সিলিকন ভ্যালির প্রযুক্তি, হলিউডের বিনোদনশিল্প এবং ক্যালিফোর্নিয়ার বিশাল অর্থনীতি যুক্তরাষ্ট্রকে বিশ্ব অর্থনীতির অন্যতম শক্তিশালী অবস্থানে নিয়ে গেছে। কিন্তু এই সমৃদ্ধির বিপরীত চিত্রও রয়েছে। লস অ্যাঞ্জেলেসসহ ক্যালিফোর্নিয়ার বিভিন্ন শহরে বিলাসবহুল ভবনের পাশেই হাজারো মানুষকে তাঁবু, গাড়ি কিংবা অস্থায়ী আশ্রয়ে রাত কাটাতে হয়।
প্রশ্ন হলো, ৪.৫ ট্রিলিয়ন ডলারের বেশি অর্থনীতির একটি অঙ্গরাজ্যে কর্মজীবী মানুষেরও কেন নিরাপদ আবাসন নিশ্চিত হচ্ছে না?
এর কারণ কেবল বেকারত্ব বা ব্যক্তিগত ব্যর্থতা নয়। আবাসনের সংকট, অস্বাভাবিক বাড়িভাড়া, আয়বৈষম্য, মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যা, মাদকাসক্তি, ভূমি ব্যবহারের বিধিনিষেধ এবং সরকারি ব্যয়ের জবাবদিহির ঘাটতি—সব মিলিয়ে পরিস্থিতিকে জটিল করে তুলেছে।
বাংলাদেশের জন্য এই অভিজ্ঞতার মূল শিক্ষা হলো, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির পাশাপাশি সাশ্রয়ী আবাসন, সামাজিক সুরক্ষা ও সরকারি ব্যয়ের কার্যকারিতা নিশ্চিত করাও জরুরি।
অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি মানেই সবার নিরাপত্তা নয়
ক্যালিফোর্নিয়ার অর্থনীতি প্রযুক্তি, বিনোদন, কৃষি, উৎপাদনশিল্প, স্বাস্থ্যসেবা ও আর্থিক খাতের ওপর ভিত্তি করে গড়ে উঠেছে। অর্থনৈতিক উৎপাদনের দিক থেকে অঙ্গরাজ্যটি বিশ্বের বৃহত্তম অর্থনীতিগুলোর সঙ্গে তুলনীয়।
তবে মোট দেশজ উৎপাদন বা জিডিপি দিয়ে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার প্রকৃত চিত্র পুরোপুরি বোঝা যায় না। একজন পরিচ্ছন্নতাকর্মী বাড়িভাড়া দিতে পারছেন কি না, একজন ডেলিভারিকর্মী হঠাৎ অসুস্থ হলে চিকিৎসার খরচ বহন করতে পারবেন কি না কিংবা একটি পরিবার সাময়িক আয়হানির ধাক্কা সামলাতে পারবে কি না—এসব প্রশ্নও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
ক্যালিফোর্নিয়ায় অনেক মানুষ পূর্ণকালীন কাজ করেও স্থায়ী আবাসনের ব্যবস্থা করতে পারছেন না। আয়ের বড় অংশ বাড়িভাড়ায় চলে গেলে গাড়ি নষ্ট হওয়া, অসুস্থতা কিংবা কয়েক দিনের কর্মহীনতাও তাঁদের আর্থিক বিপর্যয়ের মুখে ফেলতে পারে।
আবাসনসংকটের পেছনে যেসব কারণ
কর্মসংস্থানের কেন্দ্রগুলোর আশপাশে পর্যাপ্ত বাড়ি নির্মাণ না হওয়া ক্যালিফোর্নিয়ার আবাসনসংকটের অন্যতম কারণ। কঠোর জোনিং বিধি, দীর্ঘ অনুমোদনপ্রক্রিয়া এবং অধিক ঘনত্বের আবাসন নির্মাণে স্থানীয় বাসিন্দাদের আপত্তি নতুন বাড়ি তৈরির গতি কমিয়ে দিতে পারে। নিজের এলাকায় নতুন আবাসন প্রকল্প না চাওয়ার এই প্রবণতা ‘নিমবি’ নামে পরিচিত।
অন্যদিকে, উচ্চ আয়ের মানুষ সীমিতসংখ্যক বাড়ির জন্য বেশি ভাড়া বা দাম দিতে সক্ষম। এতে আবাসনের ব্যয় সাধারণ শ্রমজীবী মানুষের নাগালের বাইরে চলে যায়। কেউ অতিরিক্ত জনাকীর্ণ বাসায় থাকতে বাধ্য হন, কেউ দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে কর্মস্থলে যান, আবার কেউ গাড়ি কিংবা রাস্তায় রাত কাটান।
ঢাকাসহ বাংলাদেশের দ্রুত বর্ধনশীল শহরগুলোর জন্য এটি গুরুত্বপূর্ণ সতর্কবার্তা। আবাসনকে শুধু ব্যক্তিগত বিষয় হিসেবে দেখলে চলবে না; একে অর্থনৈতিক অবকাঠামোর অংশ হিসেবে বিবেচনা করতে হবে।
কর্মসংস্থানের কেন্দ্রের কাছাকাছি সাশ্রয়ী ও পরিকল্পিত আবাসন গড়ে তোলার পাশাপাশি গণপরিবহন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, হাসপাতাল, পয়োনিষ্কাশন এবং অন্যান্য নাগরিক সুবিধা নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
প্রবৃদ্ধির সুফল সবার কাছে পৌঁছাতে হবে
ক্যালিফোর্নিয়া দেখিয়েছে, অর্থনীতির আকার বাড়লেও সম্পদ সবার মধ্যে সমানভাবে বণ্টিত না হলে সাধারণ মানুষের অনিশ্চয়তা কাটে না। প্রযুক্তি ও বিনোদনশিল্পে বিপুল সম্পদ তৈরি হলেও সেই সম্পদের সুফল সমাজের সব শ্রেণির মানুষের কাছে সমানভাবে পৌঁছায়নি।
ঢাকায় জমি ও বাড়ির দাম যদি মজুরির তুলনায় দ্রুত বাড়তে থাকে, তাহলে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির সুফল সাধারণ মানুষের কাছে ক্রমেই কমে যেতে পারে। একটি শহর অর্থনৈতিকভাবে সমৃদ্ধ হলেও বাড়িভাড়া, যাতায়াত ও নিত্যপ্রয়োজনীয় ব্যয় মেটানোর পর পরিবারের হাতে পর্যাপ্ত অর্থ নাও থাকতে পারে।
তাই উন্নয়নের সাফল্য শুধু জিডিপি, রপ্তানি কিংবা বিনিয়োগের পরিমাণ দিয়ে বিচার করা যথেষ্ট নয়। মানুষের ক্রয়ক্ষমতা, আবাসনের নিরাপত্তা এবং মৌলিক সেবায় প্রবেশাধিকারের বিষয়গুলোও গুরুত্ব দিতে হবে।
সরকারি ব্যয়ে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি জরুরি
ক্যালিফোর্নিয়ার অভিজ্ঞতায় সরকারি অর্থ ব্যবস্থাপনার দুর্বলতাও উঠে এসেছে। রাজ্যটির নিরীক্ষা প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৮-১৯ থেকে ২০২২-২৩ অর্থবছর পর্যন্ত পাঁচ বছরে গৃহহীনতা ও আবাসনসংক্রান্ত কর্মসূচিতে প্রায় ২৪ বিলিয়ন ডলার বরাদ্দ দেওয়া হয়েছিল।
কিন্তু নিরীক্ষায় দেখা যায়, এসব কর্মসূচির ব্যয় ও ফলাফল নিয়মিতভাবে অনুসরণ করার ব্যবস্থা যথেষ্ট ছিল না। পর্যালোচনা করা পাঁচটি কর্মসূচির মধ্যে দুটি ব্যয়-সাশ্রয়ী বলে প্রতীয়মান হয়। বাকি তিনটির কার্যকারিতা নির্ধারণের মতো পর্যাপ্ত তথ্য পাওয়া যায়নি।
এখানে মূল প্রশ্ন অর্থ বরাদ্দের পরিমাণ নয়, বরং সেই অর্থে কতটা বাস্তব সুফল তৈরি হয়েছে।
বাংলাদেশেও বড় সামাজিক কর্মসূচির ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট লক্ষ্য, স্বচ্ছ বাজেট, ডিজিটাল ব্যয় পর্যবেক্ষণ এবং স্বাধীন মূল্যায়নের ব্যবস্থা থাকা প্রয়োজন। কত অর্থ ব্যয় হলো, কারা উপকৃত হলেন এবং দীর্ঘমেয়াদে কী পরিবর্তন ঘটল—এসব তথ্য জনসমক্ষে থাকা উচিত।
এনজিও বা বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে সরকারি সেবা দেওয়া যেতে পারে। তবে দায়িত্ব বাস্তবায়নের জন্য অন্য প্রতিষ্ঠানের ওপর নির্ভর করলেও জবাবদিহির দায় সরকারেরই থাকবে। সরকারি অর্থের ব্যবহার ও ফলাফল সম্পর্কে পরিষ্কার তথ্য নিশ্চিত করতে হবে।
মাদকাসক্তি ও মানসিক স্বাস্থ্যকে গুরুত্ব দিতে হবে
গৃহহীনতা, মাদকাসক্তি, মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যা ও দারিদ্র্যের মধ্যে পারস্পরিক সম্পর্ক রয়েছে। মাদকাসক্তি একজন মানুষের স্বাস্থ্য, আয় ও পারিবারিক সম্পর্ক ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে। আবার রাস্তায় বসবাসের অভিজ্ঞতা মানসিক চাপ বাড়িয়ে চিকিৎসা পাওয়ার পথ আরও কঠিন করে তোলে।
বাংলাদেশে এ ধরনের সমস্যাকে শুধু আইনশৃঙ্খলার বিষয় হিসেবে বিবেচনা করা যথেষ্ট নয়। মাদক পাচার প্রতিরোধ ও অপরাধীদের বিরুদ্ধে আইন প্রয়োগের পাশাপাশি মাদকাসক্ত ব্যক্তিদের চিকিৎসা, পুনর্বাসন, মানসিক স্বাস্থ্যসেবা এবং কর্মসংস্থানে ফিরে যাওয়ার সুযোগ তৈরি করতে হবে।
সমস্যার একাধিক কারণকে একসঙ্গে মোকাবিলা না করলে একটি সংকট অন্যটিকে আরও গভীর করতে পারে।
অপরাধ দমন ও পুনর্বাসনের মধ্যে ভারসাম্য
ক্যালিফোর্নিয়ায় অপরাধের শাস্তি, মাদকাসক্তির চিকিৎসা এবং জননিরাপত্তা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে বিতর্ক চলছে। ২০১৪ সালে অনুমোদিত প্রপোজিশন ৪৭ কিছু চুরি ও মাদকসংক্রান্ত অপরাধের শাস্তি কমিয়েছিল। পরবর্তী সময়ে এর প্রভাব নিয়ে বিতর্কের মধ্যে ২০২৪ সালে ভোটাররা প্রপোজিশন ৩৬ অনুমোদন করেন।
নতুন ব্যবস্থায় নির্দিষ্ট কিছু পুনরাবৃত্ত চুরি ও মাদকসংক্রান্ত অপরাধের শাস্তি বাড়ানো হয়েছে। একই সঙ্গে নির্দিষ্ট মাদকসংক্রান্ত অপরাধে অভিযুক্ত ব্যক্তিদের জন্য আদালতের তত্ত্বাবধানে চিকিৎসা কর্মসূচিতে অংশ নেওয়ার সুযোগ রাখা হয়েছে।
এই অভিজ্ঞতা দেখায়, অপরাধ নিয়ন্ত্রণে শুধু শাস্তি বাড়ানো কিংবা কমানো—কোনো একটিই সব সমস্যার সমাধান নয়। গুরুতর ও পুনরাবৃত্ত অপরাধের ক্ষেত্রে আইন প্রয়োগের পাশাপাশি মাদকাসক্তির চিকিৎসা এবং পুনর্বাসনের সুযোগও থাকতে হবে।
বাংলাদেশের জন্য ছয়টি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা
প্রথমত, নগরায়ণের শুরু থেকেই সাশ্রয়ী আবাসন নিশ্চিত করতে হবে। কর্মসংস্থানের কেন্দ্রের কাছে পরিকল্পিত আবাসন গড়ে তোলা জরুরি।
দ্বিতীয়ত, জিডিপি প্রবৃদ্ধিকে অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়নের একমাত্র মাপকাঠি ভাবা যাবে না। মানুষের ক্রয়ক্ষমতা ও জীবনযাত্রার নিরাপত্তাকে গুরুত্ব দিতে হবে।
তৃতীয়ত, সরকারি ব্যয়ের অপচয় রোধ করতে হবে। প্রতিটি বড় কর্মসূচির বাস্তব ফলাফল পরিমাপের ব্যবস্থা থাকা প্রয়োজন।
চতুর্থত, এনজিও বা বেসরকারি প্রতিষ্ঠান সেবা বাস্তবায়নে যুক্ত হলেও সরকারি অর্থের জবাবদিহি নিশ্চিত করার দায়িত্ব রাষ্ট্রের।
পঞ্চমত, মাদকাসক্তিকে জনস্বাস্থ্য ও নিরাপত্তা—দুই দৃষ্টিকোণ থেকেই মোকাবিলা করতে হবে। চিকিৎসা, পুনর্বাসন ও সামাজিক সহায়তা ছাড়া দীর্ঘমেয়াদি সমাধান কঠিন।
ষষ্ঠত, অপরাধ দমন, মানসিক স্বাস্থ্যসেবা ও পুনর্বাসনের মধ্যে সমন্বয় গড়ে তুলতে হবে। শুধু শাস্তির ওপর নির্ভর করলে সমস্যার মূল কারণগুলো থেকে যেতে পারে।
উন্নয়নের পাশাপাশি নিরাপদ জীবন নিশ্চিত করতে হবে
ক্যালিফোর্নিয়া কোনো ব্যর্থ অর্থনীতি নয়। বরং বিশ্বের অন্যতম সমৃদ্ধ অর্থনীতির মধ্যেও গৃহহীনতার ব্যাপক উপস্থিতি দেখিয়ে দেয়, অর্থনৈতিক শক্তি একাই মানুষের সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারে না।
বাংলাদেশের সামনে এখনো পরিকল্পিত নগরায়ণ, সাশ্রয়ী আবাসন, স্বচ্ছ সরকারি ব্যয় এবং কার্যকর সামাজিক সুরক্ষার মাধ্যমে ভিন্ন পথ বেছে নেওয়ার সুযোগ রয়েছে।
অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির পাশাপাশি মানুষের বাসস্থান নিশ্চিত করতে হবে। সরকারি বাজেটের সাফল্য শুধু ব্যয়ের পরিমাণে নয়, বাস্তব ফলাফলে প্রমাণিত হতে হবে। মাদকসংক্রান্ত অপরাধ দমনের পাশাপাশি চিকিৎসা ও পুনর্বাসনের ব্যবস্থা থাকতে হবে। এনজিও রাষ্ট্রকে সহায়তা করবে, তবে রাষ্ট্রের জবাবদিহির বিকল্প হবে না।
সর্বোপরি, অর্থনৈতিক সাফল্যকে শুধু জিডিপির আকার, রপ্তানি কিংবা বিনিয়োগ দিয়ে বিচার করা যায় না। দেখতে হবে, একজন সাধারণ কর্মজীবী মানুষ তাঁর আয়ে সম্মানজনক জীবনযাপন করতে পারছেন কি না, নিরাপদ বাড়িতে থাকতে পারছেন কি না এবং বিপদের সময় প্রয়োজনীয় সামাজিক সুরক্ষা পাচ্ছেন কি না।
আমেরিকার সবচেয়ে ধনী অঙ্গরাজ্যের অভিজ্ঞতা বাংলাদেশের জন্য এই সতর্কবার্তাই বহন করে—সমৃদ্ধি যেন সাধারণ মানুষের অনিরাপত্তার কারণ হয়ে না দাঁড়ায়।







