লেবাননের সশস্ত্র গোষ্ঠী হিজবুল্লাহর দুটি পৃথক এফপিভি (ফার্স্ট পারসন ভিউ) ড্রোন হামলায় আজ অন্তত ৬ ইসরায়েলি সেনা হতাহত হয়েছেন। তেল আবিবের পক্ষ থেকে ইতিমধ্যে এক সেনা সদস্যের মৃত্যু নিশ্চিত করা হয়েছে এবং বাকি ৫ জনের শারীরিক অবস্থা অত্যন্ত আশঙ্কাজনক বলে জানা গেছে। ভয়াবহ এই ড্রোন হামলার মূল লক্ষ্যবস্তু হওয়া সেনাদের মধ্যে ইসরায়েলি সেনাবাহিনীর একজন ব্যাটালিয়ন কমান্ডারও রয়েছেন বলে নিশ্চিত হওয়া গেছে।
হিজবুল্লাহর এই ক্রমবর্ধমান ড্রোন সক্ষমতা ও নতুন যুদ্ধকৌশল নিয়ে ইসরায়েলি সামরিক মহলে গভীর উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। প্রভাবশালী মার্কিন সংবাদমাধ্যম ওয়াল স্ট্রীট জার্নাল এক প্রতিবেদনে উল্লেখ করেছে, হিজবুল্লাহর ড্রোনের এই বিশাল ভাণ্ডার এখন ইসরায়েলের জন্য একটি দীর্ঘমেয়াদি ও মারাত্মক হুমকিতে পরিণত হয়েছে। বিশেষ করে অত্যন্ত কম খরচে বিপুল সংখ্যক যুদ্ধবান্ধব ড্রোন উৎপাদনের সক্ষমতা ইসরায়েলের উত্তর সীমান্তের সামগ্রিক যুদ্ধ পরিস্থিতিকেই পুরোপুরি বদলে দিচ্ছে।
সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, হিজবুল্লাহর এসব ড্রোনের অনেকগুলোই সাধারণ বাণিজ্যিক যন্ত্রাংশ ব্যবহার করে তৈরি করা হয় এবং আক্রমণের সময় এগুলো একসঙ্গে ঝাঁক আকারে বা ‘ড্রোন সোয়ার্ম’ হিসেবে শত্রুর ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে। হিজবুল্লাহর এই বিশেষ কৌশলের কারণে ইসরায়েলের বিশ্বখ্যাত বহুস্তরবিশিষ্ট অত্যাধুনিক আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা, এমনকি শক্তিশালী ‘আয়রন ডোম’ও একাধিকবার এই ড্রোনগুলোকে শনাক্ত করতে ব্যর্থ হয়েছে কিংবা ড্রোনগুলো একে ফাঁকি দিতে সক্ষম হয়েছে।
প্রতিরক্ষা বিশেষজ্ঞরা জানাচ্ছেন, এই ড্রোনগুলোর আকৃতি ছোট হওয়ায় রাডারে খুব কম ধরা পড়ে এবং অত্যন্ত ধীরগতিতে উড়ার ক্ষমতার কারণে এগুলোকে আকাশপথে আগাম শনাক্ত করা কিংবা ক্ষেপণাস্ত্র দিয়ে ভূপাতিত করা প্রচণ্ড কঠিন হয়ে পড়ছে। আকাশসীমার এই নতুন ও অপ্রতিরোধ্য পরিস্থিতির কারণে ইসরায়েলকে বাধ্য হয়ে তাদের প্রচলিত সামরিক কৌশলে বড় ধরনের পরিবর্তন আনতে হচ্ছে, যদিও এই ড্রোন হামলা ঠেকাতে কোনো পূর্ণাঙ্গ বা জাদুকরী সমাধান এখনো ইসরায়েলি সেনাবাহিনী খুঁজে পায়নি।

এদিকে যুদ্ধের মাঠে হিজবুল্লাহ এখন এক নতুন ও মারাত্মক কৌশল গ্রহণ করেছে, যা মূলত ইসরায়েলি কমান্ডারদের টার্গেট করে ড্রোন হামলা চালানোর ওপর ভিত্তি করে তৈরি। ইসরায়েলের গণমাধ্যম ‘চ্যানেল-৭’ তাদের নিজস্ব গবেষণা ও গোয়েন্দা প্রতিষ্ঠান ‘আমিতে ইনস্টিটিউট ফর রিসার্চ অ্যান্ড ইন্টেলিজেন্স’ (Amit Institute for Research and Intelligence)-এর বরাতে জানিয়েছে যে, দক্ষিণ লেবানন ও সীমান্ত এলাকায় দায়িত্বরত ঊর্ধ্বতন ইসরায়েলি সামরিক কর্মকর্তাদের নিখুঁতভাবে লক্ষ্যবস্তু বানাতে হিজবুল্লাহ বর্তমানে একটি বিশেষ “কমান্ডার শিকার” বা ‘কমান্ডার হান্টিং’ কৌশল ব্যবহার করছে।
এই সুনির্দিষ্ট শিকার কৌশলের অংশ হিসেবে হিজবুল্লাহ মূলত আধুনিক নজরদারি ড্রোন, আত্মঘাতী ড্রোন এবং দূরপাল্লার গোলন্দাজ হামলাকে একসঙ্গে ও অত্যন্ত সমন্বিতভাবে ব্যবহার করছে। উদাহরণস্বরূপ, গত সপ্তাহে দক্ষিণ লেবাননে ইসরায়েলের ৪০১তম ব্রিগেডের কমান্ডার হিজবুল্লাহর একটি আত্মঘাতী ড্রোনের সরাসরি আঘাতে গুরুতরভাবে আহত হন। একই ড্রোন হামলার ঘটনায় ইসরায়েলি সেনাবাহিনীর ১৬২তম ডিভিশনের একজন রিজার্ভ লেফটেন্যান্ট কর্নেলসহ আরও এক সেনাসদস্য জখম হন। মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধের এই বর্তমান পর্যায়ে এসে সাম্প্রতিক সময়ে এমন সুনির্দিষ্ট টার্গেটেড হামলার ঘটনা প্রতিনিয়ত বেড়েই চলেছে।







