ইসলামে ‘ইহসান’ শব্দটির সাধারণ অর্থ ‘দয়া’ বা ‘উপকার’ মনে করা হলেও এর প্রকৃত ব্যাপ্তি অত্যন্ত গভীর। প্রতিটি কাজে পরম উৎকর্ষ অর্জন করা, আচরণে সৌন্দর্য ফুটিয়ে তোলা এবং সৃষ্টিকুলের কল্যাণে নিজেকে বিলিয়ে দেওয়ার নামই ইহসান। পবিত্র কোরআন ও হাদিসের আলোকে মানুষের আত্মিক বিকাশ, প্রকৃতি ও প্রাণীর অধিকার সংরক্ষণ এবং পারস্পরিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে ইহসানের গুরুত্ব অপরিসীম।
কোরআনে বলা হয়েছে, “সাত আকাশ, পৃথিবী এবং তাদের মধ্যবর্তী সবকিছুই তাঁর পবিত্রতা ও মহিমা ঘোষণা করে; এমন কিছু নেই যা তাঁর প্রশংসাসহ পবিত্রতা পাঠ করে না, কিন্তু তোমরা তাদের স্তুতিগান উপলব্ধি করতে পারো না।” (সুরা ইসরা, আয়াত: ৪৪)। এই অনুভূতি থেকে মানুষের অন্তরে সৃষ্টির প্রতি গভীর ভালোবাসার জন্ম হয়। নবুয়ত পাওয়ার আগে থেকে সালাম দেওয়া মক্কার একটি পাথরের কথা স্মরণ করে রাসুল (সা.)-ও প্রকৃতির সঙ্গে আত্মিক সম্পর্কের এক অনুপম দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন।
মানুষের সঙ্গে সম্পর্কের চালিকাশক্তি হিসেবে কোরআনে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে, “আর তুমি মানুষের প্রতি তেমন সুন্দর আচরণ করো, যেমন সুন্দর আচরণ আল্লাহ তোমার প্রতি করেছেন।” (সুরা কাসাস, আয়াত: ৭৭)। কেবল অর্থ দানই নয়; কাজে সততা রক্ষা, চোখের জল মোছানো বা আশ্বস্ত করে একমুঠো হাসি উপহার দেওয়াও ইহসানের অন্তর্ভুক্ত। একইভাবে ফিকহশাস্ত্রে পশুপাখি ও উদ্ভিদের যত্নের বাধ্যবাধকতা এবং জবাইয়ের সময়ও দ্রুত কষ্টমুক্ত করার যে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে, তা প্রাণীর অধিকার রক্ষায় ইসলামের সংবেদনশীলতারই প্রমাণ।
দৈনন্দিন জীবনে মা-বাবার সেবা করা (সুরা ইসরা, আয়াত: ২৩–২৪), কঠিন পরিস্থিতিতে সহনশীল থাকা (সুরা হুদ, আয়াত: ১১৫), প্রতিশোধ না নিয়ে ক্ষমা করা (সুরা মায়িদাহ, আয়াত: ১৩) এবং এতিম-মিসকিনসহ দুর্বলের পাশে দাঁড়ানোকে (সুরা নিসা, আয়াত: ৩৬) ইহসানের বহুমাত্রিক রূপ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।
ইহসানের আত্মিক সংজ্ঞায় রাসুল (সা.) বলেছেন, “ইহসান হলো, তুমি এমনভাবে আল্লাহর ইবাদত পালন করবে যেন তুমি তাঁকে নিজের চোখে দেখতে পাচ্ছ; আর যদি তুমি তাঁকে দেখতে না পাও, তবে নিশ্চিত জানবে যে তিনি তোমাকে দেখছেন।” (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ৮)। যারা জীবনকে এমন নৈতিক ও আত্মিক সৌন্দর্যে সাজায়, তাদের বিষয়ে কোরআনের স্পষ্ট ঘোষণা—”নিশ্চয়ই আল্লাহ তাদের সঙ্গে আছেন যারা খোদাভীতি অবলম্বন করে এবং যারা সুন্দরতম আচরণের অধিকারী।” (সুরা নাহল, আয়াত: ১২৮)।







