জাতীয় সংসদে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেট উপস্থাপনের পর থেকেই সাধারণ মানুষের মধ্যে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা যাচ্ছে। বিশেষ করে নিম্ন ও মধ্যবিত্ত শ্রেণির মানুষের জন্য বাজেটটি যেমন কিছু ক্ষেত্রে স্বস্তির বার্তা বহন করছে, তেমনি মূল্যস্ফীতি ও জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধির আশঙ্কায় তৈরি হয়েছে নতুন উদ্বেগ। ফলে বাজেটকে ঘিরে বিভিন্ন মহলে চলছে আলোচনা ও বিশ্লেষণ।
প্রস্তাবিত বাজেটে চাল, ডাল, ভোজ্যতেল ও চিনির মতো নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের আমদানি পর্যায়ে কিছু শুল্ক ছাড়ের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। সরকারের দাবি, এসব পদক্ষেপ বাজারে মূল্যচাপ কমাতে এবং সাধারণ ভোক্তাদের স্বস্তি দিতে সহায়ক হবে। একই সঙ্গে বয়স্ক ভাতা, বিধবা ভাতা ও ভিজিডি কর্মসূচির বরাদ্দ বাড়ানো হয়েছে। নিম্নআয়ের মানুষের জন্য সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির পরিধি সম্প্রসারণের উদ্যোগও নেওয়া হয়েছে।
এছাড়া টিসিবির মাধ্যমে স্বল্পমূল্যে পণ্য বিক্রয় কার্যক্রম আরও বিস্তৃত করার ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। তরুণ ও যুবসমাজের কর্মসংস্থান সৃষ্টির লক্ষ্যে দক্ষতা উন্নয়ন ও প্রশিক্ষণ খাতে বরাদ্দ বাড়ানোর বিষয়টিও ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্টরা।
তবে সুবিধার পাশাপাশি কিছু উদ্বেগের জায়গাও রয়েছে। অর্থনীতিবিদদের মতে, বাজেট ঘাটতি মোকাবিলায় সরকারের অর্থায়ন পরিকল্পনা এবং বিভিন্ন ক্ষেত্রে পরোক্ষ কর বৃদ্ধির প্রভাব বাজারে নতুন মূল্যচাপ তৈরি করতে পারে। এর ফলে নির্দিষ্ট আয়ের মানুষের ক্রয়ক্ষমতা আরও সংকুচিত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
মধ্যবিত্ত শ্রেণির জন্য করমুক্ত আয়ের সীমা বাড়ানোর প্রস্তাব থাকলেও তা পর্যাপ্ত না হলে করদাতাদের ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি হতে পারে। এতে সঞ্চয় ও বিনিয়োগ সক্ষমতা কমে যাওয়ার ঝুঁকি রয়েছে।
বাজেটে বিদ্যুৎ, গ্যাস ও জ্বালানি তেলের মূল্য সমন্বয়ের ইঙ্গিতও রয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, এসব খাতের মূল্যবৃদ্ধি সরাসরি পরিবহন ও উৎপাদন ব্যয় বাড়াবে, যার প্রভাব শেষ পর্যন্ত ভোক্তাদের ওপরই পড়বে। ফলে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম আরও বাড়তে পারে।
অন্যদিকে ভ্যাট ও সম্পূরক শুল্কের আওতা সম্প্রসারণের ফলে প্রক্রিয়াজাত খাদ্য, প্যাকেটজাত পণ্য ও প্রসাধনীসহ বিভিন্ন ভোগ্যপণ্যের দাম বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে। ডলার সংকট অব্যাহত থাকলে এবং আমদানিতে নিয়ন্ত্রণ বজায় থাকলে শিশুখাদ্য, গুঁড়ো দুধসহ আমদানিনির্ভর বিভিন্ন পণ্যের মূল্যও বৃদ্ধি পেতে পারে।
ব্যবসায়ী সংগঠন এমসিসিআই তাদের বাজেট প্রতিক্রিয়ায় বলেছে, দীর্ঘমেয়াদি মূল্যস্ফীতির প্রভাব কর কাঠামোয় যথাযথভাবে প্রতিফলিত হয়নি। সংগঠনটির মতে, কর স্ল্যাব সাতটি থেকে ছয়টিতে নামিয়ে আনা এবং সর্বনিম্ন ৫ শতাংশ করহার বাতিল করে ১০ শতাংশ নির্ধারণ করায় অনেক করদাতার ওপর বাড়তি চাপ সৃষ্টি হবে।
কর বিশেষজ্ঞ ও এসএমএসি অ্যাডভাইজরি সার্ভিসেসের পরিচালক স্নেহাশীষ বড়ুয়ার মতে, ৫ শতাংশ কর স্তর বিলুপ্ত এবং নির্দিষ্ট বিনিয়োগে কর রেয়াত কমানোর কারণে মধ্যম আয়ের চাকরিজীবীদের করভার উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পাবে।
তিনি আরও বলেন, উচ্চ আয়ের ব্যক্তিরা তুলনামূলক বেশি কর দিলেও তাদের সঞ্চয় ও বিনিয়োগের সুযোগ থাকে। কিন্তু মূল্যস্ফীতির চাপে নিম্ন ও মধ্যআয়ের মানুষের জন্য দৈনন্দিন ব্যয় নির্বাহ করাই কঠিন হয়ে পড়েছে। এ অবস্থায় অতিরিক্ত করের চাপ কর প্রদানে অনীহা সৃষ্টি করতে পারে।
বিশ্লেষকদের মতে, নিত্যপণ্যের ঊর্ধ্বমুখী বাজার পরিস্থিতি থেকে নিম্নআয়ের মানুষকে সুরক্ষা দেওয়ার জন্য বাজেটে কার্যকর ও সুস্পষ্ট কৌশল অনুপস্থিত। আয় না বাড়লেও ব্যয় বৃদ্ধির চাপ সাধারণ মানুষের জীবনকে আরও কঠিন করে তুলতে পারে।
বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির (সিপিবি) সাবেক সাধারণ সম্পাদক রুহিন হোসেন প্রিন্স মন্তব্য করেছেন, মুদ্রাস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, আয় বৃদ্ধি এবং কর্মসংস্থান নিশ্চিত না হলে বাজেটের ইতিবাচক ঘোষণাগুলো বাস্তব সুফল বয়ে আনবে না।
অর্থনীতিবিদরা মনে করেন, বাজেটের সফলতা মূলত এর বাস্তবায়নের ওপর নির্ভর করবে। বাজার ব্যবস্থাপনায় কার্যকর নজরদারি না থাকলে শুল্ক ছাড়ের সুবিধা সাধারণ মানুষের কাছে না পৌঁছে অসাধু ব্যবসায়ীদের হাতে চলে যেতে পারে। তাই বাজেটকে সত্যিকার অর্থে জনবান্ধব করতে হলে বরাদ্দ বৃদ্ধির পাশাপাশি স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিমূলক বাস্তবায়ন নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
সব মিলিয়ে, ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেট নিম্ন ও মধ্যবিত্ত মানুষের জন্য স্বস্তি ও শঙ্কার এক মিশ্র চিত্র তুলে ধরেছে। এখন দেখার বিষয়, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ ও নিত্যপণ্যের বাজার স্থিতিশীল রাখতে সরকার কতটা কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করতে পারে।







