ফ্যামিলি কার্ড শুমারি-২০২৬-এর তথ্য সংগ্রহকারী ও সুপারভাইজার নিয়োগকে কেন্দ্র করে দেশের বিভিন্ন জেলায় ব্যাপক উত্তেজনা, বিক্ষোভ, হামলা ও ভাঙচুরের ঘটনা ঘটেছে। নিয়োগে অনিয়ম, দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতি ও রাজনৈতিক প্রভাবের অভিযোগ তুলে অন্তত ১৮টি উপজেলার প্রশাসনিক কার্যালয়ে হামলা, তালা ঝুলিয়ে দেওয়া, বিক্ষোভ ও মানববন্ধন করেছেন বিএনপি, ছাত্রদল এবং তাদের সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীরা। এসব ঘটনায় মাঠ প্রশাসনের কর্মকর্তারা দায়িত্ব পালনে চরম বিব্রতকর পরিস্থিতির মুখে পড়েছেন।
সবচেয়ে বড় ঘটনা ঘটে গাইবান্ধার ফুলছড়ি উপজেলায়। নিয়োগ পরীক্ষার ফল প্রকাশের পর ফল বাতিলের দাবিতে উপজেলা পরিষদ চত্বরে বিক্ষোভ শুরু হয়। একপর্যায়ে বিক্ষোভকারীরা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কার্যালয়ে হামলা চালিয়ে জানালার কাচ, চেয়ার ও ফুলের টব ভাঙচুর করেন। আন্দোলনকারীদের অভিযোগ, নিয়োগে ব্যাপক অনিয়ম হয়েছে এবং আওয়ামী লীগ-সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদেরও চূড়ান্ত তালিকায় রাখা হয়েছে।
ফুলছড়ি উপজেলা ছাত্রদলের আহ্বায়ক জয়নাল মিয়া দাবি করেন, নিজেও সুপারভাইজার পদে আবেদন করেও বাদ পড়েছেন, যদিও তার আগের অভিজ্ঞতা ছিল। তার ভাষ্য, যোগ্যদের বাদ দিয়ে পক্ষপাতমূলকভাবে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। তবে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. মোস্তাফিজুর রহমান জানান, ঘটনাটি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে এবং বিষয়টি যাচাই করে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
গাইবান্ধার সুন্দরগঞ্জেও একই অভিযোগে উপজেলা ও পৌর বিএনপির নেতাকর্মীরা বিক্ষোভ করেন। তারা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কার্যালয়ের মূল ফটক এবং সমাজসেবা কার্যালয়ে তালা ঝুলিয়ে দেন। বিক্ষোভকারীরা ইউএনও ও সমাজসেবা কর্মকর্তার বদলির দাবিও জানান। ইউএনও ঈফফাত জাহান তুলি বলেন, সরকারি অফিসে তালা দেওয়া সম্পূর্ণ অনভিপ্রেত এবং বিষয়টি নিয়ে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আলোচনা করে পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
পলাশবাড়ী ও সাদুল্লাপুরেও ছাত্রদলের উদ্যোগে বিক্ষোভ, সড়ক অবরোধ এবং ইউএনও কার্যালয়ে তালা ঝুলিয়ে দেওয়ার ঘটনা ঘটে। আন্দোলনকারীরা জেলা প্রশাসক ও ইউএনওর অপসারণ দাবি করে অভিযোগ করেন, আওয়ামী লীগ-সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের নিয়োগ দিয়ে সরকারের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করার চেষ্টা হয়েছে।
নোয়াখালীর বেগমগঞ্জে নিয়োগ নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করতে গিয়ে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাকে প্রকাশ্যে হুমকি দেওয়ার অভিযোগ ওঠে যুবদল নেতা কামরুল হাসান নিসানের বিরুদ্ধে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তার বক্তব্যের ভিডিও ছড়িয়ে পড়লে পরে তিনি ক্ষমা চেয়ে নতুন ভিডিও প্রকাশ করেন। ইউএনও মো. কায়েসুর রহমান বলেন, অভিযুক্ত ব্যক্তি প্রকাশ্যে দুঃখ প্রকাশ করায় তিনি আর বিষয়টি নিয়ে এগোতে চাননি।
পাবনার সাঁথিয়া, চাঁপাইনবাবগঞ্জের নাচোল, রাজশাহীর বাগমারা, কুষ্টিয়ার কুমারখালী, যশোরের কেশবপুর ও ঝিকরগাছা, গোদাগাড়ী, মৌলভীবাজারের রাজনগর, কুড়িগ্রামের নাগেশ্বরী, নাটোরের লালপুর ও বাগাতিপাড়াসহ বিভিন্ন উপজেলায় একই ধরনের অভিযোগে বিক্ষোভ, মানববন্ধন, ইউএনও কার্যালয় ঘেরাও এবং কোথাও কোথাও সরকারি দপ্তরে তালা ঝুলিয়ে দেওয়ার ঘটনা ঘটে।
নাচোলে বিক্ষোভকারীরা অভিযোগ করেন, আর্থিক লেনদেনের মাধ্যমে আওয়ামী লীগ ও জামায়াত-শিবির-সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের অগ্রাধিকার দিয়ে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। তারা ইউএনও ও উপজেলা সমাজসেবা কর্মকর্তার অপসারণ দাবি করেন এবং ২৪ ঘণ্টার মধ্যে ফল বাতিল না হলে আরও কঠোর কর্মসূচির হুঁশিয়ারি দেন।
বাগমারায় সুপারভাইজার পদে নাম না থাকায় ক্ষুব্ধ বিক্ষোভকারীদের মধ্যে থেকে ইউএনওকে ‘জবাই’ করার স্লোগান দেওয়া হয়, যার ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হয়। ইউএনও সেলিম আহমেদ জানান, বিষয়টি নিয়ে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে এবং নিয়োগ সম্পূর্ণ নীতিমালা অনুযায়ী হয়েছে।
যশোরের ঝিকরগাছায় পরীক্ষা বা ভাইভায় অংশ না নিয়েও একজনের নাম চূড়ান্ত তালিকায় ওঠার অভিযোগে ব্যাপক সমালোচনা শুরু হয়। পরে প্রশাসন এটিকে ‘তথ্যগত ত্রুটি’ উল্লেখ করে সংশোধনী বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করে ওই ফল বাতিল করে। তবে নিয়োগপ্রত্যাশীদের অভিযোগ, এটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়; পুরো নিয়োগ প্রক্রিয়াতেই অনিয়ম হয়েছে।
ময়মনসিংহের গৌরীপুরে নিয়োগে স্বজনপ্রীতি ও দলীয় প্রভাবের অভিযোগ তুলে এক ছাত্রদল নেতা পদত্যাগ করেন। জামালপুরের সরিষাবাড়ীতেও ফ্যামিলি কার্ড প্রকল্পে চাকরি না পাওয়ার ক্ষোভে ইউনিয়ন ছাত্রদলের দুই নেতা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পদত্যাগপত্র প্রকাশ করেন।
ফরিদপুরের নগরকান্দায় ফ্যামিলি কার্ড নিয়োগ নিয়ে অপপ্রচারের অভিযোগ এনে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা থানায় লিখিত অভিযোগ দায়ের করেছেন। অভিযোগে কয়েকজনের বিরুদ্ধে হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপ খুলে গুজব ছড়ানো এবং ফল প্রকাশের আগেই ভুয়া ফলাফল ছড়িয়ে জনমনে বিভ্রান্তি তৈরির অভিযোগ করা হয়েছে।
এসব ঘটনার পর মাঠ প্রশাসনের কর্মকর্তারা উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। নাম প্রকাশ না করার শর্তে একাধিক ইউএনও জানান, সরকারি নীতিমালা অনুযায়ী নিয়োগ দিতে গিয়ে তারা রাজনৈতিক চাপের মুখে পড়ছেন। দলীয় পরিচয়ে লোক নিয়োগের চাপ উপেক্ষা করলেই হামলা, ভাঙচুর ও হুমকির মুখোমুখি হতে হচ্ছে।
এক ইউএনও বলেন, তিনি সরকারের নির্দেশনা অনুযায়ী নিয়োগ দিলেও দলীয় সুপারিশ না মানায় তার কার্যালয়ে হামলা চালানো হয়েছে এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদেরও হেনস্তা করা হয়েছে। এতে সরকারি দায়িত্ব পালন অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়ছে।
এদিকে প্রশাসন ক্যাডার কর্মকর্তাদের সংগঠন বাংলাদেশ অ্যাডমিনিস্ট্রেটিভ সার্ভিস অ্যাসোসিয়েশনের মহাসচিব মো. বাবুল মিঞা সব ধরনের সহিংসতা ও সরকারি কার্যালয়ে হামলার নিন্দা জানিয়েছেন। তিনি বলেন, সরকারি কর্মকর্তাদের দায়িত্ব পালনে আইন, বিধি ও নীতিমালা অনুসরণ করতে হবে এবং প্রকৃত যোগ্যতার ভিত্তিতে নিরপেক্ষভাবে নিয়োগ কার্যক্রম পরিচালনায় সবাইকে সহযোগিতা করা উচিত।







