অবৈধ সম্পদ অর্জন ও অর্থ পাচারের অভিযোগে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) করা দুটি মামলার আসামি বিমান বাহিনীর সাবেক প্রধান এয়ার চিফ মার্শাল শেখ আব্দুল হান্নান কাতারে গ্রেপ্তার হয়েছেন। গত ১৫ অক্টোবর কাতার পুলিশ তাঁকে গ্রেপ্তার করে। ইন্টারপোলের ই-মেইলের মাধ্যমে বিষয়টি দুদককে জানানো হয়েছে।
রোববার (১৮ অক্টোবর) দুদকের উপপরিচালক মো. আকতারুল ইসলাম এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন।
শেখ আব্দুল হান্নান ও তাঁর স্ত্রী তাহমিদা বেগমের বিরুদ্ধে ২০২৫ সালের ২৭ জুলাই অবৈধ সম্পদ অর্জন ও অর্থ পাচারের অভিযোগে পৃথক দুটি মামলা করে দুদক। সংস্থাটির সমন্বিত জেলা কার্যালয়, ঢাকা-১-এ দুদকের উপপরিচালক মো. তানজির হাসিব সরকার বাদী হয়ে মামলা দুটি দায়ের করেন।
দুদকের তৎকালীন মহাপরিচালক মো. আক্তার হোসেন সে সময় জানিয়েছিলেন, অনুসন্ধানে শেখ আব্দুল হান্নানের জ্ঞাত আয়ের সঙ্গে অসংগতিপূর্ণ ৩ কোটি ২৮ লাখ ৫১ হাজার ৫০৬ টাকার সম্পদ অর্জনের তথ্য পাওয়া গেছে। এ ছাড়া তাঁর নামে থাকা ছয়টি ব্যাংক হিসাবে ২৭ কোটি ৬৩ লাখ ৬৬ হাজার ৭০০ টাকার সন্দেহজনক লেনদেনের অভিযোগ রয়েছে।
দুদকের অভিযোগ, ক্ষমতার অপব্যবহার ও অপরাধমূলক অসদাচরণের মাধ্যমে এসব সম্পদ অর্জন করেন সাবেক এই বিমান বাহিনী প্রধান। ব্যাংক হিসাবে সন্দেহজনক লেনদেনের মাধ্যমে অর্থের উৎস গোপন করার অভিযোগও আনা হয়েছে তাঁর বিরুদ্ধে। এসব অভিযোগে দুর্নীতি দমন কমিশন আইন, দুর্নীতি প্রতিরোধ আইন ও মানিলন্ডারিং প্রতিরোধ আইনে মামলা করা হয়।
অন্য মামলায় শেখ আব্দুল হান্নানের স্ত্রী তাহমিদা বেগমের বিরুদ্ধে ১ কোটি ৯১ লাখ ৯০ হাজার ৩০৪ টাকার জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জনের অভিযোগ আনা হয়। পাশাপাশি তাঁর নামে থাকা ৩২টি ব্যাংক হিসাবে ১ কোটি ১৮ লাখ ১৯ হাজার ৯২৩ টাকার সন্দেহজনক লেনদেনের তথ্য পাওয়ার কথা জানায় দুদক।
মামলার অভিযোগে বলা হয়, স্বামীর সহযোগিতায় তাহমিদা এসব সম্পদ অর্জন করেছেন। এ মামলায় তাহমিদার পাশাপাশি শেখ আব্দুল হান্নানকেও আসামি করা হয়েছে।
দুদকের অনুসন্ধানে কাতার, দুবাইসহ বিভিন্ন দেশে শেখ আব্দুল হান্নানের ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ও সম্পদের তথ্য পাওয়ার কথাও জানানো হয়েছিল। এ ছাড়া কানাডায় তাঁর সন্তানদের নামে বিপুল সম্পদের তথ্য পাওয়ার দাবি করে সংস্থাটি। এসব সম্পদের প্রকৃত অবস্থা তদন্তের মাধ্যমে যাচাই করার কথা জানানো হয়।
দুর্নীতির অভিযোগ অনুসন্ধানের মধ্যে ২০২৫ সালের ৫ মে শেখ আব্দুল হান্নান, তাঁর স্ত্রী তাহমিদা বেগম ও ছেলে শেখ লাবিব হান্নানের বিদেশযাত্রায় নিষেধাজ্ঞা দেন আদালত। পরদিন দুদকের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে তাঁর জমি, বাড়ি ও তিনটি ফ্ল্যাট জব্দের আদেশ দেওয়া হয়। একই সঙ্গে তাঁর ছয়টি ব্যাংক হিসাব অবরুদ্ধ করার নির্দেশ দেওয়া হয়।
ওই বছরের ২৪ মে শেখ আব্দুল হান্নান, তাঁর স্ত্রী ও ছেলের নামে থাকা মোট ৩৮টি ব্যাংক হিসাব অবরুদ্ধের আদেশ দেন আদালত।
পরে ২০২৫ সালের ১১ নভেম্বর হান্নানের সহযোগী সানজিদা আক্তারের নামে থাকা দুটি ফ্ল্যাট জব্দ এবং ১০টি ব্যাংক হিসাব অবরুদ্ধের নির্দেশ দেওয়া হয়। দুদকের আবেদনে অভিযোগ করা হয়, অবৈধভাবে অর্জিত সম্পদের মালিকানা আড়াল করতে সানজিদার নামে ফ্ল্যাট দুটি কেনা হয়েছিল।
চলতি বছরের ৩০ মার্চ শেখ আব্দুল হান্নান ও তাঁর স্ত্রী তাহমিদা বেগমের আয়কর নথি জব্দের আদেশ দেন আদালত। মামলার তদন্তের প্রয়োজনে দুদকের পৃথক আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে এ আদেশ দেওয়া হয়।
সর্বশেষ গত ২০ সেপ্টেম্বর বাগেরহাটের কচুয়া উপজেলায় শেখ আব্দুল হান্নানের নামে থাকা ৩৪ শতাংশ জমি ক্রোকের আদেশ দেন আদালত। দুদকের আবেদনে জমিটির দলিলমূল্য ১৭ লাখ ৬৪ হাজার টাকা উল্লেখ করা হয়।
শেখ হাসিনা সরকারের আমলে ২০২১ সালের ১২ জুন বিমান বাহিনীর প্রধান হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন শেখ আব্দুল হান্নান। ২০২৪ সালের ১১ জুন তিনি অবসরে যান।
তাঁর বিরুদ্ধে আনা অভিযোগগুলোর বিষয়ে আদালতে চূড়ান্তভাবে প্রমাণিত হওয়ার তথ্য প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়নি।







