রাজধানীর ধানমন্ডিতে চিকিৎসক ডা. নাফিসা তাবাসসুম ধীপ্রার মৃত্যুর ঘটনায় স্বামী, শ্বশুর ও শাশুড়িসহ চারজনের বিরুদ্ধে আদালতে মামলা দায়ের করা হয়েছে। মামলায় অবহেলাজনিত মৃত্যু, নির্যাতন এবং পোস্টমর্টেম (ময়নাতদন্ত) ছাড়াই দাফনের মাধ্যমে আলামত গোপনের অভিযোগ আনা হয়েছে।
মঙ্গলবার ঢাকার চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট জুয়েল রানার আদালতে দণ্ডবিধির বিভিন্ন ধারায় মামলার আবেদন করেন নিহতের স্বজন মো. মশিউর রহমান শাহ। আদালত আবেদনটি গ্রহণ করে সিআইডিকে (CID) তদন্ত করে প্রতিবেদন দাখিলের নির্দেশ দেন।
মামলার আসামিরা হলেন— নিহতের শাশুড়ি সিদ্দিকা সুলতানা, স্বামী ডা. রহমত রশীদ, শ্বশুর ডা. মোহাম্মদ আব্দুর রশীদ (বারডেম হাসপাতালের কার্ডিয়াক বিভাগের বিভাগীয় প্রধান) এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমভিত্তিক প্ল্যাটফর্ম ‘ইয়ার্কি ডট কম’-এর সম্পাদক সিমু নাসের। সিমু নাসের সম্পর্কে ধীপ্রার নন্নাশের স্বামী।
একাধিক সূত্রের মতে, ডা. ধীপ্রার মৃত্যুর পর থেকে অভিযুক্ত স্বামী, শ্বশুর এবং সিমু নাসের দেশ ছেড়ে পালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছেন। বিশেষ করে সিমু নাসের কানাডা পালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। ধীপ্রার মৃত্যুর পেছনে তার অন্যতম সংযোগ রয়েছে বলে দাবি ধীপ্রার স্বজনদের।
মামলার আবেদনে বলা হয়, সহপাঠী ডা. রহমত রশীদের সঙ্গে প্রেমের সম্পর্কের পর ডা. নাফিসা তাবাসসুম ধীপ্রা বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন। তাদের সংসারে দুই বছর বয়সী একটি ছেলে সন্তান রয়েছে। বিয়ের পর থেকেই তিনি পারিবারিকভাবে তীব্র শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের শিকার হন।
দীর্ঘদিনের এই মানসিক চাপের কারণে তিনি তীব্র বিষণ্নতা (ডিপ্রেশন), সন্তান জন্মের পর পোস্ট-পার্টাম ডিপ্রেশন, উচ্চ রক্তচাপ ও ডায়াবেটিসে ভুগছিলেন। চিকিৎসক হওয়া সত্ত্বেও আসামিরা তার প্রয়োজনীয় চিকিৎসা, পরিচর্যা ও সহায়তা থেকে তাকে বঞ্চিত করেছেন এবং তার এফসিপিএস পরীক্ষার প্রস্তুতিতেও বাধা দেওয়া হয়। মৃত্যুর আগে তিনি ‘Female Doctors in Bangladesh’ নামের একটি ফেসবুক গ্রুপে নিজের ওপর হওয়া নির্যাতনের বিষয়ে লিখেছিলেন।
অভিযোগ অনুযায়ী, গত ২ জুন থেকে টানা তিন দিন ডা. ধীপ্রাকে একটি কক্ষে তালাবদ্ধ করে রাখা হয়। এ সময় তাকে খাবার দেওয়া হয়নি এবং দুই বছর বয়সী সন্তানকেও দেখতে দেওয়া হয়নি। ৪ জুন খবর পেয়ে তার মা ধানমন্ডির বসতী গ্রীন আবাসনের ওই ফ্ল্যাটে যান এবং মেয়েকে তালাবদ্ধ দেখে তালা খুলে দেওয়ার অনুরোধ করেন।
কক্ষ থেকে বের হয়ে ডা. ধীপ্রা তার মাকে জড়িয়ে ধরে বলেন, “মা, আমি ভাত খাব”। এর পরপরই তিনি মেঝেতে লুটিয়ে পড়েন বলে আবেদনে দাবি করা হয়েছে। অসুস্থ হয়ে পড়ার পর তাকে দ্রুত নিকটবর্তী হাসপাতালে না নিয়ে, দীর্ঘ বিলম্বের পর বারডেম হাসপাতালে নেওয়ার পথে তাঁর মৃত্যু হয়।
মৃত্যুর পর ঘটনাটি ধামাচাপা দেওয়ার উদ্দেশ্যে আসামিরা প্রভাব খাটিয়ে ময়নাতদন্ত ছাড়াই একটি ডেথ সার্টিফিকেট সংগ্রহ করে এবং দ্রুত দাফন সম্পন্ন করে আলামত গোপন করেন বলে মামলায় উল্লেখ করা হয়েছে।
বাদীপক্ষের আইনজীবী ফরহাদ হোসাইন বলেন, আসামিরা অত্যন্ত প্রভাবশালী হওয়ায় এবং নিহতের বাবা-মা ধর্মভীরু ও অসহায় হওয়ায় শুরুতে আইনি পদক্ষেপ নিতে কিছুটা বিলম্ব হয়েছে। আদালতের কাছে আসামিদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ, গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি এবং ঘটনার সুষ্ঠু তদন্তের আবেদন করা হয়েছে।







