কক্সবাজারের একটি পাঁচতারকা হোটেলের পার্কিং থেকে তিনটি বিলাসবহুল গাড়ি জব্দ করেছে শুল্ক গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তর। গাড়িগুলোর বৈধ আমদানি ও ক্রয়সংক্রান্ত প্রয়োজনীয় কাগজপত্র দেখাতে না পারায় শুক্রবার (২৮ আগস্ট) বিকেলে এগুলো জব্দ করা হয়।
সংস্থাটির অতিরিক্ত মহাপরিচালক রেজভী আহম্মেদ জানান, ‘ইউজড কার পার্টস’ ঘোষণা দিয়ে বিভিন্ন গাড়ির যন্ত্রাংশ আমদানি করে পরে সেগুলো সংযোজনের মাধ্যমে পূর্ণাঙ্গ গাড়িতে রূপান্তরের একটি কৌশল তদন্তে উঠে এসেছে। এর মাধ্যমে শুল্ক ফাঁকি দেওয়া হচ্ছে কি না, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
তিনি জানান, বৃহস্পতিবার মোংলা বন্দরে ‘ইউজড কার পার্টস’ ঘোষণা দিয়ে আনা কয়েকটি চালান সম্পর্কে গোয়েন্দা তথ্য পাওয়া যায়। চালান পরীক্ষা করে দেখা যায়, আমদানি করা যন্ত্রাংশগুলো একত্র করলে অল্প সময়ের মধ্যেই পূর্ণাঙ্গ গাড়ি তৈরি করা সম্ভব।
শুল্ক গোয়েন্দার এই কর্মকর্তা বলেন, আন্তর্জাতিক কাস্টমস বিধি অনুযায়ী পণ্যের মৌলিক বৈশিষ্ট্য বিবেচনায় শুল্ক নির্ধারণ করা হয়। প্রয়োজনীয় প্রায় সব যন্ত্রাংশ একসঙ্গে এনে সংযোজনের মাধ্যমে একটি পূর্ণাঙ্গ পণ্য তৈরি করা হলে সেটিকে চূড়ান্ত পণ্য হিসেবে বিবেচনা করা হতে পারে।
এরই ধারাবাহিকতায় বৃহস্পতিবার চট্টগ্রামের একটি আবাসিক এলাকার পার্কিং থেকে একটি পূর্ণাঙ্গ বিএমডব্লিউ গাড়ি জব্দ করা হয়। গাড়িটির বৈধ আমদানি বা ক্রয়ের কোনো নথি দেখাতে পারেননি ব্যবহারকারী।
পরে গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে কক্সবাজারে আরও তিনটি গাড়ির অবস্থান সম্পর্কে তথ্য পাওয়া যায়। তদন্ত করে ওশান প্যারাডাইস হোটেলের পার্কিংয়ে গাড়িগুলোর সন্ধান পায় শুল্ক গোয়েন্দা দল।
রেজভী আহম্মেদ জানান, তিনটি গাড়ির মধ্যে দুটিতে কোনো নম্বর প্লেট ছিল না। গাড়িগুলোর মালিক দাবিদারদের কাছে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র চাওয়া হলেও তারা গাড়িগুলো ‘রেজিস্ট্রেশন প্রক্রিয়াধীন’ বলে দাবি করেন। তবে ‘অ্যাপ্লাইড ফর রেজিস্ট্রেশন’ সংক্রান্ত কোনো কাগজও তারা দেখাতে পারেননি। পরে আইন অনুযায়ী ডিটেনশন মেমো ইস্যু করে গাড়িগুলো জব্দ করা হয়।
জিজ্ঞাসাবাদে গাড়িগুলোর সঙ্গে থাকা তরুণরা দাবি করেন, গাড়িগুলো তারা বাবার কাছ থেকে উপহার হিসেবে পেয়েছেন। তবে নথিপত্র যাচাই করে এ দাবির সত্যতা যাচাই করা হবে বলে জানিয়েছেন শুল্ক গোয়েন্দার কর্মকর্তা।
গাড়িগুলোর সঙ্গে থাকা তিন তরুণকে প্রাথমিকভাবে শনাক্ত করা হয়েছে। তাদের জন্মনিবন্ধন, পাসপোর্টের তথ্য এবং হোটেলের সিসিটিভি ফুটেজ সংগ্রহ করা হয়েছে। তবে গাড়িগুলোর প্রকৃত মালিক কে, সে বিষয়ে এখনই কোনো মন্তব্য করেননি কর্মকর্তারা।
জব্দ গাড়ির আনুমানিক মূল্য সম্পর্কে রেজভী আহম্মেদ বলেন, গাড়ির মূল্য নির্ধারণে তারা বিশেষজ্ঞ নন। তবে বিএমডব্লিউ গাড়ির দাম ৮০ লাখ থেকে ৭ কোটি টাকা পর্যন্ত হতে পারে। চার হাজার সিসির বেশি ইঞ্জিন হলে শুল্কের হারও ভিন্ন হয়।
তিনি জানান, জাপানি গাড়ির ক্ষেত্রে ‘ইয়েলো বুক’ অনুসরণ করে মূল্য নির্ধারণ করা হয়। জব্দ করা গাড়িগুলো প্রাথমিকভাবে স্পোর্টস কার ও বিলাসবহুল গাড়ি বলে মনে হচ্ছে।
শুল্ক গোয়েন্দা কর্মকর্তারা এখন গাড়িগুলো কীভাবে দেশে এসেছে, কোথায় সংযোজন করা হয়েছে এবং আমদানি প্রক্রিয়ায় কোনো অনিয়ম ছিল কি না, তা তদন্ত করছেন। চোরাচালানের প্রমাণ পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে প্রযোজ্য আইনে ব্যবস্থা নেওয়ার পাশাপাশি এর সঙ্গে জড়িত নেটওয়ার্ক শনাক্ত করা হবে।
আমদানি প্রক্রিয়ায় অনিয়ম পাওয়া গেলে বৈদেশিক মুদ্রা নিয়ন্ত্রণ আইন ও মানি লন্ডারিংয়ের বিষয়ও তদন্তে আসতে পারে। গাড়ির ব্র্যান্ড নকলের প্রমাণ পাওয়া গেলে মেধাস্বত্ব লঙ্ঘনের বিষয়টিও খতিয়ে দেখা হবে।
অভিযানে র্যাব-১৫, কক্সবাজার জেলা পুলিশ এবং বিভিন্ন জাতীয় গোয়েন্দা সংস্থা সহযোগিতা করেছে। পুরো অভিযানের সিসিটিভি ফুটেজও সংগ্রহ করা হয়েছে বলে জানানো হয়েছে।
শুল্ক গোয়েন্দার হেফাজতে থাকা গাড়িগুলোর বিষয়ে তদন্ত শেষ হওয়ার পর পরবর্তী ব্যবস্থা নির্ধারণ করা হবে। বিদেশি কোনো নাগরিক এ ঘটনায় জড়িত কি না, তা এখনো নিশ্চিত নয় বলে জানিয়েছেন কর্মকর্তারা।
এদিকে প্রেস ব্রিফিংয়ের খবর পেয়ে গণমাধ্যমকর্মীরা হোটেলে গেলে গাড়িগুলোর সঙ্গে থাকা তরুণরা তাদের সঙ্গে অশালীন আচরণ করেন এবং একপর্যায়ে সাংবাদিকদের ওপর চড়াও হওয়ার চেষ্টা করেন। পরে হোটেল কর্তৃপক্ষ ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনেন।







