জীবন চলার পথে মানুষ নানা ধরনের ভুল ও গুনাহে জড়িয়ে পড়ে। কখনো অজ্ঞতাবশত, কখনো অসচেতনতা কিংবা প্রবৃত্তির তাড়নায় এমন কাজ হয়ে যায়, যা পরে অনুশোচনার কারণ হয়। মানুষ স্বভাবতই দুর্বল। তবে ভুলের পর হতাশ না হয়ে আল্লাহর রহমতের দিকে ফিরে আসা এবং তওবা করাই মুমিনের বৈশিষ্ট্য।
আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘বলুন, হে আমার বান্দাগণ, যারা নিজেদের প্রতি জুলুম করেছ, তোমরা আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ হয়ো না। নিশ্চয়ই আল্লাহ সব পাপ ক্ষমা করে দেন। নিশ্চয়ই তিনি অতি ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু।’ (সুরা জুমার, আয়াত: ৫৩)
আল্লাহর নৈকট্য অর্জন ও নিজেকে সংশোধনের জন্য কিছু অভ্যাস নিয়মিত চর্চা করা যেতে পারে।
১. ভুল স্বীকার করে তওবা করা
আল্লাহর নৈকট্য অর্জনের প্রথম ধাপ হলো নিজের ভুল ও গুনাহ উপলব্ধি করা। শুধু মুখে ক্ষমা চাওয়াই তওবা নয়; বরং নিজের কৃতকর্মের জন্য আন্তরিকভাবে অনুতপ্ত হওয়া, গুনাহ ছেড়ে দেওয়া এবং ভবিষ্যতে তা না করার দৃঢ় সংকল্প করাই প্রকৃত তওবা।
আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘হে মুমিনেরা! তোমরা আল্লাহর কাছে খাঁটি তওবা (তওবাতুন নাসুহা) করো।’ (সুরা তাহরিম, আয়াত: ৮)
২. ইবাদতে নিয়মিত হওয়া
নামাজ, জিকির ও অন্যান্য ইবাদত মানুষের অন্তরকে পরিশুদ্ধ করে এবং অন্যায় থেকে দূরে থাকতে সাহায্য করে। ব্যস্ত জীবনের মধ্যেও নিয়মিত ইবাদত মানুষকে আল্লাহর প্রতি দায়িত্ব ও পরকালের জবাবদিহির কথা স্মরণ করিয়ে দেয়।
আল্লাহ বলেন, ‘নিশ্চয়ই নামাজ অশ্লীল ও মন্দ কাজ থেকে বিরত রাখে।’ (সুরা আনকাবুত, আয়াত: ৪৫)
অন্য আয়াতে বলা হয়েছে, ‘জেনে রাখো, আল্লাহর স্মরণেই কেবল অন্তরসমূহ প্রশান্তি লাভ করে।’ (সুরা রা’দ, আয়াত: ২৮)
৩. উত্তম চরিত্র গড়ে তোলা
তাকওয়া মানুষের মর্যাদার অন্যতম মানদণ্ড। আর উত্তম চরিত্র একজন মুমিনের সৌন্দর্য বাড়ায়। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘তোমাদের মধ্যে সর্বোত্তম ব্যক্তি সে, যার চরিত্র সবচেয়ে উত্তম।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৬০৩৫)
প্রতিবেশীর অধিকার ও সদাচরণের ব্যাপারেও ইসলাম বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছে। রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি আল্লাহ ও পরকালের প্রতি ইমান রাখে, সে যেন তার প্রতিবেশীকে কষ্ট না দেয়।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৬০১৮)
৪. কুপ্রবৃত্তি নিয়ন্ত্রণ করা
রাগ, অহংকার, লোভ ও হিংসা মানুষের অন্তরের বিভিন্ন ব্যাধি। এগুলো নিয়ন্ত্রণ করতে না পারলে মানুষ নিজের প্রবৃত্তির কাছে পরাজিত হয় এবং ধীরে ধীরে সঠিক পথ থেকে দূরে সরে যেতে পারে।
আল্লাহ তাআলা নবী দাউদ (আ.)-কে বলেন, ‘হে দাউদ, আমি পৃথিবীতে তোমাকে খলিফা বানিয়েছি। সুতরাং তুমি মানুষের মধ্যে ন্যায়বিচার করো এবং খেয়ালখুশির অনুসরণ করো না; অন্যথা তা তোমাকে আল্লাহর পথ থেকে বিচ্যুত করে দেবে।’ (সুরা সোয়াদ, আয়াত: ২৬)
৫. ছোট ছোট নেক আমল করা
ভালো কাজ কখনোই তুচ্ছ নয়। সামান্য একটি নেক আমলও মানুষের জীবনে ইতিবাচক পরিবর্তন আনতে পারে। তাই বড় কোনো সুযোগের অপেক্ষা না করে প্রতিদিনের জীবনে ছোট ছোট ভালো কাজের অভ্যাস গড়ে তোলা উচিত।
আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘যে অণু পরিমাণ ভালো কাজ করবে, সে তা দেখতে পাবে।’ (সুরা জিলজাল, আয়াত: ৭)
৬. আল্লাহর রহমতের ওপর আশা রাখা
জীবনে যত কঠিন পরিস্থিতিই আসুক, আল্লাহর রহমত থেকে কখনো নিরাশ হওয়া উচিত নয়। বান্দা আন্তরিকভাবে তওবা করে আল্লাহর দিকে ফিরে এলে তিনি তা পছন্দ করেন।
রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘আল্লাহ তাঁর বান্দার তওবায় ঠিক ততটাই আনন্দিত হন, যতটা মরুভূমিতে হারিয়ে যাওয়া খাদ্য-পানীয়সহ সওয়ারি ফিরে পেয়ে কোনো পথিকের আনন্দ হয়।’ (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ২৭৪৭)
আল্লাহর দিকে ফিরে আসার পথ সবসময় খোলা। এর জন্য নির্দিষ্ট কোনো বয়স বা সময়সীমা নেই। মানুষ যখন নিজের ভুল উপলব্ধি করে সংশোধনের সিদ্ধান্ত নেয়, তখন থেকেই তার পরিবর্তনের যাত্রা শুরু হতে পারে।
লেখক: মাহমুদ হাসান ফাহিম, শিক্ষক, বাইতুল আকরাম মসজিদ ও মাদ্রাসা কমপ্লেক্স, গাজীপুর







