শেখ হাসিনা সরকারের পতনের আগমুহূর্তে তার ঘনিষ্ঠ আত্মীয়স্বজনদের দেশত্যাগ নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। বিশেষ করে সাবেক ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের মেয়র শেখ ফজলে নূর তাপসের একটি ফোনালাপ প্রকাশ্যে আসার পর বিষয়টি আবারও রাজনৈতিক অঙ্গনে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে উঠে এসেছে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া একটি কল রেকর্ডে শোনা যায়, ২০২৪ সালের ৩ আগস্ট সকালে শেখ ফজলে নূর তাপস তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে কথা বলে বিদেশ যাওয়ার অনুমতি চান। কথোপকথনে তাপস জানান, তিনি সিঙ্গাপুর যেতে চান এবং বিমানবন্দরে অবস্থান করছেন। জবাবে শেখ হাসিনা তাকে যেতে বলেন। ওই অডিও প্রকাশের পর সরকার পতনের আগেই প্রভাবশালী নেতাদের দেশ ছাড়ার প্রস্তুতি নিয়ে নানা আলোচনা শুরু হয়।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, ওই সময় সারা দেশে ছাত্র-জনতার আন্দোলন চরম পর্যায়ে পৌঁছে গিয়েছিল। ৩ আগস্ট রাজধানীর কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে লাখো মানুষের সমাবেশে এক দফা দাবির ঘোষণা দেওয়া হয়। একই সময়ে প্রশাসন ও রাষ্ট্রযন্ত্রের ভেতরেও পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ বাড়তে থাকে। এমন বাস্তবতায় ক্ষমতাসীন পরিবারের সদস্য ও ঘনিষ্ঠদের দেশত্যাগের চেষ্টা বিশেষ গুরুত্ব পায়।
৫ আগস্ট শেখ হাসিনা পদত্যাগ করে দেশ ছাড়ার সময় তার সঙ্গে ছিলেন ছোট বোন শেখ রেহানা। পরবর্তীতে বিভিন্ন সূত্রে জানা যায়, পরিবারের অধিকাংশ সদস্যই দেশত্যাগে সক্ষম হন। আওয়ামী লীগের একাধিক নেতার ভাষ্য অনুযায়ী, শেখ পরিবারের অধিকাংশ সদস্য বর্তমানে ভারতে অবস্থান করছেন। কেউ কেউ কলকাতার বিভিন্ন আবাসিক এলাকায় বসবাস করছেন বলেও বিভিন্ন সময় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছবি ও ভিডিও প্রকাশিত হয়েছে।
শেখ হাসিনার ছেলে সজীব ওয়াজেদ জয় আগে থেকেই যুক্তরাষ্ট্রে অবস্থান করছিলেন। সরকার পতনের পর তিনি মায়ের সঙ্গে ভারতে সাক্ষাৎ করেছেন—এমন তথ্য বিভিন্ন মহলে আলোচিত হয়। অন্যদিকে শেখ হাসিনার মেয়ে সায়মা ওয়াজেদ বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া অঞ্চলের দায়িত্বে থাকায় দিল্লিতে অবস্থান করছিলেন। পরবর্তীতে তিনি কখনো দিল্লি, কখনো দুবাইয়ে অবস্থান করছেন বলে বিভিন্ন সূত্রে জানা যায়।
শেখ রেহানার ছেলে রাদওয়ান মুজিব সিদ্দিক (ববি), মেয়ে টিউলিপ সিদ্দিক এবং পরিবারের অন্যান্য সদস্যরাও বিদেশে অবস্থান করেন। টিউলিপ সিদ্দিক যুক্তরাজ্যের সংসদ সদস্য হওয়ায় আগে থেকেই যুক্তরাজ্যে ছিলেন। অন্যদিকে শেখ রেহানার পরিবারের আরও কয়েকজন সদস্যও বিভিন্ন দেশে অবস্থান করছেন বলে রাজনৈতিক সূত্রগুলো দাবি করে।
শেখ পরিবারের ফুফাতো ও চাচাতো ভাইদের অনেকেই আওয়ামী লীগ সরকারের গুরুত্বপূর্ণ পদে দায়িত্ব পালন করেছেন। শেখ ফজলুল করিম সেলিম, আবুল হাসানাত আবদুল্লাহ, শেখ হেলাল উদ্দীন, শেখ সালাহউদ্দিন জুয়েল, শেখ তন্ময়সহ পরিবারের একাধিক সদস্য সংসদ সদস্য, মন্ত্রী, মেয়র কিংবা দলীয় গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে ছিলেন। সরকার পতনের পর তাঁদের অধিকাংশই দেশত্যাগ করেন বলে বিভিন্ন সূত্রে জানা যায়।
আওয়ামী লীগের একাধিক সূত্রের দাবি, শেখ পরিবারের কয়েকজন সদস্য সাতক্ষীরা, সিলেট ও ময়মনসিংহ সীমান্ত ব্যবহার করে ভারত যান। রাজনৈতিক প্রভাব, প্রশাসনিক যোগাযোগ এবং আর্থিক সক্ষমতার কারণে তারা নিরাপদে দেশত্যাগ করতে সক্ষম হয়েছেন বলেও বিভিন্ন মহলে আলোচনা রয়েছে। যদিও এসব দাবির বিষয়ে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের আনুষ্ঠানিক বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
এদিকে শেখ পরিবারের প্রায় সবাই দেশত্যাগ করতে পারলেও আওয়ামী লীগের বিপুলসংখ্যক নেতা-কর্মী দেশে থেকে গ্রেপ্তার, মামলা ও আত্মগোপনের মুখে পড়েন। দলটির তৃণমূলের অনেক নেতা-কর্মীর মধ্যে এ নিয়ে অসন্তোষ তৈরি হয়েছে বলে আওয়ামী লীগের অভ্যন্তরীণ বিভিন্ন সূত্রে দাবি করা হয়।
বিশ্লেষকদের মতে, সরকার পতনের আগে ও পরে শেখ পরিবারের সদস্যদের দ্রুত দেশত্যাগ এবং তাদের বর্তমান অবস্থান নিয়ে যে আলোচনা তৈরি হয়েছে, তা বাংলাদেশের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক ইতিহাসের অন্যতম আলোচিত অধ্যায়ে পরিণত হয়েছে। একই সঙ্গে তাপসের ফোনালাপ প্রকাশ পাওয়ার পর ক্ষমতার শেষ মুহূর্তে সরকারের শীর্ষ পর্যায়ে কী ধরনের পরিস্থিতি বিরাজ করছিল, সে বিষয়েও নতুন করে নানা প্রশ্ন সামনে এসেছে।
গ্রেপ্তার সাবেক মন্ত্রী-এমপি ও কেন্দ্রীয় নেতারা
বর্তমানে কেন্দ্রীয় নেতাদের মধ্যে কাজী জাফর উল্যাহ, মো. আব্দুর রাজ্জাক, মুহাম্মদ ফারুক খান, শাজাহান খান, কামরুল ইসলাম, দীপু মনি, আহমদ হোসেন ও আবদুস সোবহান গোলাপ কারাগারে আছেন। এ ছাড়া শেখ হাসিনার উপদেষ্টা সালমান এফ রহমান, সাবেক আইনমন্ত্রী আনিসুল হক ও সাবেক প্রতিমন্ত্রী জুনাইদ আহ্মেদ পলকও কারাগারে আছেন।
রাজনীতিবিষয়ক লেখক ও গবেষক মহিউদ্দিন আহমদ প্রথম আলোকে বলেন, শেখ হাসিনার দুটি প্রিয় বিষয় হচ্ছে ক্ষমতা ও জ্ঞাতি–গোষ্ঠীপ্রীতি। তিনি ক্ষমতায় আঁকড়ে থাকার সর্বোচ্চ চেষ্টা করেছেন। ব্যর্থ হওয়ার পর জ্ঞাতি–গোষ্ঠীকে নিরাপদে পালাতে সহায়তা করেছেন। তিনি বলেন, আওয়ামী লীগের টানা সাড়ে ১৫ বছরের শাসন পারিবারিক শাসনে পরিণত হয়েছিল। এ সময় জ্ঞাতি–গোষ্ঠী, কিছু ব্যবসায়ী এবং পদধারীরা সর্বোচ্চ সুবিধা ভোগ করেছেন। সাধারণ কর্মী–সমর্থকেরা কামানের গোলা হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছেন। ভবিষ্যতেও এর পুনরাবৃত্তি হতে পারে।







