পুলিশ কর্মকর্তা মাহফুজুর রহমানের স্বপ্ন ছিল, তার মেয়ে ঐশী রহমান একদিন চিকিৎসক হয়ে মানুষের সেবা করবে। কিন্তু সেই স্বপ্ন আর পূরণ হয়নি। বাবা-মাকে হত্যার দায়ে দণ্ডিত হয়ে এখন তার জীবন কাটছে গাজীপুরের কাশিমপুর মহিলা কেন্দ্রীয় কারাগারের চার দেয়ালের মধ্যে। বর্তমানে তিনি কারাগারের লাইব্রেরিয়ানের দায়িত্ব পালন করছেন বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।
কারা সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, ১৯ বছর বয়সে ঐশীর কারাজীবন শুরু হয়। দণ্ডবিধির ৫৭ ধারা অনুযায়ী যাবজ্জীবন কারাদণ্ডের মেয়াদ ৩০ বছর। সে হিসাবে তিনি ইতোমধ্যে প্রায় ১৩ বছর কারাগারে কাটিয়েছেন এবং আরও ১৭ বছর তাকে বন্দি জীবন কাটাতে হবে। তখন তার বয়স দাঁড়াবে প্রায় ৪৯ বছর।
তবে কারা বিধি অনুযায়ী, কোনো যাবজ্জীবনপ্রাপ্ত বন্দি কারাগারের শৃঙ্খলা মেনে চললে সরকার তার সাজা আংশিক মওকুফের বিষয়টি বিবেচনা করতে পারে।
২০১৩ সালের ১৬ আগস্ট ঢাকার চামেলীবাগের বাসা থেকে অবসরপ্রাপ্ত পুলিশ কর্মকর্তা মাহফুজুর রহমান ও তার স্ত্রীর মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। পরদিন নিহতের ভাই মশিউর রহমান পল্টন থানায় হত্যা মামলা দায়ের করেন। একই দিন ঐশী থানায় আত্মসমর্পণ করে পুলিশকে জানান, তিনিই তার বাবা-মাকে হত্যা করেছেন। তার এই স্বীকারোক্তিতে দেশজুড়ে চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়।
পরে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি) ঐশী, তার দুই বন্ধু এবং বাসার শিশু গৃহকর্মী সুমির বিরুদ্ধে পৃথক অভিযোগপত্র দেয়। অভিযোগপত্রে বলা হয়, ঐশী একাই তার বাবা-মাকে হত্যা করেন। তার বন্ধু জনি ও রনির বিরুদ্ধে তাকে প্ররোচনা ও আশ্রয় দেওয়ার অভিযোগ আনা হয়, আর সুমির বিরুদ্ধে ছিল লাশ গোপনের অভিযোগ।
২০১৫ সালের ১২ নভেম্বর নিম্ন আদালত ঐশীকে মৃত্যুদণ্ড দেন। একই মামলায় তার বন্ধু মিজানুর রহমান রনি দুই বছরের কারাদণ্ড পান এবং অপর বন্ধু জনি খালাস পান। পরে ঐশী ওই রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করলে ২০১৭ সালের ৫ জুন হাইকোর্ট তার মৃত্যুদণ্ড কমিয়ে যাবজ্জীবন কারাদণ্ডে রূপান্তর করেন। এরপর থেকেই তিনি কাশিমপুর কারাগারে আছেন।
কারা অধিদপ্তরের এআইজি (উন্নয়ন ও মিডিয়া) জান্নাত-উল-ফরহাদ জানিয়েছেন, ঐশী বর্তমানে মহিলা ওয়ার্ডে অবস্থান করছেন এবং লাইব্রেরির দায়িত্ব পালন করছেন।
মৃত্যুদণ্ড ঘোষণার পর প্রায় এক বছর ছয় মাস কনডেম সেলে ছিলেন ঐশী। পরে সাজা কমে যাওয়ার পর তাকে সাধারণ ওয়ার্ডে স্থানান্তর করা হয়।
বর্তমানে কাশিমপুর মহিলা কেন্দ্রীয় কারাগারের ৭ নম্বর ওয়ার্ডে থাকেন ঐশী। লাইব্রেরির বই নিবন্ধন ও ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব তার ওপর। ইংলিশ মিডিয়ামের ছাত্রী হওয়ায় তিনি অবসর সময়ে ইংরেজি গল্প ও উপন্যাস পড়ে সময় কাটান। কারা কর্মকর্তাদের ভাষ্য, তার আচরণ ভালো এবং তিনি খুব কম কথা বলেন। এছাড়া তিনি শ্বাসকষ্টজনিত সমস্যায়ও ভুগছেন।
প্রতিদিন সকাল ১০টা থেকে দুপুর ১টা পর্যন্ত লাইব্রেরিতে দায়িত্ব পালন করেন তিনি। এরপর গোসল, খাবার ও বিশ্রামের জন্য বিরতি পান। পরে বিকেল ৫টা থেকে রাত ৮টা পর্যন্ত আবার লাইব্রেরিতে কাজ করেন। বন্দিরা সেখানে গিয়ে বই পড়ার সুযোগ পান।
কারা সূত্র জানিয়েছে, ফুলের বাগান করতে পছন্দ করেন ঐশী। কারাগারের বিভিন্ন ফুলের বাগানে গিয়ে মাঝে মাঝে পরিচর্যাও করেন। তবে এটি তার নির্ধারিত দায়িত্ব নয়। দীর্ঘ কারাজীবনের মধ্যেও তিনি মুক্তির দিনের অপেক্ষায় আছেন বলে জানিয়েছেন কয়েকজন কারারক্ষী।
দীর্ঘদিন ধরে কাশিমপুর কারাগারেই থাকছেন ঐশী। লাইব্রেরির দায়িত্ব পাওয়ার পর তাকে অন্য কোনো কারাগারে স্থানান্তর করা হয়নি। মাঝে মাঝে তার নানা-নানির পরিবারের সদস্যরা দেখা করতে এলেও দাদা-দাদির পক্ষের কেউ তাকে দেখতে আসেন না বলে জানা গেছে।
হাইকোর্টের পূর্ণাঙ্গ রায়ে বলা হয়েছে, উপস্থাপিত সাক্ষ্য-প্রমাণ অনুযায়ী ঐশীর ক্ষেত্রে মৃত্যুদণ্ড উপযুক্ত ছিল। তবে কয়েকটি বিশেষ বিষয় বিবেচনায় নিয়ে তার সাজা কমানো হয়।
রায়ে উল্লেখ করা হয়, হত্যাকাণ্ডের সময় তিনি মানসিকভাবে বিপর্যস্ত ছিলেন এবং সুস্পষ্ট কোনো উদ্দেশ্য ছাড়াই ঘটনাটি ঘটিয়েছিলেন। এছাড়া তিনি অ্যাজমাসহ বিভিন্ন শারীরিক সমস্যায় ভুগছিলেন। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিবেদনে তার পরিবারে মানসিক অসুস্থতার পূর্ব ইতিহাসের কথাও উঠে আসে।
আদালত আরও বিবেচনায় নেয় যে, ঘটনার সময় তার বয়স ছিল মাত্র ১৯ বছর, তার বিরুদ্ধে পূর্বে কোনো ফৌজদারি অপরাধের রেকর্ড ছিল না এবং ঘটনার দুই দিন পর তিনি স্বেচ্ছায় থানায় আত্মসমর্পণ করেছিলেন।
রায়ে আরও বলা হয়, ঐশীর বাবা-মা দুজনই কর্মজীবনে অত্যন্ত ব্যস্ত ছিলেন এবং মেয়েকে পর্যাপ্ত সময় দিতে পারেননি। আদালত মন্তব্য করেন, সন্তানদের প্রথম শিক্ষক হচ্ছেন তাদের বাবা-মা ও অভিভাবক। তাই সন্তানদের জন্য একটি সুস্থ পরিবেশ নিশ্চিত করা এবং তাদের পর্যাপ্ত সময় দেওয়া অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।







