জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে টেকনাফের শাহপরীর দ্বীপ ও প্রবাল দ্বীপ সেন্টমার্টিন এখন ভয়াবহ অস্তিত্ব সংকটে পড়েছে। সাগর ও নদীভাঙনের কারণে একের পর এক হারিয়ে যাচ্ছে বসতভিটা, কৃষিজমি ও মানুষের জীবিকার উৎস।
স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের তথ্য অনুযায়ী, গত এক দশকে এই দুই দ্বীপে অন্তত ৮ থেকে ১০ হাজার মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছেন। ভাঙনের কারণে অনেক পরিবার এলাকা ছেড়ে অন্যত্র আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়েছে।
স্থানীয়রা জানান, সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি, অস্বাভাবিক জোয়ার এবং ঘনঘন প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে ভাঙন ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। বিশেষ করে সেন্টমার্টিনে গত ১০ বছরে বিভিন্ন এলাকায় প্রায় ১০০ থেকে ১৫০ ফুট ভূমি সাগরে বিলীন হয়েছে।
ভাঙনের পাশাপাশি দেখা দিয়েছে তীব্র সুপেয় পানির সংকট। ভূগর্ভস্থ পানির স্তর নিচে নেমে যাওয়ার পাশাপাশি পানিতে লবণাক্ততার মাত্রাও আশঙ্কাজনকভাবে বেড়েছে। ফলে অনেক পরিবারকে দূর-দূরান্ত থেকে খাবার পানি সংগ্রহ করতে হচ্ছে।
সরেজমিনে দেখা গেছে, শাহপরীর দ্বীপ ও সেন্টমার্টিনের বিভিন্ন এলাকায় সাগর গিলে খেয়েছে ঘরবাড়ি ও ফসলি জমি। অনেক পরিবার একাধিকবার বসতি হারিয়ে নতুন জায়গায় আশ্রয় নিয়েছে।
শাহপরীর দ্বীপের বাসিন্দা আলমাজ খাতুন জানান, জোয়ারের পানি বাড়লে ঘরে থাকা সম্ভব হয় না। তখন অন্যের ঘরে আশ্রয় নিতে হয়। কিন্তু যাওয়ার মতো স্থায়ী কোনো জায়গা নেই।
একই এলাকার শাহেনা আক্তার বলেন, একসময় তাদের ঘরবাড়ি, জমিজমা ও গবাদিপশু ছিল। কিন্তু নদীভাঙনে সব হারিয়ে এখন মানবেতর জীবন কাটাতে হচ্ছে।
শাহপরীর দ্বীপের ইউপি সদস্য আবদুস সালাম বলেন, গত ১০ বছরে পাঁচ হাজারের বেশি মানুষ বসতি হারিয়েছেন। অসচ্ছল পরিবারগুলো এখনও নদীর পাড়ে চরম ঝুঁকি নিয়ে বসবাস করছে।
সেন্টমার্টিনের বাসিন্দা হাফেজ উল্লাহ জানান, সাগরে ঘরবাড়ি হারিয়ে তিনি পরিবার নিয়ে টেকনাফে আশ্রয় নিয়েছেন। তার মতে, এভাবে চলতে থাকলে আগামী ১০ থেকে ১৫ বছরের মধ্যে সেন্টমার্টিন সাগরে তলিয়ে যেতে পারে।
সেন্টমার্টিন ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ফয়েজুল ইসলাম বলেন, জোয়ার ও ভাঙনের কারণে অন্তত ২০০ পরিবার নিঃস্ব হয়ে গেছে। দ্বীপ রক্ষায় দ্রুত বাঁধ ও ব্লক নির্মাণের দাবি জানান তিনি।
জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদফতর জানিয়েছে, পানিতে গ্রহণযোগ্য মাত্রার চেয়ে প্রায় ৯ গুণ বেশি লবণাক্ততা পাওয়া যাচ্ছে। এতে সুপেয় পানির সংকট আরও তীব্র হচ্ছে।
টেকনাফ উপজেলা স্বাস্থ্য কর্মকর্তা এনামুল হক বলেন, লবণাক্ত পানি ব্যবহারের কারণে পানিবাহিত রোগ ও আর্সেনিকজনিত স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়ছে। দীর্ঘদিন এমন পানি ব্যবহার করলে ক্যান্সারের মতো জটিল রোগের ঝুঁকিও তৈরি হতে পারে।
পরিবেশবিদরা বলছেন, এটি শুধু পরিবেশগত সংকট নয়, বরং জলবায়ু ন্যায়ের প্রশ্নও। ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর জন্য নিরাপদ পুনর্বাসন, টেকসই আবাসন ও বিকল্প জীবিকার ব্যবস্থা জরুরি।
টেকনাফ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা এস এম অনীক চৌধুরী জানিয়েছেন, ঝুঁকিতে থাকা গৃহহীন মানুষদের সরকারি তালিকাভুক্ত করা হবে এবং ভাঙন রোধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।







