ফিলিস্তিনের গাজা উপত্যকায় ইসরায়েলি বোমাবর্ষণ ও সামরিক অভিযানের মুখে যখন লাখ লাখ মানুষ বেঁচে থাকার লড়াইয়ে ব্যস্ত, তখন ২০২৪ সালের জানুয়ারিতে নেদারল্যান্ডসের হেগের আন্তর্জাতিক বিচার আদালতে (আইসিজে) এক ঐতিহাসিক শুনানি শুরু হয়। গণহত্যা অপরাধ প্রতিরোধ ও শাস্তি সংক্রান্ত কনভেনশনের প্রায় আট দশকের ইতিহাসে মাত্র কয়েকটি মামলাই এই সর্বোচ্চ আদালত পর্যন্ত পৌঁছেছে। দক্ষিণ আফ্রিকা বিশ্ব আদালতের কাছে গাজায় ইসরায়েলি হামলাকে একটি পরিকল্পিত গণহত্যা হিসেবে বিবেচনার আবেদন জানিয়েছিল।
আদালত কক্ষে দক্ষিণ আফ্রিকার প্রতিনিধিত্বকারী আইরিশ আইনজীবী ব্লিন নি ঘরালাইঘ বিচারকদের বলেন, ইতিহাসে এটিই প্রথম গণহত্যা, যেখানে এর শিকার ফিলিস্তিনিরা নিজেরাই সরাসরি নিজেদের ধ্বংসের দৃশ্য বিশ্ববাসীর সামনে লাইভ সম্প্রচার করছেন। তিনি তথ্য দিয়ে জানান, গাজায় প্রতিদিন গড়ে ২৪৭ জন ফিলিস্তিনি নিহত হচ্ছেন, যার মধ্যে প্রতি ঘণ্টায় দুজন মা এবং পাঁচজন শিশু রয়েছে। চিকিৎসকরা সেখানে এক নতুন সংক্ষিপ্ত শব্দ ‘ডব্লিউসিএনএসএফ’ ব্যবহার করছেন, যার অর্থ এমন আহত শিশু যার কোনো জীবিত পরিবার অবশিষ্ট নেই।
এই শুনানির পর ২৬ জানুয়ারি আইসিজে রায় দেয় যে গাজায় গণহত্যার একটি বাস্তব ঝুঁকি রয়েছে এবং তা প্রতিরোধে সাময়িক পদক্ষেপ নেওয়ার নির্দেশ দেয়। কিন্তু আদালতের এই সতর্কবার্তা ও রায়ের পরও পরবর্তী ২২ মাস ধরে হত্যাকাণ্ড চলতেই থাকে। ২০২৫ সালের অক্টোবরে যখন একটি যুদ্ধবিরতি চুক্তি অর্জিত হয়, ততদিনে ৭০ হাজারেরও বেশি মানুষ নিহত এবং ১ লাখ ৭১ হাজারের বেশি ফিলিস্তিনি আহত হন। পুরো সময়জুড়ে বিশ্বমঞ্চে ইসরায়েলে অস্ত্রের বড় ধরনের সরবরাহ অব্যাহত ছিল।
কাতার-ভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল-জাজিরার মাসব্যাপী এক অনুসন্ধানে দেখা গেছে, গাজায় গণহত্যার বাস্তব ঝুঁকি রয়েছে বলে আইসিজের সতর্কবার্তার পরও অন্তত ৫১টি দেশ ও স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চল থেকে উৎপাদিত সামরিক সরঞ্জাম ইসরায়েলে প্রবেশ করেছে। ২০২২ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যকার ইসরায়েলি কর কর্তৃপক্ষের (আইটিএ) আমদানির তথ্য, শুল্ক রেকর্ড ও তথ্য অধিকার আইনের সহায়তায় এই বিশাল সামরিক সরবরাহ শৃঙ্খলের খোঁজ পেয়েছে সংবাদমাধ্যমটি, যার অন্তর্ভুক্ত অনেক দেশই গণহত্যা কনভেনশনে স্বাক্ষরকারী।
অনুসন্ধানে দেখা যায়, ২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে ২০২৫ সালের অক্টোবরের মধ্যে সামরিক সরঞ্জামবাহী ২ হাজার ৬০৩টি চালান ইসরায়েলে প্রবেশ করেছে, যার মোট মূল্য ছিল ৩ দশমিক ২২ বিলিয়ন ইসরায়েলি শেকেল (৮৮৫.৬ মিলিয়ন ডলার)। এর মধ্যে ৯১ শতাংশ ব্যবস্থাপনাই সম্পন্ন হয়েছে আইসিজের রায়ের পর। এমনকি ২০২৫ সালের ১০ অক্টোবর সর্বশেষ যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার পরও শেষ দুই মাসে ইসরায়েল আরও ৮৯.৪ মিলিয়ন ডলারের সামরিক সরঞ্জাম আমদানি করেছে।
ইসরায়েলে সামরিক সরঞ্জাম সরবরাহে শীর্ষ পাঁচটি উৎস দেশ হলো—আমেরিকা, ভারত, রোমানিয়া, তাইওয়ান এবং চেক প্রজাতন্ত্র। এর মধ্যে একক দেশ হিসেবে সবচেয়ে বড় সরবরাহকারী ছিল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, যা মোট ঘোষিত মূল্যের ৪২ শতাংশের জন্য দায়ী। দ্বিতীয় স্থানে থাকা ভারত সরবরাহ করেছে প্রায় ২৬ শতাংশ অস্ত্র ও গোলাবারুদ। ইউরোপীয় ইউনিয়নের সদস্য রাষ্ট্রগুলো সম্মিলিতভাবে ইসরায়েলের অস্ত্র আমদানির মোট মূল্যের প্রায় ১৯ শতাংশের জন্য দায়ী ছিল।
আল-জাজিরা ভারতের শুল্ক রপ্তানি নথি বিশ্লেষণ করে দেখেছে, ২০২৪ সালে ‘৯৩০৬’ শুল্ক কোডের অধীনে ভারতীয় সংস্থাগুলো সরাসরি ইসরায়েলি প্রধান অস্ত্র প্রস্তুতকারকদের কাছে বিস্ফোরক যুদ্ধাস্ত্রের উপাদান, ভারী ফ্রাগমেন্টেশন পার্টস, বুস্টার পেলেট এবং ১৫৫ মিলিমিটার প্রজেক্টাইলের মূল ইস্পাত কাঠামো বা বডি পাঠিয়েছে। তবে এই বিষয়ে মন্তব্য জানতে ভারতের ক্ষমতাসীন বিজেপি সরকারের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলেও তাদের কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি।
আন্তর্জাতিক আইন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আইসিজের রায়ের পরও যেসব দেশের সরকার ইসরায়েলকে অস্ত্র দেওয়া অব্যাহত রেখেছে, তারা আন্তর্জাতিক অপরাধ এবং গণহত্যায় সহযোগিতার জন্য আইনিভাবে দায়ী হতে পারে। ল্ডন স্কুল অব ইকোনমিক্সের অধ্যাপক স্টিফেন হামফ্রেস এবং জাতিসংঘের স্বাধীন তদন্ত কমিশনের প্রতিবেদন অনুযায়ী, মারাত্মক ঝুঁকির কথা জানার পর থেকেই রাষ্ট্রগুলোর ওপর অস্ত্র হস্তান্তর বন্ধের বাধ্যবাধকতা তৈরি হয়। বিশেষ করে যেখানে অস্ত্রগুলো গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘনে ব্যবহারের স্পষ্ট ঝুঁকি রয়েছে।
অনুসন্ধানে আরও দেখা যায়, কিছু দেশ প্রকাশ্যে ফিলিস্তিনের পক্ষে সুর চড়া করলেও বা ইসরায়েলের ওপর আংশিক নিষেধাজ্ঞা দিলেও পরোক্ষভাবে তাদের তৈরি পণ্য ইসরায়েলে ঢুকেছে। যেমন, তুরস্ক ২০২৪ সালের মে মাসে বাণিজ্য সম্পূর্ণ বন্ধের ঘোষণা দিলেও তাদের উৎপাদিত সামরিক পণ্য এরপরও বিকল্প উপায়ে ইসরায়েলে প্রবেশ করেছে। অন্যদিকে চীন, সিঙ্গাপুর, সুইজারল্যান্ড এবং ব্রাজিলও আইসিজের রায়কে সমর্থন করা সত্ত্বেও যুদ্ধকালীন সময়ে ইসরায়েলে লাখ লাখ ডলারের সামরিক চালান পাঠিয়েছে।
যুদ্ধ যতই দীর্ঘায়িত হয়েছে, বেসামরিক মৃত্যুর সংখ্যা বৃদ্ধির সাথে সাথে ইসরায়েলে অস্ত্র আমদানি আরও বেড়েছে। ২০২৪ সালের মে মাসে যখন ইসরায়েলি বাহিনী রাফা শহরে প্রবেশ করে, তখন চেক প্রজাতন্ত্র ও বুলগেরিয়া থেকে রেকর্ড পরিমাণ বিস্ফোরক ও সামরিক সরঞ্জাম ইসরায়েলে পৌঁছায়। মূলত বিভিন্ন দেশের অভ্যন্তরীণ আইনি জটিলতা, ওপেন লাইসেন্স ব্যবস্থা এবং দীর্ঘমেয়াদি বাণিজ্যিক চুক্তি বহাল রাখার কৌশলের কারণে রাজনৈতিক নিষেধাজ্ঞার ঘোষণার পরও বাস্তবে অস্ত্রের এই বৈশ্বিক প্রবাহ পুরোপুরি থামানো যায়নি।







