সংসদের সব রাজনৈতিক দলের মধ্যে বিভিন্ন ইস্যুতে মতবিরোধ থাকলেও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পাদিত ‘দাসত্বমূলক চুক্তির’ বিষয়ে তাদের মধ্যে এক অদ্ভুত ‘নীরবতার ঐক্য’ তৈরি হয়েছে বলে তীব্র সমালোচনা করেছেন বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক আনু মুহাম্মদ। আজ শুক্রবার কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে ‘গণতান্ত্রিক অধিকার কমিটি’ আয়োজিত এক গণজমায়েতে তিনি এই মন্তব্য করেন।
সমাবেশে আনু মুহাম্মদ অভিযোগ করেন, নির্বাচনের ঠিক আগমুহূর্তে জনগণের অজান্তে অন্তর্বর্তী সরকার যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে যে বাণিজ্য চুক্তি করেছে, তা মূলত মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের একটি একতরফা আদেশনামা। ৩২ পৃষ্ঠার এই দলিলটি বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, এটি কোনো দ্বিপাক্ষিক চুক্তি নয়, বরং বাংলাদেশকে কী করতে হবে তার মার্কিন হুকুমনামা। এই চুক্তির ফলে বাংলাদেশ শুল্কমুক্ত সুবিধায় যুক্তরাষ্ট্র থেকে অস্ত্র ও কৃষিপণ্যসহ বিভিন্ন পণ্য আমদানি করতে বাধ্য হবে, যা দেশের রাজস্ব কমিয়ে সাধারণ মানুষের ওপর কর ও ভর্তুকির বোঝা বাড়াবে। তিনি বলেন, দেশের প্রধান রাজনৈতিক দলগুলো ক্ষমতার স্বার্থে এই জাতীয় স্বার্থবিরোধী চুক্তির বিরুদ্ধে সম্পূর্ণ নীরব ভূমিকা পালন করছে।
তবে আনু মুহাম্মদের মার্কিন চুক্তি বিষয়ক এই কড়া সমালোচনার বিপরীতে দেশের রাজনৈতিক মহলে তীব্র সমালোচনা ও নতুন বিতর্ক তৈরি হয়েছে। সমালোচকদের বড় একটি অংশের দাবি, বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকারের মার্কিন চুক্তি নিয়ে আনু মুহাম্মদ ও তাঁর সহযোগীরা রাজপথে সোচ্চার হলেও, বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে ভারতের সঙ্গে একের পর এক হওয়া নানা ‘অসম ও দাসত্বমূলক’ চুক্তির সময় তাঁরা রহস্যজনকভাবে নীরব ছিলেন। তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা যখন প্রকাশ্যেই মন্তব্য করেছিলেন যে, “ভারতকে যা দিয়েছি, তারা আজীবন মনে রাখবে”, তখনও আনু মুহাম্মদরা কোনো জোরালো প্রতিরোধ গড়ে তোলেননি।
রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও সমালোচকদের মতে, বিগত ফ্যাসিবাদী সরকারের আমলে ভারতের আধিপত্যবাদী নীতি, ট্রানজিট সুবিধা, কিংবা রামপাল বিদ্যুৎ কেন্দ্রের মতো পরিবেশবিধ্বংসী ও জনস্বার্থবিরোধী চুক্তিগুলোর সময় বামপন্থী দল ও এই নাগরিক সমাজ দৃশ্যত রাজপথে নিষ্ক্রিয় ছিল। অনেকের অভিযোগ, তখন সোচ্চার ভূমিকা না রেখে প্রকারান্তরে শেখ হাসিনা সরকারকে নীরব সমর্থন দিয়ে যাওয়া এই গোষ্ঠীটিই এখন নতুন সরকারের আমলে মার্কিন চুক্তিকে সামনে এনে জলঘোলা করার চেষ্টা করছে, যা তাদের দ্বিমুখী ও পক্ষপাতমূলক রাজনৈতিক অবস্থানকেই স্পষ্ট করে তোলে।
‘জুলাই গণঅভ্যুত্থানের আকাঙ্ক্ষার পরিপন্থী ও মার্কিন বাণিজ্য চুক্তিসহ জাতীয় স্বার্থবিরোধী সব চুক্তি বাতিলের দাবিতে’ আয়োজিত এই গণজমায়েতে আরও উপস্থিত ছিলেন বিভিন্ন প্রগতিশীল সাংস্কৃতিক সংগঠনের প্রতিনিধিরা। সমাবেশে উদীচী, সমগীত ও কোরাস গান পরিবেশন করে এবং প্রাচ্যনাট ও বিবর্তন নাট্যদল বিশেষ নাটক প্রদর্শন করে। এ ছাড়া বিভিন্ন কবি ও আবৃত্তিশিল্পীরা স্বরচিত কবিতা পাঠের মাধ্যমে সমাবেশে সংহতি প্রকাশ করেন।







