্যতম প্রাণঘাতী রূপ ধারণ করেছে। চিকিৎসাবিষয়ক আন্তর্জাতিক খ্যাতনামা জার্নাল ‘দ্য ল্যানসেট’-এর তথ্য অনুযায়ী, বিগত ২০ বছরের মধ্যে ২০২৪ এবং ২০২৫ সালেই বিশ্বজুড়ে সর্বোচ্চ সংখ্যক হামের প্রাদুর্ভাব রেকর্ড করা হয়েছে, যার চূড়ান্ত খেসারত দিচ্ছে বাংলাদেশ।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সর্বশেষ প্রতিবেদন অনুযায়ী, দেশে গত ২৪ ঘণ্টায় হাম ও হামের উপসর্গ নিয়ে আরও পাঁচ শিশুর করুণ মৃত্যু হয়েছে। এই একই সময়ে নতুন করে আরও ৮৭৭ জন শিশু হামের উপসর্গ ও সংক্রমণ নিয়ে দেশের বিভিন্ন হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে। এর মধ্যে শুধু হামের উপসর্গ নিয়ে ভর্তি হয়েছে ৮২৬ জন এবং শতভাগ নিশ্চিত হাম রোগী হিসেবে শনাক্ত হয়ে ভর্তি হয়েছে ৫১ জন। আজ বৃহস্পতিবার (২৮ মে) প্রকাশিত এই প্রতিবেদনে বুধবার সকাল ৮টা থেকে আজ সকাল ৮টা পর্যন্ত ২৪ ঘণ্টার চিত্র তুলে ধরা হয়েছে।
গত ২৪ ঘণ্টায় মারা যাওয়া শিশুদের মধ্যে রাজধানী ঢাকায় তিনজন, সিলেটে একজন এবং বরিশালে একজন রয়েছে। সরকারি তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের ১৫ মার্চ থেকে এখন পর্যন্ত দেশে হাম ও এর উপসর্গে মোট ৫৬৫ জন নিষ্পাপ শিশুর মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে শুধু হামের উপসর্গে মারা গেছে ৪৭৫ শিশু এবং নিশ্চিতভাবে ল্যাব টেস্টে হাম শনাক্ত হওয়ার পর মারা গেছে আরও ৮৮ শিশু।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিসংখ্যান বলছে, গত ১৫ মার্চ থেকে এ পর্যন্ত দেশে মোট ৬৭ হাজার ৯০৫টি শিশুর শরীরে হামের লক্ষণ বা উপসর্গ দেখা গেছে। এর মধ্যে তীব্র অসুস্থতা নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হতে হয়েছে ৫৪ হাজার ১৮২ জন শিশুকে। অবশ্য চিকিৎসা শেষে এ পর্যন্ত ৫০ Core ৯২৬ জন শিশু সুস্থ হয়ে হাসপাতাল ছেড়ে বাড়ি ফিরে গেছে। এছাড়া দেশে বর্তমানে ল্যাব টেস্টের মাধ্যমে শতভাগ নিশ্চিত হাম রোগীর মোট সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৮ হাজার ৮৮৫ জনে।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, চলতি বছর বিশ্বের অনেক দেশেই হামের পুনরুত্থান দেখা গেলেও বাংলাদেশের মতো এত বিপুল সংখ্যক শিশুর মৃত্যু কোথাও হয়নি। বৈশ্বিক মৃত্যুর তালিকায় বাংলাদেশ এখন শীর্ষ অবস্থানে রয়েছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৬ সালে ভারত, পাকিস্তান, ইয়েমেন, মেক্সিকো, অ্যাঙ্গোলা, কাজাখস্তান, ইন্দোনেশিয়া, সুদান ও ক্যামেরুনসহ বহু দেশে নতুন করে হামের সংক্রমণ ছড়ালেও দ্বিতীয় অবস্থানে থাকা সুদানে মৃতের সংখ্যা এখনও ৪০০ পার হয়নি এবং তৃতীয় অবস্থানে থাকা পাকিস্তানেও তা ১০০ ছুঁতে পারেনি।
এদিকে বাংলাদেশে হামের প্রকোপ মারাত্মক হওয়ার পেছনে আন্তর্জাতিক সংস্থা ইউনিসেফের সময়োচিত সতর্কবার্তাকে কেন্দ্র করে সরকারের অভ্যন্তরে বিতর্ক তৈরি হয়েছে। ইউনিসেফ দাবি করেছে, তারা অন্তত ৫ বার চিঠি দিয়ে এবং বিভিন্ন বৈঠকে ১০ বার অন্তর্বর্তী সরকারকে সতর্ক করেছিল। তবে অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টার সাবেক বিশেষ সহকারী (স্বাস্থ্য) অধ্যাপক ডা. সায়েদুর রহমান এই অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করে জানান, অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে সব টিকা ইউনিসেফের মাধ্যমেই যথাসময়ে সংগ্রহ করা হয়েছিল।
হামের এই ভয়াবহতার প্রকৃত কারণ উদঘাটনে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থাকে দিয়ে একটি ‘স্বাধীন তদন্ত’ করার জন্য অনানুষ্ঠানিক অনুরোধ জানিয়েছে বাংলাদেশ সরকার। প্রধানমন্ত্রীর স্বাস্থ্যবিষয়ক বিশেষ সহকারী এস এম জিয়াউদ্দিন হায়দার জানান, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার কাছ থেকে এ বিষয়ে ইতিবাচক সাড়াও মিলেছে। এর আগে স্বাস্থ্য সচিব জানিয়েছিলেন, টিকার কৃত্রিম সংকট এবং শিশুমৃত্যুর পেছনে কোনো ধরনের প্রশাসনিক গাফিলতি ছিল কিনা, তা তদন্তে অভ্যন্তরীণভাবে খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের রোগ নিয়ন্ত্রণ বিভাগের সাবেক পরিচালক অধ্যাপক ডা. বেনজির আহমদ ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, এই আধুনিক যুগে পাঁচ শতাধিক শিশুর এভাবে মারা যাওয়া অকল্পনীয়। শুরুতেই পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করে দেশে ‘হেলথ ইমার্জেন্সি’ বা মহামারি ঘোষণা করলে এত মৃত্যু দেখতে হতো না। অন্তর্বর্তী সরকারের সিদ্ধান্ত গ্রহণে বিলম্বের কারণে সময়মতো টিকা আসেনি এবং আক্রান্ত শিশুদের মৃত্যুর কারণ অডিট না করায় পরিস্থিতি প্রতিরোধে সঠিক করণীয় খুঁজে পাওয়া যায়নি।
রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (আইইডিসিআর) সাবেক প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ডা. মুশতাক হোসেন সতর্ক করে বলেছেন, দেশের চলমান এই প্রাদুর্ভাব আরও এক থেকে দুই মাস স্থায়ী হতে পারে। তিনি উল্লেখ করেন, হামের অন্যতম প্রধান কারণ হলো শিশুদের অপুষ্টি। নিম্ন আয়ের মানুষ যেখানে তিনবেলা ঠিকমতো খেতে পারে না, সেখানে তারা ঘরে শিশুদের আলাদা রাখা বা কোয়ারেন্টাইন করতে পারছে না। ফলে ছোঁয়াচে এই রোগটি বস্তি ও নিম্নবিত্ত এলাকায় দ্রুত ছড়াচ্ছে, যার জন্য অবিলম্বে ‘কমিউনিটি কোয়ারেন্টাইন’ চালু করা দরকার।
ডা. মুশতাক হোসেন টিকাদান কার্যক্রমের ত্রুটি তুলে ধরে বলেন, এবার নিখুঁতভাবে মাইক্রোপ্ল্যান না করায় লক্ষ্যমাত্রার বাইরে বহু শিশু টিকা থেকে বাদ পড়েছে। এছাড়া আক্রান্ত এলাকার চারপাশকে কর্ডন বা অবরুদ্ধ করে ‘রিং ভ্যাকসিনেশন’ বা বিশেষ টিকাদান জোরালোভাবে পরিচালিত না করায় রোগটি নির্দিষ্ট ক্লাস্টারে সীমাবদ্ধ না থেকে সম্পূর্ণ নতুন নতুন এলাকায় ছড়িয়ে পড়ছে।
উদ্ভূত পরিস্থিতির মুখে সরকারের অবস্থান পরিষ্কার করে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন জানিয়েছেন, বিশেষ ক্যাম্পেইনের মেয়াদ গত ২০ মে শেষ হলেও দেশের টিকাদান কার্যক্রম কোনোভাবেই বন্ধ হবে না। সব সিভিল সার্জন ও হাসপাতাল পরিচালকদের কড়া নির্দেশ দেওয়া হয়েছে যে, দেশের একটি শিশুও টিকার বাইরে থাকা পর্যন্ত খুঁজে খুঁজে টিকাদান এবং এলাকাভিত্তিক সচেতনতামূলক মাইকিং কার্যক্রম চলমান রাখতে হবে।







