সরকারের প্রথম ছয় মাসে প্রত্যাশিত অগ্রগতি হয়নি বলে অভিযোগ করেছে আমার বাংলাদেশ (এবি) পার্টি। দলটির দাবি, দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি, বিদ্যুৎ ও গ্যাস সংকট, ক্যাম্পাসে সহিংসতা, দলীয় নিয়োগ এবং অর্থনৈতিক স্থবিরতায় জনমনে হতাশা বাড়ছে। তাদের মতে, অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ের তুলনায় কিছু ক্ষেত্রে পরিস্থিতি আরও খারাপ হয়েছে।
সোমবার রাজধানীর বিজয়নগরে এবি পার্টির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে ‘সরকারের ছয় মাস: প্রতিশ্রুতি বনাম বাস্তবতা! জনগণের সামনে পূর্ণাঙ্গ খতিয়ান’ শীর্ষক সংবাদ সম্মেলনে এসব কথা বলা হয়।
এবি পার্টির চেয়ারম্যান মজিবুর রহমান মঞ্জু বলেন, একটি নির্বাচিত সরকারের কর্মদক্ষতা মূল্যায়নের জন্য ছয় মাস কম সময় নয়। সরকারের মেয়াদের ১০ ভাগের এক ভাগ ইতোমধ্যে শেষ হয়েছে। তবে এই সময়ের মধ্যেই সরকারের পূর্ণাঙ্গ সফলতা বা ব্যর্থতার চূড়ান্ত হিসাব করা ঠিক হবে না।
তিনি বলেন, অর্থনীতি, আইনশৃঙ্খলা, দ্রব্যমূল্য, সুশাসন, উৎপাদন, ব্যবসা-বাণিজ্য এবং গণতান্ত্রিক চর্চাসহ বিভিন্ন সূচকে সরকারের কার্যক্রম মূল্যায়ন করা যায়। এসব বিবেচনায় ছয় মাসে আশানুরূপ অগ্রগতি দেখা যায়নি। বরং কিছু ক্ষেত্রে পরিস্থিতির অবনতি হয়েছে।
বিদ্যুৎ-গ্যাস সংকটে উদ্বেগ
মজিবুর রহমান মঞ্জু বলেন, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি ব্যবস্থাপনায় সরকারের কার্যক্রম হতাশাজনক। গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকটের কারণে শত শত কলকারখানা বন্ধ হয়ে গেছে। একই সঙ্গে এক হাজারের বেশি নতুন কারখানা চালুর বিষয়েও অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।
সরকার কর্মসংস্থান বাড়ানোর আশ্বাস দিলেও বাস্তবে বেকারত্ব বেড়েছে বলে দাবি করেন তিনি। তার মতে, সামগ্রিকভাবে অর্থনীতি স্থবির হয়ে পড়েছে এবং দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতিতে মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়েছে। অথচ সেই অনুপাতে জীবনমানের উন্নতি হয়নি।
জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় সব রাজনৈতিক দলের সঙ্গে আলোচনার পরামর্শ দেওয়া হলেও সরকার তা আমলে নেয়নি বলে অভিযোগ করেন তিনি। ভবিষ্যতে জ্বালানি সংকট আরও ভয়াবহ হতে পারে উল্লেখ করে মঞ্জু বলেন, বিদ্যুৎ ও গ্যাস খাতের পুরোনো ‘মাফিয়া চক্র’ এখনও সক্রিয় রয়েছে।
‘সবার আগে দলীয়তন্ত্র’
সরকারের সুশাসন নিয়েও প্রশ্ন তোলেন এবি পার্টির চেয়ারম্যান। প্রশাসনে বিভিন্ন নিয়োগে দলীয় ব্যক্তিদের প্রাধান্য এবং ক্যাম্পাসকেন্দ্রিক সহিংসতা সরকারের সুশাসন নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন তৈরি করেছে বলে মন্তব্য করেন তিনি।
প্রধানমন্ত্রী মিতব্যয়িতা, সময়ানুবর্তিতা ও সাদামাটা জীবনযাপনের বার্তা দিলেও সরকারি দলের নেতা-কর্মীদের মধ্যে তার প্রতিফলন নেই বলেও মন্তব্য করেন মঞ্জু।
খাল খনন, ফ্যামিলি কার্ড, কৃষক কার্ড এবং ধর্মীয় পুরোহিতদের ভাতাসহ বিভিন্ন সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচির মাধ্যমে সরকার সামাজিক অর্থনীতিতে গতি আনার চেষ্টা করছে বলে স্বীকার করেন তিনি। তবে এসব উদ্যোগের কাঙ্ক্ষিত প্রভাব দেখা যাচ্ছে না এবং বিভিন্ন কর্মসূচি নিয়ে দুর্নীতির অভিযোগ উঠছে বলেও দাবি করেন তিনি।
মঞ্জুর আশঙ্কা, সরকারের কর্মকাণ্ডে জনদুর্ভোগ আরও বাড়লে পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছাতে পারে যে বিরোধী দলের আন্দোলনের প্রয়োজন হবে না; সাধারণ মানুষই ধৈর্য হারিয়ে রাস্তায় নেমে আসতে পারে।
তিনি বলেন, ছয় মাসের সার্বিক মূল্যায়নে সরকারের গতি ও অগ্রগতি হতাশাজনক। ‘সবার আগে বাংলাদেশ’-এর পরিবর্তে সরকার ‘সবার আগে দলীয়তন্ত্রকে’ প্রাধান্য দিচ্ছে বলেও অভিযোগ করেন তিনি।
বিএনপির ৩১ দফা নিয়েও সমালোচনা
এবি পার্টির সাধারণ সম্পাদক ব্যারিস্টার আসাদুজ্জামান ফুয়াদ বলেন, দেশে রাজনৈতিক সহিংসতার সংস্কৃতি আবার ফিরে আসছে। তবে এখন পর্যন্ত রাজনৈতিক সহনশীলতা বজায় থাকা ইতিবাচক বিষয়। পুরো মেয়াদে এই সহনশীলতা অব্যাহত রাখার আহ্বান জানান তিনি।
ভারত সফর নিয়ে সরকারের অবস্থানকে ইতিবাচক হিসেবে দেখছে এবি পার্টি বলেও জানান ফুয়াদ।বিএনপির ৩১ দফা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, গণভোট চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে বলা হলেও ৩১ দফা বিএনপির নিজেদের প্রস্তাব। অথচ এর ৮ থেকে ১০টি দফা বাস্তবায়ন করা হয়নি বলে অভিযোগ করেন তিনি।
দলীয় নিয়োগ প্রসঙ্গে ফুয়াদ বলেন, নীতিমালা অনুযায়ী যোগ্য ব্যক্তিদের নিয়োগ দেওয়া হলে আপত্তির কারণ নেই। তবে ক্রীড়াঙ্গনকে দলীয়করণ না করার যে প্রতিশ্রুতি বিএনপি দিয়েছিল, তা তারা রক্ষা করেনি।
বিচার বিভাগ ও দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) পুনর্গঠন এবং নির্বাচন কমিশনে নিয়োগ নিয়েও বিএনপির বিরুদ্ধে প্রতিশ্রুতি ভঙ্গের অভিযোগ তোলেন তিনি। তার ভাষায়, ছয় মাসের মধ্যেই বিএনপি তাদের ৩১ দফা ভুলে গেছে।
গুম ও জ্বালানি খাত নিয়ে উদ্বেগ
গুম ও মানবাধিকার প্রসঙ্গে আসাদুজ্জামান ফুয়াদ বলেন, অন্তর্বর্তী সরকারের সময় প্রণীত অধ্যাদেশ বাতিল করে আওয়ামী লীগ আমলের আইনের চেয়েও দুর্বল আইন করা হয়েছে। গুমের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদেরই তদন্তের দায়িত্ব দেওয়ার সুযোগ রাখা হয়েছে বলেও অভিযোগ করেন তিনি।
জ্বালানি খাত বেসরকারীকরণের বিষয়েও সতর্ক করে তিনি বলেন, সংসদে যথাযথ নীতিমালা প্রণয়ন ছাড়া জ্বালানি খাত বেসরকারি হাতে দেওয়া উচিত নয়। এবি পার্টি বেসরকারীকরণের বিরোধী নয়, তবে পুরো প্রক্রিয়াটি স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক হতে হবে।
উগ্রবাদ মোকাবিলায় সব রাজনৈতিক দলকে নিয়ে সমন্বিতভাবে কাজ করার আহ্বানও জানান তিনি।সংবাদ সম্মেলনে দলের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আমিনুল ইসলাম এফসিএ, এনইসি সদস্য ব্যারিস্টার আব্বাস ইসলাম খান নোমান, ঢাকা মহানগর দক্ষিণের আহ্বায়ক আব্দুল হালিম খোকন, মহানগর উত্তরের আহ্বায়ক সেলিম খান, শ্রমবিষয়ক সম্পাদক শাহ আব্দুর রহমান, সাংগঠনিক সম্পাদক (বরিশাল) গাজী নাসির ও কর্মসংস্থানবিষয়ক সম্পাদক সফিউল বাশারসহ দলের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতারা উপস্থিত ছিলেন।







