বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির ও সংসদীয় বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান বলেছেন, ঐতিহাসিক জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের পর রাষ্ট্র সংস্কার ও সুশাসন প্রতিষ্ঠা নিয়ে দেশের সাধারণ মানুষের মাঝে যে বিশাল প্রত্যাশা তৈরি হয়েছিল, বর্তমান সরকার তা পূরণ করতে সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয়েছে। অতীতে যে ধরনের শাসনব্যবস্থা দেশে ফ্যাসিবাদের জন্ম দিয়েছিল, তার মৌলিক কাঠামো এখনো অক্ষুণ্ন রাখা হয়েছে। ফলে জাতীয় জীবনে নতুন করে তীব্র রাজনৈতিক ও সামাজিক সংকট তৈরি হয়েছে। শুক্রবার (২৬ জুন) রাজধানীর মগবাজারে জামায়াতের কেন্দ্রীয় কার্যালয় সংলগ্ন আল-ফালাহ মিলনায়তনে দলের কেন্দ্রীয় মজলিসে শুরার অধিবেশনে উদ্বোধনী বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
জামায়াত আমির তাঁর বক্তব্যে আক্ষেপ প্রকাশ করে বলেন, অভ্যুত্থানের পর দেশের মানুষ বিশ্বাস করেছিল যে, ছাত্র-জনতার ত্যাগ ও রক্তের বিনিময়ে বাংলাদেশে একটি মৌলিক এবং স্থায়ী পরিবর্তন আসবে। দীর্ঘ সংলাপের পর যে রাজনৈতিক সংস্কার সনদ তৈরি হয়েছিল, তার ওপর দেশজুড়ে গণভোট অনুষ্ঠিত হলেও জনগণের দেওয়া সেই ঐতিহাসিক রায় আজ পর্যন্ত বাস্তবায়ন করা হয়নি। যেসব রাষ্ট্রীয় কাঠামোর ওপর ভর করে অতীতে স্বৈরাচার ও ফ্যাসিবাদ প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল, সেগুলোও রহস্যজনকভাবে অপরিবর্তিত রাখা হয়েছে। তিনি মনে করিয়ে দেন, সাধারণ নির্বাচনের আগে সরকারি ও বিরোধী দল—উভয়েই গণভোটের ফল মেনে নেওয়ার স্পষ্ট প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল; কিন্তু সরকার এখন জনগণের সেই রায় ও নিজেদের প্রতিশ্রুতি থেকে সরে এসেছে, যা দেশে নতুন সংকটের জন্ম দিচ্ছে।
দেশের বর্তমান আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির তীব্র সমালোচনা করে বিরোধীদলীয় নেতা বলেন, দেশজুড়ে খুন, ধর্ষণ, সন্ত্রাস ও জুলুম-নিপীড়ন আশঙ্কাজনক হারে বেড়েই চলেছে। সাধারণ মানুষের জানমাল ও নারীর সম্ভ্রমের ন্যূনতম নিরাপত্তা নিশ্চিত করা যাচ্ছে না। দেশে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এবং স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সচল থাকা সত্ত্বেও অপরাধ নিয়ন্ত্রণে তাদের কোনো কার্যকর অগ্রগতি বা দৃশ্যমান ভূমিকা নেই। এই অবস্থায় তিনি সরকারকে তাদের ওপর অর্পিত দায়িত্ব যথাযথভাবে পালনের কঠোর আহ্বান জানান। শফিকুর রহমান স্পষ্ট হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, দেশের প্রধান বিরোধী দল হিসেবে জনগণের স্বার্থবিরোধী যেকোনো সরকারি পদক্ষেপের বিরুদ্ধে রাজপথে তীব্র প্রতিবাদ করা হবে এবং প্রয়োজন হলে তা শক্ত হাতে প্রতিরোধও করা হবে। জনগণের অধিকার আদায়ের এই আন্দোলন জাতীয় সংসদের ভেতরে ও বাইরে সমানতালে চলবে।
অধিবেশনের বক্তব্যের শুরুতে মহররম ও পবিত্র আশুরার তাৎপর্য তুলে ধরে ডা. শফিকুর রহমান বলেন, ফেরাউনের হাত থেকে হজরত মুসা (আ.)-এর মুক্তি এবং কারবালার প্রান্তরে হজরত ইমাম হোসাইন (রা.)-এর শাহাদাত মূলত মানবজাতিকে জুলুমের বিরুদ্ধে অবিরাম সংগ্রাম ও সত্য প্রতিষ্ঠার চিরন্তন শিক্ষা দেয়। তিনি উল্লেখ করেন, আজও ফিলিস্তিনসহ বিশ্বজুড়ে মুসলমানদের ওপর নির্যাতন-নিপীড়ন চলছে এবং আল্লাহর দেওয়া ন্যায়ভিত্তিক বিধান অনুসরণ করলেই কেবল মানবজাতির প্রকৃত কল্যাণ ও শান্তি নিশ্চিত করা সম্ভব।
তিনি আরও বলেন, জামায়াতে ইসলামী একটি মানবিক, ন্যায়ভিত্তিক, স্বৈরাচারমুক্ত ও বৈষম্যহীন বাংলাদেশ গড়তে বদ্ধপরিকর। বাংলাদেশ কখনো কোনো বিদেশি আধিপত্যবাদের কাছে মাথা নত করবে না, বরং বিশ্বের দরবারে একটি মর্যাদাবান ও স্বাধীন জাতি হিসেবে মাথা উঁচু করে দাঁড়াবে। নতুন ও পুরোনো সব ধরনের ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে দলের এই আদর্শিক লড়াই অব্যাহত থাকবে এবং সর্বস্তরের জাতীয় ঐক্যের মাধ্যমেই কেবল দেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষা করা সম্ভব। একই সঙ্গে বাংলাদেশের বিপুল জনসংখ্যাকে বোঝা না ভেবে তাদের দক্ষ জনসম্পদে পরিণত করতে সুশাসন, জবাবদিহি ও দেশপ্রেমভিত্তিক রাষ্ট্র পরিচালনার ওপর বিশেষভাবে গুরুত্বারোপ করেন তিনি।







