বাংলাদেশের রাজনীতিতে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর একটি অতি পরিচিত ও প্রভাবশালী নাম। দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে বিএনপির মহাসচিব হিসেবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও সংকটময় দায়িত্ব পালন করে আসা এই প্রবীণ রাজনীতিবিদ এবার দেশের ২৩তম রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে দলীয় প্রার্থী মনোনীত হয়েছেন। আজ বৃহস্পতিবার (১৩ আগস্ট) বিএনপি তাঁর এই প্রার্থিতা চূড়ান্ত করার পর, মাঠের রাজনীতির চেনা অবয়বের বাইরে থাকা তাঁর ব্যক্তিজীবনের এক অসাধারণ ও চমকপ্রদ অধ্যায় নতুন করে জনসমক্ষে ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আলোচনায় এসেছে।
রাজনীতির মাঠের কঠোর ও আপসহীন মির্জা ফখরুলকে পুরো দেশ চিনলেও, বাস্তব মঞ্চের একজন জাত অভিনেতা কিংবা সফল নাট্য নির্দেশক মির্জা ফখরুলকে জানার সুযোগ হয়েছে খুব কম মানুষেরই। একসময় নিজের জন্মভূমি ঠাকুরগাঁওয়ের সাংস্কৃতিক অঙ্গনের সঙ্গে অত্যন্ত নিবিড় ও গভীরভাবে যুক্ত ছিলেন তিনি। কেবল শখের বশে নাটক দেখা নয়, তিনি নিয়মিত মঞ্চনাটকে প্রধান চরিত্রে অভিনয় করতেন এবং সফলভাবে নাটক পরিচালনাও করতেন। জনপ্রিয় ম্যাগাজিন অনুষ্ঠান ‘ইত্যাদি’তে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি নিজের সেই সোনালী সাংস্কৃতিক জীবনের বহু অজানা স্মৃতি রোমন্থন করেছিলেন।
ছাত্রজীবনেই মূলত নাটকের প্রতি এক গভীর সখ্য ও ভালোবাসার জন্ম হয়েছিল মির্জা ফখরুলের। ঠাকুরগাঁওয়ের প্রাচীন ও ঐতিহ্যবাহী নাট্যচর্চার ইতিহাস তুলে ধরে তিনি জানান, ওখানকার প্রখ্যাত নাট্যব্যক্তিত্ব ফণী ভূষণ পালিদের হাত ধরেই তাঁর নাট্যজীবনের হাতেখড়ি হয়েছিল। রাজা অষ্টম এডওয়ার্ডের অভিষেক উপলক্ষে ঠাকুরগাঁওয়ে যে প্রাচীন নাট্য সমিতি প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল, সেই ধারাবাহিকতায় বড় হওয়া মির্জা ফখরুল কেবল মঞ্চ কাঁপানো অভিনেতাই ছিলেন না, পর্দার আড়াল থেকে সফলভাবে নাট্য নির্দেশনার গুরুদায়িত্বও সামলেছেন বহুবার।
মির্জা ফখরুলের অভিনয়জীবনের সবচেয়ে রোমাঞ্চকর ও গৌরবোজ্জ্বল অধ্যায় হলো ঢাকাই চলচ্চিত্রের দুই কিংবদন্তি অভিনেতার সঙ্গে মঞ্চ ভাগ করে নেওয়া। খ্যাতিমান চিত্রনায়ক রহমান (আবদুর রহমান) ছিলেন তাঁর আপন মামাতো ভাই। এই রুপালী পর্দার তারকার পাশাপাশি ‘ঢাকাই চলচ্চিত্রের নবাব’ খ্যাত প্রখ্যাত অভিনেতা আনোয়ার হোসেনের সঙ্গেও সরাসরি মঞ্চে দাঁড়িয়ে অভিনয় করার সৌভাগ্য হয়েছিল মির্জা ফখরুলের। একই সঙ্গে এই দুই গুণী অভিনেতার নাটক পরিচালনার বিরল সুযোগও হয়েছিল তাঁর, যা তিনি আজীবন তাঁর অন্যতম সেরা স্মারক বলে মনে করেন।
বর্ণাঢ্য জীবনে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর একাধারে শিক্ষকতা, সংস্কৃতিচর্চা ও রাজনীতি—তিনটি ভিন্ন ভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রে যুক্ত থেকেছেন। ‘ইত্যাদি’র সেই আলাপচারিতায় যখন তাঁর কাছে জানতে চাওয়া হয়েছিল যে, এই তিন অভিজ্ঞতার মধ্যে কোনটি তাঁর কাছে সবচেয়ে বেশি উপভোগ্য ছিল? রাজনীতির সব কঠিন বাস্তবতাকে একপাশে সরিয়ে রেখে মির্জা ফখরুল অকপটে বেছে নিয়েছিলেন সংস্কৃতিকে। তিনি অত্যন্ত আবেগঘন কণ্ঠে বলেছিলেন, ‘নিঃসন্দেহে সাংস্কৃতিক জগৎটাই বেশি উপভোগ্যের বিষয়।’ তৃণমূলের পৌর মেয়র থেকে শুরু করে আজ দেশের সর্বোচ্চ অভিভাবক অর্থাৎ রাষ্ট্রপতি পদের দৌড়ে থাকা এই ব্যক্তিত্বের ভেতরের মানুষটিকে বুঝতে মঞ্চের এই আলো আজও সমান প্রাসঙ্গিক।







