রাজধানীর শেরেবাংলা নগরে বাংলাদেশ সচিবালয় স্থানান্তরের প্রস্তাবে নীতিগত অনুমোদন দিয়েছে মন্ত্রিসভা। পুরোনো বাণিজ্য মেলার মাঠে নতুন সচিবালয় নির্মাণের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। একই বৈঠকে মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের নাম পরিবর্তন করে ‘নারী ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয়’ করার প্রস্তাব এবং ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ স্থাপনসংক্রান্ত একটি অধ্যাদেশের খসড়াও অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি বিপজ্জনক রাসায়নিক ও কীটনাশকের আন্তর্জাতিক বাণিজ্য নিয়ন্ত্রণে রটারডাম কনভেনশনে বাংলাদেশের অন্তর্ভুক্তির প্রস্তাব অনুমোদিত হয়েছে।
রোববার (১৮ অক্টোবর) সচিবালয়ে প্রধানমন্ত্রীর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত মন্ত্রিসভার ২৫তম বৈঠকে এসব সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
৩১ একর জমিতে নির্মিত হবে নতুন সচিবালয়
বর্তমান সচিবালয়ে জায়গার সংকট, পুরোনো ভবনের ভূমিকম্পঝুঁকি এবং পর্যাপ্ত কর্মপরিবেশের অভাব বিবেচনায় শেরেবাংলা নগরে নতুন সচিবালয় নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের প্রস্তাবের ভিত্তিতে মন্ত্রিসভা এ বিষয়ে নীতিগত সম্মতি দিয়েছে।
পরিকল্পনা অনুযায়ী, লুই আই কানের মাস্টারপ্ল্যান অনুসরণ করে শেরেবাংলা নগরের প্রায় ৩১ দশমিক ৫৮ একর জমিতে নতুন সচিবালয় গড়ে তোলা হবে। প্রস্তাবিত নকশায় তিনটি বেজমেন্টসহ ১৪টি ১২ তলা ভবন নির্মাণের কথা রয়েছে। এসব ভবনে মোট প্রায় ৩৩ লাখ ১৬ হাজার বর্গফুট অফিস স্পেস থাকবে।
নতুন সচিবালয় কমপ্লেক্সে গাড়ি পার্কিংয়ের জন্য ৩ হাজার ৮০০টি স্থান রাখার পরিকল্পনা রয়েছে। এর মধ্যে ২০০টি হবে ভূ-উপরিস্থ পার্কিং। এ ছাড়া একটি মসজিদ, ৩৫০ জন ধারণক্ষমতার দুটি মাল্টিপারপাস হল, ক্যাফেটেরিয়া ও ডাকঘর নির্মাণের প্রস্তাব করা হয়েছে। প্রকল্প এলাকার প্রায় ৩০ শতাংশ জায়গা সবুজায়ন ও জলাধারের জন্য সংরক্ষিত রাখার পরিকল্পনাও রয়েছে।
পুরোনো ভবনে ভূমিকম্পের ঝুঁকি
বর্তমানে বাংলাদেশ সচিবালয় প্রায় ১৭ দশমিক ৫৭ একর জমির ওপর অবস্থিত। সেখানে ১৩টি ভবন রয়েছে, যার আটটি স্বাধীনতার আগে নির্মিত। পুরোনো ১, ২, ৩ ও ৮ নম্বর ভবন ১৯৩৭ থেকে ১৯৩৯ সালের মধ্যে নির্মাণ করা হয়। অন্যদিকে ৫ নম্বর ভবনটি নির্মিত হয়েছিল ১৯৪৭ সালে।
প্রস্তাবে বলা হয়েছে, এসব পুরোনো ভবন ভূমিকম্প সহনশীল করে নির্মাণ করা হয়নি। ভূমিকম্পপ্রবণ ঢাকা শহরে গুরুত্বপূর্ণ সরকারি কার্যক্রম পরিচালনার ক্ষেত্রে ভবনগুলো ঝুঁকির কারণ হতে পারে।
এ ছাড়া বিদ্যমান ভবনগুলোতে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য পর্যাপ্ত অফিসকক্ষ ও ওয়াশ-ব্লক না থাকায় স্বাভাবিক এবং স্বাস্থ্যকর কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করা কঠিন হয়ে পড়েছে।
বর্তমানে সচিবালয়ে প্রায় ১৮ লাখ ৭৬ হাজার বর্গফুট অফিস স্পেস রয়েছে। বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের বাড়তি চাহিদা এবং সচিবালয় কমপ্লেক্সের বাইরে থাকা মন্ত্রণালয় ও বিভাগগুলোকে একই জায়গায় আনতে আরও ১০ লাখ বর্গফুটের বেশি অফিস স্পেস প্রয়োজন বলে প্রস্তাবে উল্লেখ করা হয়েছে।
এসব সমস্যা সমাধানের লক্ষ্যেই নতুন সচিবালয় নির্মাণের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।
মন্ত্রণালয়ের নাম হচ্ছে ‘নারী ও শিশু বিষয়ক’
মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের নাম পরিবর্তন করে ‘নারী ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয়’ করার প্রস্তাব অনুমোদন করেছে মন্ত্রিসভা।
সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে উত্থাপিত প্রস্তাবটি অনুমোদিত হওয়ায় নাম পরিবর্তনের পরবর্তী প্রক্রিয়া এগিয়ে নেওয়ার সুযোগ তৈরি হয়েছে।
ছাদে সৌরবিদ্যুৎ স্থাপনে বিশেষ অধ্যাদেশ
আমদানি করা জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর নির্ভরতা কমানো, বিদ্যুৎ খাতে ভর্তুকির চাপ হ্রাস এবং জ্বালানি নিরাপত্তা জোরদারের লক্ষ্যে ‘বিশেষ সৌরবিদ্যুৎ স্থাপন অধ্যাদেশ, ২০২৬’-এর খসড়া নীতিগত ও চূড়ান্ত অনুমোদন দিয়েছে মন্ত্রিসভা। তবে লেজিসলেটিভ ও সংসদ বিষয়ক বিভাগের ভেটিং শেষে অধ্যাদেশটি কার্যকর করার প্রক্রিয়া সম্পন্ন হবে।
সরকারের ‘জাতীয় নবায়নযোগ্য জ্বালানি উন্নয়ন কৌশলপত্র ২০২৬-২০৩০’-এর আওতায় আগামী গ্রীষ্মের আগে ৩ হাজার থেকে ৪ হাজার মেগাওয়াট ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ স্থাপনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। এ লক্ষ্য অর্জনে সরকার ইতোমধ্যে প্রণোদনা ঘোষণা করেছে।
পরিকল্পনা অনুযায়ী, সরকারি, আধাসরকারি, স্বায়ত্তশাসিত, স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠান এবং সরকারি কোম্পানির ভবনের ছাদে বিনিয়োগকারীর অর্থায়নে অপারেশনাল এক্সপেনডিচার (ওপেক্স) মডেলে সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থা স্থাপন করা যাবে। যেসব প্রতিষ্ঠানের নিজস্ব আয় রয়েছে, তারা ভবিষ্যৎ আয় বিবেচনায় ক্যাপিটাল এক্সপেনডিচার (ক্যাপেক্স) মডেলেও এ ব্যবস্থা চালু করতে পারবে।
প্রস্তাবে বলা হয়েছে, ওপেক্স মডেলে সেবা প্রদানকারীর মাধ্যমে সৌরবিদ্যুৎ স্থাপনের ক্ষেত্রে দীর্ঘমেয়াদি, এমনকি ১৫ বছর পর্যন্ত বিদ্যুৎ ব্যবহারের মূল্য নির্ধারণ, ছাদ ব্যবহারের বিনিময়ে বিদ্যুতের অংশ প্রদান এবং রক্ষণাবেক্ষণ বিষয়ে সুনির্দিষ্ট বিধিবিধানের ঘাটতি রয়েছে।
অন্যদিকে, ক্যাপেক্স মডেলে সৌরবিদ্যুৎ স্থাপন ও সেবা গ্রহণের ক্ষেত্রেও সরকারি ক্রয় আইন, ২০০৬, ইনভেস্ট বাংলাদেশ আইন, ২০২৬ এবং বিদ্যুৎ আইন, ২০১৮-তে প্রয়োজনীয় সুনির্দিষ্ট বিধানের অভাব রয়েছে।
এসব সীমাবদ্ধতা দূর করে সৌরবিদ্যুৎ স্থাপন ও সেবা গ্রহণের প্রক্রিয়াকে সুশৃঙ্খল করতে বিশেষ অধ্যাদেশের খসড়া তৈরি করা হয়েছে।
রটারডাম কনভেনশনে যুক্ত হচ্ছে বাংলাদেশ
বিপজ্জনক রাসায়নিক ও কীটনাশকের আন্তর্জাতিক বাণিজ্য নিয়ন্ত্রণ এবং এগুলোর নিরাপদ ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করতে রটারডাম কনভেনশনে বাংলাদেশের অন্তর্ভুক্তির প্রস্তাব অনুমোদন করেছে মন্ত্রিসভা।
পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে উত্থাপিত এ প্রস্তাবের মাধ্যমে বিপজ্জনক, নিয়ন্ত্রিত ও নিষিদ্ধ রাসায়নিকের আমদানি-রপ্তানি এবং ব্যবস্থাপনায় আন্তর্জাতিক সহযোগিতা বাড়ানোর সুযোগ তৈরি হবে।
১৯৯৮ সালের ১০ সেপ্টেম্বর গৃহীত রটারডাম কনভেনশন ২০০৪ সালের ২৪ ফেব্রুয়ারি কার্যকর হয়। ইতোমধ্যে ১৬৭টি দেশ এতে সদস্য হয়েছে। বাংলাদেশ ও ভুটান ছাড়া দক্ষিণ এশীয় আঞ্চলিক সহযোগিতা সংস্থার (সার্ক) অন্য সদস্যদেশগুলো এ কনভেনশনে যোগ দিয়েছে বা এটি অনুমোদন করেছে।
কনভেনশনে অন্তর্ভুক্ত হলে বিপজ্জনক রাসায়নিক ব্যবস্থাপনায় বাংলাদেশের সক্ষমতা বাড়বে। পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট প্রকল্পে বৈদেশিক অর্থায়ন পাওয়ার সুযোগ, রাসায়নিকের ডেটাবেজ তৈরি এবং এসব রাসায়নিকের আমদানি-রপ্তানি ও গতিবিধি পর্যবেক্ষণের ব্যবস্থা জোরদার করা সম্ভব হবে।
এ ছাড়া কনভেনশনের সংযুক্তি-৩-এ তালিকাভুক্ত রাসায়নিকের বিষয়ে পূর্ব সিদ্ধান্ত গ্রহণ এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে আমদানি ও রপ্তানিকারক দেশগুলোর মধ্যে যৌথ দায়িত্ব পালনের সুযোগ তৈরি হবে।
কনভেনশনের ১৪ নম্বর অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, বাংলাদেশ বিপজ্জনক রাসায়নিক ও কীটনাশকসংক্রান্ত বৈজ্ঞানিক, প্রযুক্তিগত, অর্থনৈতিক ও আইনি তথ্য সদস্যদেশগুলোর সঙ্গে বিনিময় করতে পারবে। একই সঙ্গে সদস্যদেশ ও কনভেনশন সচিবালয়ের সঙ্গে যোগাযোগ বাড়ানোর সুযোগ তৈরি হবে।
এ ছাড়া কনভেনশনের ১৬ নম্বর অনুচ্ছেদের আওতায় রাসায়নিক ব্যবস্থাপনায় কারিগরি সহযোগিতা গ্রহণের পথও সুগম হবে।







