জাতীয় সংসদের বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান বলেছেন, প্রস্তাবিত বাজেটে বিদেশে পাচার হওয়া অর্থ দেশে ফিরিয়ে আনার জন্য কোনো সুস্পষ্ট দিকনির্দেশনা নেই। তিনি জোর দিয়ে বলেন, পাচারকৃত অর্থ ফেরাতে সরকারকে কার্যকর ও দৃশ্যমান উদ্যোগ নিতে হবে। একই সঙ্গে দেশের অর্থবছর জুলাই-জুনের পরিবর্তে জানুয়ারি-ডিসেম্বর করার প্রস্তাবও দেন তিনি।
সোমবার জাতীয় সংসদের চলমান বাজেট অধিবেশনে প্রস্তাবিত বাজেটের ওপর সাধারণ আলোচনায় অংশ নিয়ে এসব কথা বলেন বিরোধীদলীয় নেতা। স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদের সভাপতিত্বে সকাল সাড়ে ১০টায় অধিবেশন শুরু হয়।
ডা. শফিকুর রহমান বলেন, দেশের বাজেট ঘাটতি খুব বেশি নয়। পাচার হওয়া অর্থের মাত্র এক-নবমাংশও যদি ফেরত আনা যায়, তাহলে বাজেট ঘাটতি থাকবে না। তিনি বলেন, “এই টাকা জনগণের, তাই তা ফিরিয়ে আনতে হবে। পাচারকারীদের কঠোর শাস্তির আওতায় আনা হলে ভবিষ্যতে কেউ রাষ্ট্রের সম্পদ লুট করার সাহস পাবে না।”
তিনি আরও বলেন, দেশের স্বার্থে বিভিন্ন দেশের সঙ্গে সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) করতে হবে এবং এ বিষয়ে বিরোধীদল হিসেবে তারা আন্তর্জাতিক পর্যায়েও আলোচনা করেছে।
বাজেট নিয়ে সংসদে সরকারি ও বিরোধী দলের সদস্যদের ব্যাপক আলোচনার প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, মতপার্থক্য থাকলেও সবাই জনগণ ও মহান আল্লাহর কাছে দায়বদ্ধ। তিনি প্রয়াত রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান, জাতীয় নেতৃবৃন্দ, মুক্তিযুদ্ধের শহীদ, বীর মুক্তিযোদ্ধা, পিলখানা হত্যাকাণ্ড, শাপলা চত্বরের ঘটনা, ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানের শহীদ এবং জামায়াতের ১১ নেতাসহ সব শহীদের প্রতি শ্রদ্ধা জানান।
তিনি বলেন, গণঅভ্যুত্থান-পরবর্তী সময়ে গঠিত বর্তমান সংসদ একটি ‘মজলুমের পার্লামেন্ট’ এবং এ সংসদ জাতিকে আশার আলো দেখাবে বলে তিনি প্রত্যাশা করেন।
সরকার ও বিরোধীদলের সম্পর্ক প্রসঙ্গে তিনি বলেন, বিরোধীদলকে সম্মান করার মানসিকতা সরকারি দলের থাকতে হবে, আবার বিরোধীদলকেও গঠনমূলক সহযোগিতা করতে হবে। তবে এটি তোষামোদ নয়, বরং দায়িত্বশীলতার জায়গা।
ডা. শফিকুর রহমান বলেন, বাজেট একটি জাতির টিকে থাকা ও এগিয়ে যাওয়ার রূপরেখা। অর্থমন্ত্রীকে ধন্যবাদ জানিয়ে তিনি বলেন, কঠিন অর্থনৈতিক পরিস্থিতিতে তিনি একটি বাজেট উপস্থাপন করেছেন। তবে মানুষের তৈরি কোনো পরিকল্পনাই ভুলের ঊর্ধ্বে নয়।
তিনি বলেন, বিরোধীদলের কাজ হচ্ছে ‘ওয়াচডগ’-এর ভূমিকা পালন করা এবং বাজেটে জনগণের স্বার্থ, ন্যায়বিচার ও অপচয়ের বিষয়গুলো খতিয়ে দেখা।
বিরোধীদলীয় নেতা আশা প্রকাশ করেন, সরকারি ও বিরোধীদলীয় সদস্যদের দেওয়া বিভিন্ন প্রস্তাব বিবেচনায় নিয়ে অর্থমন্ত্রী সংশোধিত বাজেটে প্রয়োজনীয় পরিবর্তন আনবেন।
তিনি প্রস্তাব করেন, অর্থবছর জানুয়ারি থেকে ডিসেম্বর নির্ধারণ করা হলে কাজের গতি বাড়বে, অপচয় ও লুটপাট কমবে এবং জনগণের করের অর্থের যথাযথ ব্যবহার নিশ্চিত হবে। পাশাপাশি বাজেট বাস্তবায়নের অগ্রগতি নিয়ে তিন মাস পরপর সংসদে আলোচনা করারও প্রস্তাব দেন তিনি।
দুর্নীতিকে বাজেট বাস্তবায়নের সবচেয়ে বড় বাধা উল্লেখ করে তিনি বলেন, ইনসাফভিত্তিক বাজেট প্রণয়ন করতে হলে পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীকে অগ্রাধিকার দিতে হবে।
শিক্ষাখাত নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে তিনি বলেন, দেশে ন্যূনতম শিক্ষার মানও নিশ্চিত করা যাচ্ছে না এবং বিশ্ব র্যাঙ্কিংয়ে বাংলাদেশ পিছিয়ে পড়ছে। কওমি মাদ্রাসা ও প্রাথমিক স্তরের প্যারালাল এবতেদায়ী শিক্ষাব্যবস্থার জন্য বাজেটে বরাদ্দ না থাকায় তিনি হতাশা প্রকাশ করেন। একই সঙ্গে যোগ্য নন-এমপিও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোকে এমপিওভুক্ত করার দাবি জানান।
তিনি বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে মানসম্মত গবেষণার জন্য প্রয়োজনীয় তহবিল ও সহায়ক পরিবেশ নেই। গবেষণাভিত্তিক বিশ্ববিদ্যালয় গড়ে তুলতে না পারলে দেশ আমদানিনির্ভরই থেকে যাবে।
স্বাস্থ্যখাতের বিষয়ে তিনি বলেন, দেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থার অবস্থা অত্যন্ত নাজুক। হাসপাতালগুলোতে প্রয়োজনের তুলনায় রোগীর চাপ অনেক বেশি, অবকাঠামো, জনবল ও সরঞ্জামের ঘাটতি রয়েছে। তিনি স্বাস্থ্যখাতে দীর্ঘমেয়াদি ও দূরদর্শী পরিকল্পনা গ্রহণের আহ্বান জানান।
আদ্-দ্বীন হাসপাতালের প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, শিশু মৃত্যুর ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত ও দোষীদের বিচার হওয়া উচিত, তবে লক্ষ মানুষের সেবা দেওয়া প্রতিষ্ঠানগুলোর ইতিবাচক কাজও মূল্যায়ন করতে হবে। বিকল্প ব্যবস্থা ছাড়া হাসপাতাল বন্ধ রাখা হলে শিক্ষার্থী ও রোগীদের ক্ষতির বিষয়টি বিবেচনায় নেওয়ার আহ্বান জানান তিনি।
প্রবাসীদের বিষয়ে তিনি বলেন, বাজেটে তাদের আস্থা অর্জন ও সম্মানিত করার জন্য বিশেষ কোনো উদ্যোগ নেই। মালয়েশিয়াসহ বিভিন্ন দেশে শ্রমিক পাঠানোর ক্ষেত্রে সিন্ডিকেট ভেঙে দালালদের আইনের আওতায় আনার দাবি জানান তিনি।
মুক্তিযোদ্ধা ও খেতাবপ্রাপ্তদের ভাতা বৃদ্ধির দাবি জানিয়ে তিনি বলেন, বিভিন্ন সময়ে নিহত ও নিখোঁজ ব্যক্তিদেরও রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি ও ন্যায়বিচারের আওতায় আনতে হবে।
নিজ নির্বাচনী এলাকার সমস্যা তুলে ধরে তিনি বলেন, এখনো পানির জন্য মানুষ হাহাকার করছে। পাশাপাশি ঢাকা-সিলেট মহাসড়কের কাজ দ্রুত শেষ করা, দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের জলাবদ্ধতা নিরসন এবং ভোলা সেতু নির্মাণেরও দাবি জানান তিনি।
তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নের উদ্যোগের জন্য প্রধানমন্ত্রীকে অভিনন্দন জানিয়ে তিনি বলেন, প্রকল্পের নাম নয়, বাস্তবায়নই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
বিরোধীদলীয় নেতার বক্তব্যের পর স্থানীয় সরকারমন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর সংসদে ৩০০ বিধিতে একটি বিবৃতি দিয়ে জানান, সিটি করপোরেশন এলাকা বাদে বিরোধীদলীয় আসনগুলোতে মসজিদ ও মন্দিরের জন্য প্রধানমন্ত্রী ২০ কোটি টাকা বরাদ্দ দিয়েছেন।
এক ঘণ্টাব্যাপী বক্তব্যে বাজেট ও জাতীয় বিভিন্ন বিষয়ে দিকনির্দেশনামূলক বক্তব্য দেওয়ায় বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমানকে ধন্যবাদ জানান স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ।







