ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ পিএলসির শীর্ষ ব্যবস্থাপনা ও পরিচালনা পর্ষদে ঘনঘন পরিবর্তন এবং গ্রাহকদের আস্থাহীনতার জেরে ব্যাংকটির প্রবাসী আয় (রেমিট্যান্স) আসার গতিতে বড় ধরনের ধস নেমেছে। রেমিট্যান্স প্রবাহ কমে তা প্রায় অর্ধেকে ঠেকেছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের এক প্রতিবেদনে দেখা গেছে, চলতি মে মাসের প্রথম ২০ দিনে যেখানে ইসলামী ব্যাংকের মাধ্যমে ৪৬০ মিলিয়ন ডলারের প্রবাসী আয় এসেছিল, সেখানে পরের মাস জুনের প্রথম ২০ দিনে তা কমে দাঁড়িয়েছে মাত্র ২৪৭ মিলিয়ন ডলারে। অর্থাৎ, মাত্র এক মাসের ব্যবধানে ২০ দিনের হিসাবে ব্যাংকটির রেমিট্যান্স কমেছে ২১৩ মিলিয়ন ডলার। এর ফলে রেমিট্যান্স আহরণে সবসময় শীর্ষে থাকা ইসলামী ব্যাংক প্রথম থেকে এক লাফে তৃতীয় অবস্থানে নেমে গেছে।
ব্যাংকটির অভ্যন্তরীণ সূত্র ও গ্রাহকদের বরাতে জানা গেছে, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নির্দেশে ইসলামী ব্যাংকের সাবেক এমডি ওমর ফারুক খানকে হঠাৎ পদ থেকে সরিয়ে দেওয়া এবং চেয়ারম্যান ড. জুবাইদুর রহমানকে অপসারণের পর থেকেই অস্থিরতার সূত্রপাত। ৫ আগস্টের পটপরিবর্তনের পর কর্মকর্তাদের আন্দোলনের মুখে বাংলাদেশ ব্যাংকের ডেপুটি গভর্নরের পদ থেকে সরে দাঁড়ানো খুরশীদ আলমকে গত ২৪ মে ইসলামী ব্যাংকের চেয়ারম্যান করা হয়। বিতর্কিত এই নিয়োগের পর ‘গ্রাহক ফোরাম’-এর ব্যানারে দেশজুড়ে ব্যাংকটির বিভিন্ন শাখায় গ্রাহকরা তীব্র আন্দোলন শুরু করেন। টানা দুই সপ্তাহের এই আন্দোলনের মুখে সাধারণ গ্রাহকরা ব্যাংকটি থেকে প্রায় ৮,০০০ কোটি টাকার আমানত তুলে নেন, যার ফলে ব্যাংকটির ক্যাশ রিজার্ভ রেশিও (সিআরআর) ইতিবাচক থেকে একবারে নেতিবাচক পর্যায়ে চলে যায়। এই চরম তারল্য সংকট কাটাতে ব্যাংকটি বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছে ১০,০০০ কোটি টাকার জরুরি সহায়তা চায়। পরিস্থিতি বেগতিক দেখে কেন্দ্রীয় ব্যাংক খুরশীদ আলমকে অপসারণ করে বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক মোহাম্মদ জহির হোসেনকে এক সদস্যবিশিষ্ট পর্ষদের দায়িত্ব দেয়। তবে খুরশীদ আলম অপসারিত হলেও গ্রাহকদের মন থেকে আস্থাহীনতা পুরোপুরি দূর হয়নি, যার সরাসরি প্রভাব পড়েছে রেমিট্যান্সে।
ইসলামী ব্যাংকের এই ধসের সুযোগে চলতি জুন মাসের প্রথম ২০ দিনে প্রবাসী আয় আহরণে শীর্ষ অবস্থানে চলে এসেছে রাষ্ট্রায়ত্ত বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক। এই সময়ে ব্যাংকটির মাধ্যমে দেশে প্রবাসী আয় এসেছে ৩৩৫ মিলিয়ন ডলার। ২৫৪ মিলিয়ন ডলার রেমিট্যান্স নিয়ে দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে রাষ্ট্রায়ত্ত অগ্রণী ব্যাংক। অথচ এর আগের মাস মে-তেও ৫৯২ মিলিয়ন ডলার রেমিট্যান্স নিয়ে এককভাবে শীর্ষে ছিল ইসলামী ব্যাংক এবং ৪৬৭ ও ২৪২ মিলিয়ন ডলার নিয়ে যথাক্রমে দ্বিতীয় ও তৃতীয় অবস্থানে ছিল কৃষি ও অগ্রণী ব্যাংক।
ইসলামী ব্যাংকের রেমিট্যান্স প্রবাহ হঠাৎ কমে যাওয়ার নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে দেশের সামগ্রিক ডলার বাজারেও। রাষ্ট্রায়ত্ত একটি ব্যাংকের ট্রেজারি বিভাগের প্রধান জানান, ইসলামী ব্যাংক তাদের অর্জিত ডলারের প্রায় ৮০ শতাংশই আন্তঃব্যাংক বাজারে বিক্রি করে দিত। জুন মাসে তাদের ডলার বিক্রির পরিমাণ কমে যাওয়ায় বাজারে ডলারের সংকট তৈরি হয়েছে এবং বিদেশি অ্যাগ্রিগেটররা এখন বাড়তি রেট চাচ্ছে। গত সপ্তাহে যেখানে প্রতি ডলারের আনুষ্ঠানিক দর ছিল ১২৩ টাকা, এই সপ্তাহে তা বেড়ে অনেক ব্যাংকে ১২৩ টাকা ২০ পয়সা পর্যন্ত ঠেকেছে।
উদ্ভূত পরিস্থিতির বিষয়ে জানতে চাইলে ইসলামী ব্যাংকের বোর্ডের দায়িত্বে থাকা বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক মোহাম্মদ জহির হোসেন বলেন, গ্রাহকদের আস্থা ফিরিয়ে আনার জন্য সব ধরণের কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে। ইতোমধ্যে গ্রাহকদের আস্থা ফিরতে শুরু করেছে, তারা নতুন করে টাকা জমা রাখছেন এবং দিন দিন পরিস্থিতির আরও উন্নতি হবে। অন্যদিকে, ইসলামী ব্যাংকের ভারপ্রাপ্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) আলতাফ হোসেন আশাবাদ ব্যক্ত করে বলেন, খুব শিগগিরই সবকিছু আগের মতো স্বাভাবিক হয়ে যাবে এবং চলতি জুন মাস শেষে আপনারা ব্যাংকটির পারফরম্যান্সে ভালো কিছুই দেখতে পাবেন।







