রাজনৈতিক দলগুলোর স্বাক্ষরিত ‘জুলাই জাতীয় সনদের’ এক বছর পূর্ণ হলেও রাষ্ট্র সংস্কারের প্রতিশ্রুতি বাস্তবের আলো দেখেনি; বরং অন্তর্বর্তী সরকারের আমলের অর্জিত বেশ কিছু সংস্কার অধ্যাদেশ ও পদক্ষেপ বাতিল করেছে বর্তমান বিএনপি সরকার। স্বৈরাচারী শাসনের পুনরাবৃত্তি ঠেকাতে বিচারবিভাগ ও পুলিশের স্বাধীনতায় আনা সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয়, বিচারক নিয়োগ কাউন্সিল এবং পুলিশ কমিশন গঠনের মতো গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপে বিরোধীদের কোনো আপত্তি (নোট অব ডিসেন্ট) না থাকা সত্ত্বেও তা বাতিল বা বিলুপ্ত করা হয়েছে।
প্রধানমন্ত্রীর একচ্ছত্র ও অপরিসীম ক্ষমতায় রাশ টেনে নির্বাহী, বিচার ও আইন বিভাগের মধ্যে ভারসাম্য আনার যে অঙ্গীকার জুলাই সনদে ছিল, বর্তমান রাজনৈতিক বন্দোবস্তে তা পুরোপুরি অনুপস্থিত। ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি) এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, জুলাই অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে অর্জিত জবাবদিহিমূলক রাষ্ট্রব্যবস্থা গড়ে তোলার ঐতিহাসিক সুযোগটি আজ ক্ষমতার রাজনীতি ও আমলাতান্ত্রিক প্রভাবের কারণে চূড়ান্তভাবে বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।
উল্লেখ্য, ২০২৫ সালের ১৭ অক্টোবর ৩০টি রাজনৈতিক দলের সইয়ের মাধ্যমে এই ঐতিহাসিক জুলাই সনদ অনুমোদিত হয়েছিল। এরপর ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত জাতীয় গণভোটে দেশের জনগণ শতভাগ রায়ে সনদের ৪৮টি প্রস্তাবের মধ্যে ৩৮টি সংবিধান সংস্কার প্রস্তাব সরাসরি অনুমোদন দেয়। তবে বিএনপি ক্ষমতায় আসার পর সেই গণভোটের রায়কে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে সংসদে সনদ বাস্তবায়ন ও আদেশের ওপর কোনো কার্যকর আইন পাস করেনি; বরং একতরফাভাবে নিজেদের পছন্দমতো সংবিধান সংশোধন বিশেষ কমিটি গঠন করেছে।
জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের সাবেক সহসভাপতি অধ্যাপক আলী রীয়াজ এ বিষয়ে কঠোর প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করে বলেন, রাজনৈতিক দলগুলোর ঐকমত্য ও জনগণের গণভোটের মাধ্যমে স্বতঃস্ফূর্ত চুক্তিতে সনদ গৃহীত হয়েছিল। সংলাপে একমত হয়েও ক্ষমতায় এসে তা বাতিল করা জনগণের অর্জিত আকাক্সক্ষা ও অভ্যুত্থানের বীর শহীদদের সঙ্গে চূড়ান্ত প্রতারণা ও পিছু হটার শামিল।
একই সুরে কড়া প্রতিবাদ জানিয়েছেন জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল হামিদুর রহমান আযাদ। তিনি বলেন, “বিএনপির এই ভূমিকা সহজ কথায় চরম রাজনৈতিক বিশ্বাসঘাতকতা। গণভোটে সনদ অনুমোদনের পর কোনো বাধা থাকার কথা ছিল না, কিন্তু ক্ষমতাকে একক ও দীর্ঘস্থায়ী করতেই জবাবদিহিহীন সরকার এবং শক্তিশালী প্রধানমন্ত্রীর পুরোনো স্বৈরাচারী কাঠামো বজায় রাখছে বিএনপি।”
অন্য দিকে এনসিপির সংসদ সদস্য হাসনাত আবদুল্লাহ স্পষ্ট জানান, গণভোটে দেশের জনগণ বিএনপির ‘নোট অব ডিসেন্ট’ বা আপত্তিকে সরাসরি নাকচ করে জুলাই সনদের পূর্ণ বাস্তবায়নে রায় দিয়েছিল। গণরায়ের তোয়াক্কা না করে বিশেষ কমিটির নামে নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকার, উচ্চকক্ষ গঠন এবং রাষ্ট্রপতির একক ক্ষমতা খর্ব করার যে চক্রান্ত চলছে, তা এ দেশের প্রগতিশীল তরুণ সমাজ কোনোভাবেই মেনে নেবে না।







