স্বাধীনতার পর দীর্ঘদিন ধরে আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কার্যালয় হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে আসা রাজধানীর গুলিস্তানের ২৩ বঙ্গবন্ধু অ্যাভিনিউয়ের ভবন ও জমি নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে। সংশ্লিষ্ট নথিপত্র ও ভূমি রেকর্ড পর্যালোচনায় জানা গেছে, বর্তমানে নিষিদ্ধ ঘোষিত আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কার্যালয় যে জমিতে নির্মিত, তার মূল মালিক ছিলেন পাকিস্তানি নাগরিক মাম্মা বাই আদমজী। মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে তিনি তৎকালীন পশ্চিম পাকিস্তানে চলে যান এবং স্বাধীনতার পর আর বাংলাদেশে ফেরেননি। ফলে ভবন ও জমিটি দীর্ঘদিন পরিত্যক্ত অবস্থায় পড়ে ছিল।
সূত্র অনুযায়ী, ৬ দশমিক ৩১ শতাংশ জমির ওপর নির্মিত চারতলা ভবনটি পরবর্তীতে ‘অনিবাসী সম্পদ’ হিসেবে সরকারের নিয়ন্ত্রণে আসে এবং এর দেখভালের দায়িত্ব পায় গণপূর্ত অধিদপ্তর। এরপর ১৯৮১ সালে শেখ হাসিনার দেশে ফেরার পর আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা ভবনটিতে দলীয় কার্যক্রম শুরু করেন। সেই সময় থেকেই ভবনটি কার্যত আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কার্যালয় হিসেবে ব্যবহৃত হতে থাকে।
অভিযোগ রয়েছে, দীর্ঘ প্রায় সাড়ে চার দশক ধরে ভবনটি ব্যবহার করা হলেও আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে নিয়মিত হোল্ডিং ট্যাক্স বা ভূমি উন্নয়ন কর পরিশোধ করা হয়নি। ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের পুরোনো রেকর্ডেও ভবনের মালিক হিসেবে এখনও মাম্মা বাই আদমজীর নাম সংরক্ষিত রয়েছে বলে জানা গেছে।
এদিকে মূল জমির পাশাপাশি সিটি করপোরেশনের একটি সড়কের জমিও আওয়ামী লীগের কার্যালয়ের সঙ্গে যুক্ত করার অভিযোগ উঠেছে। সংশ্লিষ্ট রেকর্ড অনুযায়ী, ভবনের পাশে ১৮০৫ নম্বর দাগে ৪ দশমিক ১২ শতাংশ জমি ছিল একটি প্রবেশ সড়ক, যা উদয়ন মার্কেটে যাতায়াতের জন্য ব্যবহৃত হতো। নব্বইয়ের দশকে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা ওই সড়কের জায়গায় দোকানপাট নির্মাণ করেন এবং সেখানে ‘জয় মার্কেট’ নামে একটি বাণিজ্যিক স্থাপনা গড়ে ওঠে।
জানা যায়, তৎকালীন ঢাকা সিটি করপোরেশনের মেয়র মোহাম্মদ হানিফের সময় ওই এলাকায় স্থাপনা নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়। পরবর্তীতে ১৯৯৯ সালে সিটি করপোরেশন মার্কেটটি উচ্ছেদের উদ্যোগ নিলেও তা বাস্তবায়িত হয়নি। বরং একই বছরের আগস্টে সড়কের জমিতে অস্থায়ীভাবে মার্কেট পরিচালনার অনুমোদন দেওয়া হয়।
পরবর্তীতে ২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর জয় মার্কেটের ব্যবসায়ীদের অন্যত্র স্থানান্তরের উদ্যোগ নেওয়া হয়। অভিযোগ রয়েছে, আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কার্যালয় সম্প্রসারণের উদ্দেশ্যে ব্যবসায়ীদের মাধ্যমে স্থানান্তরের আবেদন করানো হয়েছিল। এরপর ধাপে ধাপে জমিটির খতিয়ান পরিবর্তন করে খাস জমি হিসেবে রেকর্ডভুক্ত করা হয় এবং আওয়ামী লীগের নামে বরাদ্দের প্রক্রিয়া শুরু হয়।
ভূমি মন্ত্রণালয়ের অনুমোদনের পর ২০১২ সালে ৪ দশমিক ১২ শতাংশ জমি দীর্ঘমেয়াদি বন্দোবস্তের মাধ্যমে আওয়ামী লীগের সভাপতি শেখ হাসিনার নামে বরাদ্দ দেওয়া হয়। তবে ভূমি প্রশাসনের একাধিক কর্মকর্তা দাবি করেছেন, সড়কের জন্য নির্ধারিত জমি দীর্ঘমেয়াদি বন্দোবস্ত দেওয়ার বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।
শুধু সড়কের জমিই নয়, মূল ভবনের জমিও পরবর্তীতে শেখ হাসিনার নামে নিবন্ধিত করা হয়। ২০১০ সালে গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয় ৬ দশমিক ৩১ শতাংশ জমি ৯০ লাখ টাকায় শেখ হাসিনার কাছে বিক্রির দলিল সম্পন্ন করে। এরপর মূল জমি এবং সড়কের জমি একত্র করে নতুন বহুতল ভবন নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়।
২০১৬ সালে পুরোনো চারতলা ভবন ভেঙে আধুনিক ১০ তলা ভবন নির্মাণ শুরু হয়। বর্তমানে যে ভবনটি দাঁড়িয়ে আছে, তার মোট জমির পরিমাণ ১০ দশমিক ৪৩ শতাংশ। এর মধ্যে ৪ দশমিক ১২ শতাংশ জমি পূর্বে সিটি করপোরেশনের সড়ক হিসেবে ব্যবহৃত হতো বলে নথিপত্রে উল্লেখ রয়েছে। ২০১৮ সালের ২৩ জুন শেখ হাসিনা আনুষ্ঠানিকভাবে ভবনটির উদ্বোধন করেন।
বিষয়টি নিয়ে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা জহিরুল ইসলাম বলেছেন, সিটি করপোরেশনের নামে রেকর্ডকৃত কোনো জমি দখল হয়ে থাকলে তা পুনরুদ্ধারের জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে। একইসঙ্গে বকেয়া হোল্ডিং ট্যাক্স আদায়ের বিষয়টিও খতিয়ে দেখা হবে।
অন্যদিকে ঢাকা জেলা প্রশাসক ফরিদা খানম জানিয়েছেন, সংশ্লিষ্ট নথিপত্র পর্যালোচনার পর যদি দেখা যায় দীর্ঘ সময় ধরে ভূমিকর বা অন্যান্য সরকারি পাওনা পরিশোধ করা হয়নি, তাহলে ভূমি ব্যবস্থাপনা আইনের আওতায় প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
জমির মালিকানা, সড়ক দখল, কর বকেয়া এবং বরাদ্দ প্রক্রিয়ার বৈধতা নিয়ে নতুন করে ওঠা এসব প্রশ্নের কারণে আওয়ামী লীগের সাবেক কেন্দ্রীয় কার্যালয় ঘিরে বিতর্ক আবারও আলোচনায় এসেছে। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের তদন্ত ও নথিপত্র যাচাইয়ের মাধ্যমে বিষয়টির প্রকৃত অবস্থা স্পষ্ট হবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।







