সীমান্তে বিজিবি-জনতার অভূতপূর্ব প্রতিরোধ
আবু সুফিয়ান, ঢাকা ও বাদশা ওসমানী, রংপুর
ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তজুড়ে দীর্ঘদিন ধরে চলমান উত্তেজনা ও বিএসএফের একতরফা কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে এবার গড়ে উঠেছে এক নতুন ধরনের প্রতিরোধ। সীমান্তের সাধারণ মানুষ বিজিবির সঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে সীমান্ত পাহারায় নেমেছেন, যা স্থানীয়দের ভাষায় এক অভূতপূর্ব গণপ্রতিরোধ।
গত দেড় দশকে বিএসএফের বিরুদ্ধে মানবাধিকার লঙ্ঘন, সীমান্তের জিরো পয়েন্টে অবৈধ স্থাপনা নির্মাণ এবং জোরপূর্বক ‘পুশইন’-এর অভিযোগ ক্রমেই বেড়েছে। তবে এসব কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে সীমান্তবাসীর মধ্যে এখন আর ভীতি নেই। বরং বিজিবির দেওয়া মাইক, টর্চ ও বাঁশি নিয়ে রাতভর পাহারা দিচ্ছেন নারী-পুরুষ ও তরুণরা।
গত ২০ থেকে ২৪ জুন উত্তরাঞ্চলের বিভিন্ন সীমান্ত এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, বিএসএফের যেকোনো ধরনের অনুপ্রবেশ বা পুশইনের চেষ্টা ঠেকাতে স্থানীয়রা বিজিবির সঙ্গে সক্রিয়ভাবে কাজ করছেন। অনেক এলাকায় গ্রামের মানুষ পালাক্রমে রাত জেগে পাহারা দিচ্ছেন।
বিজিবির কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, স্থানীয় জনগণের এই স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ সীমান্তে অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা প্রতিরোধে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। ৫৬ ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক লে. কর্নেল সিরাজুল ইসলাম বলেন, পুশইনসহ যেকোনো অপতৎপরতা প্রতিরোধে বিজিবি কঠোর অবস্থানে রয়েছে এবং সীমান্তে সাধারণ মানুষ ও আনসার-ভিডিপির সদস্যরা তাদের সহায়তা করছেন।
কূটনৈতিক সূত্র জানায়, সাম্প্রতিক সময়ে ভারতের বিভিন্ন সীমান্ত দিয়ে নারী ও শিশুসহ মানুষকে জোরপূর্বক বাংলাদেশে ঠেলে দেওয়ার চেষ্টা বেড়েছে। এ ঘটনায় বিজিবি একাধিকবার বিএসএফের সঙ্গে ফ্ল্যাগ মিটিং করেছে এবং সীমান্তে সর্বোচ্চ সতর্কতা জারি করেছে।
মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস ওয়াচও সম্প্রতি এক প্রতিবেদনে অভিযোগ করেছে, ভারত যথাযথ আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণ না করে জাতিগত বাঙালিদের বাংলাদেশে পুশইন করছে, যা আন্তর্জাতিক আইনের পরিপন্থী।
পুরোনো ক্ষত, নতুন প্রতিরোধ
কুড়িগ্রামের ফুলবাড়ী সীমান্তের বাসিন্দা সিরাজুল ইসলাম এখনও বহন করছেন বিএসএফের গুলিতে দুই ভাইকে হারানোর বেদনা। তিনি বলেন, “সেই ক্ষত আজও বুকে তাজা। কিন্তু এখন আমরা ভয় পাই না। নিজেদের জমিতে চাষ করব, নিজের দেশ রক্ষা করব।
একইভাবে ধুলারকুটি সীমান্তের রাসেল মিয়া ২০১৮ সালে বিএসএফের ছোড়া রাবার বুলেটে একটি চোখের দৃষ্টিশক্তি হারান। স্থানীয়দের মতে, অতীতের এসব নির্মম অভিজ্ঞতাই সীমান্তবাসীকে আজ আরও দৃঢ় করেছে।
নারীদের সাহসী ভূমিকা
পঞ্চগড়ের তেঁতুলিয়া সীমান্তে দেখা গেছে, নারীরাও প্রতিরোধের সামনের সারিতে রয়েছেন। স্থানীয় বাসিন্দা ফিরোজা খাতুন বলেন, “বিএসএফ কাউকে পুশইন করার চেষ্টা করলে আমি সঙ্গে সঙ্গে বিজিবিকে খবর দিই এবং গ্রামবাসীকে জাগিয়ে তুলি।
স্থানীয়দের ভাষ্য, অনেক ক্ষেত্রে নারীদের সম্মিলিত প্রতিবাদ ও উপস্থিতির কারণে বিএসএফ সদস্যরা পিছু হটতে বাধ্য হয়েছেন।
তরুণদের রাতভর পাহারা
স্থানীয় তরুণরা এখন সীমান্ত নিরাপত্তার অন্যতম ভরসা। তারা বিজিবির সঙ্গে টহল দিচ্ছেন, মাইকিং করছেন এবং সন্দেহজনক তৎপরতার তথ্য দিচ্ছেন।
এইচএসসি পরীক্ষার্থী শুভ পাটোয়ারী বলেন, “দেশের স্বার্থে আমরা পিছু হটব না। প্রয়োজনে রাত জেগে পাহারা দেব।”
অবকাঠামোগত সংকট
তবে সীমান্ত এলাকায় এখনো বড় সমস্যা রয়ে গেছে যোগাযোগ ব্যবস্থা। অনেক এলাকায় ভালো রাস্তা না থাকায় জরুরি মুহূর্তে বিজিবির দ্রুত পৌঁছানো কঠিন হয়ে পড়ে।
স্থানীয়রা জানান, ভারতের সীমান্ত এলাকায় পাকা রাস্তা ও বিএসএফ ক্যাম্প থাকলেও বাংলাদেশের অনেক সীমান্তে এখনো সেই সুবিধা নেই। সাবেক সংসদ সদস্য মোহাম্মদ রুহুল আমিন বলেন, সীমান্ত সড়ক উন্নয়ন করা হলে বিজিবির কার্যক্রম আরও কার্যকর হবে।
বিজিবির কর্মকর্তারাও স্বীকার করেছেন, ভাঙাচোরা রাস্তায় কখনো সাইকেলে করে টহল দিতে হয়, যা অত্যন্ত কষ্টকর ও ঝুঁকিপূর্ণ। তাদের মতে, সীমান্ত সড়কের উন্নয়ন এখন সময়ের দাবি।
বাংলাদেশের ৩০টি জেলার সঙ্গে ভারতের প্রায় ৪ হাজার ৯৬ কিলোমিটার সীমান্ত রয়েছে। এই দীর্ঘ সীমান্তে এখন নতুন বাস্তবতা হলো—সীমান্ত রক্ষায় শুধু আইনশৃঙ্খলা বাহিনী নয়, সাধারণ মানুষও হয়ে উঠেছেন দেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষার এক গুরুত্বপূর্ণ শক্তি।







