মিয়ানমারের সাবেক সেনাপ্রধান ও বর্তমান বেসামরিক প্রেসিডেন্ট জেনারেল মিন অং হ্লেইং রাষ্ট্রপ্রধান হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর নিজের প্রথম দ্বিপক্ষীয় বিদেশ সফরে ভারতে পৌঁছেছেন। আজ শনিবার রাজধানী নেইপিদো থেকে রাষ্ট্রীয় ৫ দিনের সফরে নয়াদিল্লির উদ্দেশে রওনা হন তিনি। এবারের এই হাইপ্রোফাইল সফরে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সঙ্গে মিয়ানমারের প্রেসিডেন্টের একটি গুরুত্বপূর্ণ দ্বিপক্ষীয় বৈঠকের সূচি রয়েছে।
ভৌগোলিক দিক থেকে ভারতের মিজোরাম, মণিপুর, অরুণাচল এবং নাগাল্যান্ড— এই চারটি সীমান্তবর্তী রাজ্যের সঙ্গে মিয়ানমারের প্রায় ১ হাজার ৬৪৩ কিলোমিটার দীর্ঘ স্পর্শকাতর সীমান্ত রয়েছে। একসময় ভারতের সঙ্গে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার এই দেশটির অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক ও বাণিজ্যিক সম্পর্ক বেশ সুদৃঢ় ছিল। তবে ২০২১ সালে এক রক্তক্ষয়ী সামরিক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে অং সান সু চির গণতান্ত্রিক সরকারকে হটিয়ে সেনাবাহিনী ক্ষমতা দখল করার পর সেই সম্পর্কে চরম ছেদ পড়ে। তৎকালীন সেনাপ্রধান জেনারেল মিন অং হ্লেইং নিজেই এই অভ্যুত্থানে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন।
সেনাবাহিনী ক্ষমতা দখলের দীর্ঘ প্রায় ৫ বছর পর, গত ২০২৫ সালের ডিসেম্বর ও জানুয়ারি মাসে মিয়ানমারে একটি জাতীয় নির্বাচনের আয়োজন করে সামরিক জান্তা। সেই বিতর্কিত নির্বাচনে কথিত জয় লাভ করে আনুষ্ঠানিকভাবে দেশের প্রেসিডেন্ট হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেন মিন অং হ্লেইং। পরবর্তীতে চলতি বছরের গত ১০ এপ্রিল তিনি মিয়ানমারের নতুন প্রেসিডেন্ট হিসেবে আনুষ্ঠানিকভাবে শপথ গ্রহণ করেন।
মিয়ানমার বিষয়ক আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, ২০২১ সালে নোবেলজয়ী নেত্রী অং সান সুচির নেতৃত্বাধীন এনএলডি সরকারকে হটিয়ে ক্ষমতার মসনদ দখলের পর থেকেই আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে কার্যত চরম ‘একঘরে’ ও বিচ্ছিন্ন অবস্থায় রয়েছে মিয়ানমার। গণতান্ত্রিক পরিবেশ ধূলিসাৎ হওয়ায় প্রতিবেশী ভারতের সঙ্গে তো বটেই, এমনকি দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোর প্রভাবশালী আঞ্চলিক জোট ‘আসিয়ান’-এর সঙ্গেও দেশটির কূটনৈতিক সম্পর্ক বর্তমানে তলানিতে ঠেকেছে।
এই আন্তর্জাতিক দূরত্বের প্রধান কারণ হলো মিয়ানমারে দীর্ঘদিনের গণতন্ত্রহীনতা এবং অভ্যুত্থান-পরবর্তী সময়ে দেশটির সাধারণ ও নিরীহ জনগণকে লক্ষ্য করে সামরিক বাহিনীর অবর্ণনীয় নির্যাতন ও দমনপীড়ন। অং সান সু চিসহ এনএলডির হাজার হাজার রাজনৈতিক নেতা-কর্মী, সমর্থক ও নির্বাচিত সংসদ সদস্য গত ৫ বছর ধরে দেশটির বিভিন্ন কারাগারে বন্দি আছেন। জান্তার এই স্বৈরাচারী সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে গণতন্ত্রপন্থিরা যে শান্তিপূর্ণ আন্দোলন শুরু করেছিলেন, তা নিষ্ঠুরভাবে দমন করেছে সেনাবাহিনী, যার ফলে গত ৫ বছরে সেনাসদস্যদের গুলিতে প্রাণ হারিয়েছেন কয়েক হাজার বেসামরিক মানুষ।
সামরিক বাহিনীর এই ভয়াবহ ও ক্রমাগত সহিংসতার কারণে আসিয়ান জোটের শীর্ষস্থানীয় বৈঠকগুলোতে মিয়ানমারের সামরিক কর্মকর্তাদের অংশগ্রহণের ওপর কঠোর নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়েছে। এর পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপীয় ইউনিয়ন এবং তাদের মিত্র এশীয় দেশগুলোর কূটনৈতিক দরজাও মিয়ানমারের জন্য সম্পূর্ণ বন্ধ। সু চি সরকারকে হটিয়ে ক্ষমতা দখলের পরপরই মিয়ানমারের সেনাবাহিনীর ওপর যে অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক নিষেধাজ্ঞা জারি করেছিল পশ্চিমা বিশ্ব, তা এখনও সমানভাবে বলবৎ আছে।
আন্তর্জাতিক থিঙ্কট্যাংক সংস্থা ক্রাইসিস গ্রুপের মিয়ানমার বিষয়ক জ্যেষ্ঠ বিশেষজ্ঞ রিচার্ড হোর্সি এই সফরের গুরুত্ব তুলে ধরে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম রয়টার্সকে বলেছেন, সামরিক উর্দি ছেড়ে বেসামরিক পোশাক ধারণ করার পর থেকেই প্রেসিডেন্ট মিন অং…হ্লেইং তাঁর আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক বিচ্ছিন্নতা কাটানোর জন্য মরিয়া হয়ে উঠেছেন। এই বিশেষ ভারত সফরের মাধ্যমে তিনি মূলত দুটি প্রধান উদ্দেশ্য পূরণ করতে চান। প্রথমত, ভারতের সঙ্গে নতুনভাবে দ্বিপক্ষীয় ও কৌশলগত ঘনিষ্ঠতা বৃদ্ধি করা এবং দ্বিতীয়ত, দিল্লির সঙ্গে এই মিত্রতাকে একটি রেফারেন্স হিসেবে ব্যবহার করে আসিয়ানের সঙ্গে মিয়ানমারের বৈরী সম্পর্ককে পুনরায় স্বাভাবিক করা। ভারতের এই সফর যদি শেষ পর্যন্ত সফল হয়, তবে আসিয়ান জোটের দেশগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক পুনরুদ্ধারের কাজে মিয়ানমার অনেকখানি এগিয়ে যাবে।







