জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে খরা, তাপপ্রবাহ, বন্যা, ভূমিধস, ঘূর্ণিঝড় ও কালবৈশাখীসহ নানা প্রাকৃতিক দুর্যোগে বাংলাদেশ ব্যাপক প্রাণহানি ও ক্ষয়ক্ষতির মুখোমুখি হচ্ছে। ১৯৭০ থেকে ২০২১ সাল পর্যন্ত ৫১ বছরের পরিসংখ্যানে দুর্যোগজনিত প্রাণহানির দিক থেকে বাংলাদেশের অবস্থান উদ্বেগজনক বলে উঠে এসেছে একটি আন্তর্জাতিক প্রতিবেদনে।
‘স্ট্যাটাস অব মর্টালিটি অ্যান্ড ইকোনমিক লসেস ডিউ টু ওয়েদার, ক্লাইমেট অ্যান্ড ওয়াটার এক্সট্রিমস ১৯৭০–২০২১’ শীর্ষক প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, ওই সময়ে বাংলাদেশে ২৮১টি দুর্যোগে ৫ লাখ ২০ হাজার ৭৫৮ জনের মৃত্যু হয়েছে। অন্যদিকে, ভারতে ৫৭৩টি দুর্যোগে প্রাণ হারিয়েছেন ১ লাখ ৩৮ হাজার ৩৭৭ জন।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ১৯৭০ থেকে ২০২১ সাল পর্যন্ত বিশ্বজুড়ে ১১ হাজার ৭৭৮টি দুর্যোগে ২০ লাখ ৬৪ হাজার ৬২১ জনের মৃত্যু হয়েছে। এসব দুর্যোগে আর্থিক ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৪ দশমিক ৩ ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলার।
একই সময়ে বিশ্বে ২ হাজার ৫০টি গ্রীষ্মমণ্ডলীয় ঘূর্ণিঝড়ের তথ্য পাওয়া গেছে, যার ৩৮ শতাংশ ঘটেছে এশিয়ায়। এ ছাড়া বিশ্বে নথিভুক্ত ৫ হাজার ৩১২টি বন্যার মধ্যে ৩১ শতাংশই এশিয়া মহাদেশে সংঘটিত হয়েছে।
এপ্রিল থেকে আগস্টে দুর্যোগের ঝুঁকি বেশি
ভৌগোলিক অবস্থান ও ক্রান্তীয় জলবায়ুর কারণে বাংলাদেশকে সারা বছরই বিভিন্ন প্রাকৃতিক ও মানবসৃষ্ট দুর্যোগ মোকাবিলা করতে হয়। তবে এপ্রিল থেকে আগস্ট পর্যন্ত সময়টিতে বড় ধরনের দুর্যোগের ঝুঁকি তুলনামূলক বেশি থাকে। বিশেষ করে এপ্রিল থেকে জুন মাসে কালবৈশাখী ও ঘূর্ণিঝড়ের প্রকোপ বাড়ে।
দেশে বন্যা, ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস, নদীভাঙন, ভূমিকম্প, ভূমিধস, খরা, তাপপ্রবাহ, বজ্রপাত, টর্নেডো, লবণাক্ততা, জলাবদ্ধতা, অগ্নিকাণ্ড, দূষণ ও মহামারির মতো নানা দুর্যোগের ঘটনা ঘটে।
বাংলাদেশে সাধারণত চার ধরনের বন্যা দেখা যায়—পাহাড়ি ঢলজনিত বন্যা, বৃষ্টিজনিত বন্যা, নদীবাহিত বন্যা এবং উপকূলীয় ঝড় ও জলোচ্ছ্বাসজনিত বন্যা। বঙ্গোপসাগরে সৃষ্ট ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাস উপকূলীয় এলাকায় প্রাণহানি, ঘরবাড়ি ধ্বংস এবং সম্পদের ব্যাপক ক্ষতি করে।
নদীভাঙনের কারণে প্রতিবছর বহু মানুষ বসতভিটা ও কৃষিজমি হারান। অন্যদিকে, ভূতাত্ত্বিক অবস্থানের কারণে বাংলাদেশ ভূমিকম্পের ঝুঁকিতেও রয়েছে। বিশেষ করে চট্টগ্রাম ও সিলেটের পাহাড়ি এলাকায় ভারী বৃষ্টিপাতের সময় ভূমিধসের আশঙ্কা বাড়ে।
মৌসুমি বৃষ্টিপাতের ঘাটতি ও জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে খরা দেখা দেয়, যা কৃষি উৎপাদন ও জীবিকায় নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে তীব্র তাপপ্রবাহও জনস্বাস্থ্য ও জনজীবনের জন্য বড় উদ্বেগ হয়ে উঠেছে। পাশাপাশি বজ্রপাত, ঝড় ও টর্নেডোতে প্রাণহানি ও সম্পদের ক্ষতি হয়।
উপকূলীয় অঞ্চলে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি এবং লবণাক্ত পানির অনুপ্রবেশ কৃষি, পানীয় জল ও জীবিকার ওপর চাপ সৃষ্টি করছে। ঘনবসতিপূর্ণ শহর ও শিল্পাঞ্চলে অগ্নিকাণ্ড এবং পরিবেশদূষণজনিত স্বাস্থ্যঝুঁকিও উদ্বেগ বাড়াচ্ছে।
আজ আন্তর্জাতিক দুর্যোগ প্রশমন দিবস
‘ঘর থেকেই শুরু করি, দুর্যোগ সহনশীল দেশ গড়ি’ প্রতিপাদ্য সামনে রেখে আজ মঙ্গলবার পালিত হচ্ছে আন্তর্জাতিক দুর্যোগ প্রশমন দিবস। জাতিসংঘের দুর্যোগ ঝুঁকি হ্রাসবিষয়ক দপ্তর (ইউএনডিআরআর) নির্ধারিত এবারের প্রতিপাদ্য হলো ‘রেজিলিয়েন্স স্টার্টস অ্যাট হোম’।
প্রতিপাদ্যের মূল লক্ষ্য হলো দুর্যোগ মোকাবিলায় পরিবার ও বাড়ি থেকেই সচেতনতা, প্রস্তুতি এবং সহনশীলতা গড়ে তোলা। বিশেষজ্ঞদের মতে, দুর্যোগের ক্ষয়ক্ষতি কমাতে শুধু সরকারি উদ্যোগের ওপর নির্ভর করলে চলবে না; ব্যক্তি, পরিবার ও সমাজের সম্মিলিত প্রস্তুতি এবং সক্রিয় অংশগ্রহণও জরুরি।
দিবসটি উপলক্ষে রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভাগ, জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে বিভিন্ন কর্মসূচি গ্রহণ করা হয়েছে।
দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের আয়োজনে দিবসের মূল অনুষ্ঠান আজ সকাল সাড়ে ৯টায় রাজধানীর বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রে শুরু হওয়ার কথা রয়েছে। অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে রাষ্ট্রপতি মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের উপস্থিত থাকার কথা রয়েছে।







