ইসলামী ব্যাংকের চেক নেওয়া বন্ধ রেখেছে দেশের অন্যান্য বাণিজ্যিক ব্যাংক। বাংলাদেশ ব্যাংক থেকেও ব্যাংকগুলোকে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে— ইসলামী ব্যাংকের সব ধরনের চেকের বিপরীতে যেন কোনো টাকা ছাড় না দেওয়া হয়। মূলত কেন্দ্রীয় ব্যাংকে রক্ষিত ইসলামী ব্যাংকের নিজস্ব তহবিল প্রায় ফাঁকা হয়ে পড়ায় এই নজিরবিহীন পরিস্থিতির তৈরি হয়েছে।
এই ঘটনার পর ইসলামী ব্যাংকের সাধারণ গ্রাহকদের মধ্যে চরম আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। পরিস্থিতি মোকাবিলা ও সংকট কাটাতে বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছে জরুরি ভিত্তিতে ১০ হাজার কোটি টাকার বিশেষ তারল্য সহায়তা (লিকুইডিটি সাপোর্ট) চেয়েছে ইসলামী ব্যাংক কর্তৃপক্ষ।
নতুন চেয়ারম্যান নিয়োগের পর জটিলতা, সংসদ অধিবেশনে বিতর্ক ও গ্রাহকদের টাকা তুলে নেওয়ার হিড়িকের মধ্যে গত বুধবার (১০ জুন) ইসলামী ব্যাংকে পর্যবেক্ষক নিয়োগ দেয় কেন্দ্রীয় ব্যাংক। এর পরদিনই ব্যাংকগুলোর কাছে এক বার্তা পাঠিয়ে বাংলাদেশ ব্যাংক জানায়, ১১ জুন (বৃহস্পতিবার) থেকে ইসলামী ব্যাংকের সব চেক ‘স্টপ পেমেন্ট’ হিসেবে গণ্য হবে এবং অন্য কোনো ব্যাংক যেন এই চেকের অর্থ গ্রাহকের হিসাবে জমা না করে।
জানা গেছে, বাংলাদেশ ব্যাংকে ইসলামী ব্যাংকের চলতি হিসাবে (কারেন্ট অ্যাকাউন্ট) বর্তমানে যে পরিমাণ টাকা জমা রয়েছে, তা দিয়ে সাধারণ চেকের দায় শোধ করাও সম্ভব নয়। ফলে গত বৃহস্পতিবার অন্য ব্যাংকে জমা হওয়া ইসলামী ব্যাংকের কোনো চেকই ক্লিয়ারিং বা নিষ্পত্তি হয়নি। চলতি হিসাবে পর্যাপ্ত টাকা জমা না হওয়া পর্যন্ত এই নিষেধাজ্ঞা বহাল থাকবে।
অন্যদিকে, বৃহস্পতিবার ইসলামী ব্যাংকের নিজস্ব বিভিন্ন শাখা ও উপ-শাখায় গিয়েও গ্রাহকেরা চাহিদা মতো টাকা তুলতে পারেননি। পাশাপাশি ব্যাংকটির অধিকাংশ এটিএম বুথও টাকা শূন্য হয়ে পড়েছে। এই সংকটের বিষয়ে কথা বলতে ইসলামী ব্যাংকের ভারপ্রাপ্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও বাংলাদেশ ব্যাংকের দায়িত্বশীল কর্মকর্তাদের ফোনে চেষ্টা করা হলেও তাঁদের সাড়া পাওয়া যায়নি।
তবে ইসলামী ব্যাংক দেশের একটি অন্যতম বড় ও ‘সিস্টেম্যাটিক’ ব্যাংক হওয়ায় গ্রাহকদের আশ্বস্ত করেছেন বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর মোস্তাকুর রহমান। শুক্রবার (১২ জুন) বাজেট পরবর্তী সংবাদ সম্মেলনে তিনি বলেন, “বাংলাদেশ ব্যাংকের কিছু বিশেষ টুলস আছে, যা আমরা আগামী কয়েক দিনের মধ্যে প্রয়োগ করব। আমানতকারীদের কোনো অসুবিধা হবে না, তারা যেকোনো সময় টাকা তুলতে পারবেন।”
রাজধানীর ওসমানী স্মৃতি মিলনায়তনে আয়োজিত এই সংবাদ সম্মেলনে গভর্নর আরও বলেন, “ইসলামী ব্যাংকের জন্য ইমার্জেন্সি লিকুইডিটি সাপোর্ট বা জরুরি তারল্য সহায়তা হিসেবে যা দেওয়া প্রয়োজন, তা আমরা কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে দেব।” উক্ত সংবাদ সম্মেলনে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীসহ সরকারের উচ্চপর্যায়ের মন্ত্রী ও উপদেষ্টারা উপস্থিত ছিলেন।
বর্তমানে ইসলামী ব্যাংকের চেয়ারম্যানসহ পাঁচজন পরিচালকই বাংলাদেশ ব্যাংকের নিয়োগ করা স্বতন্ত্র পরিচালক। এর মধ্যে গত ২৪ মে ইসলামী ব্যাংকের তৎকালীন চেয়ারম্যান এম জুবায়দুর রহমান পদত্যাগ করলে একই দিন রাতে বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক ডেপুটি গভর্নর খুরশীদ আলমকে নতুন চেয়ারম্যান নিয়োগ দেওয়া হয়। এরপর থেকেই ব্যাংকটি ঘিরে নতুন করে বিতর্ক ও আতঙ্ক ছড়াতে শুরু করে।
উল্লেখ্য, ২০১৭ সালে প্রতিরক্ষা গোয়েন্দা মহাপরিদপ্তরের (ডিজিএফআই) সহায়তায় শেয়ারবাজার থেকে নামে-বেনামে শেয়ার কিনে ইসলামী ব্যাংকের নিয়ন্ত্রণ নিয়েছিল শিল্পগোষ্ঠী এস আলম গ্রুপ। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানে শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর ব্যাংকটি এস আলমের নিয়ন্ত্রণমুক্ত হয়। বর্তমানে ব্যাংকটির মোট ঋণের ৫০ শতাংশ বা প্রায় ১ লাখ কোটি টাকাই খেলাপি, যার সিংহভাগই নিয়েছে এস আলম গ্রুপ।







