ক্ষমতায় আসার মাত্র আট মাসের মাথায় দলীয় শৃঙ্খলা ও স্বচ্ছতার প্রশ্নে চরম কঠোর বার্তা দিচ্ছে তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন নতুন বিএনপি সরকার। এই স্বল্প সময়ের ব্যবধানে মন্ত্রিসভার তিন প্রভাবশালী মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রীকে পদ ছাড়তে হয়েছে, এবং পদত্যাগ করেছেন দলটির সংরক্ষিত নারী আসনের এক সংসদ সদস্যও। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, সরকারের ভাবমূর্তি রক্ষা ও দলের অভ্যন্তরীণ জিরো-টলারেন্স নীতি বাস্তবায়নে খোদ প্রধানমন্ত্রীর সুনির্দিষ্ট নির্দেশেই এই একের পর এক পদত্যাগের ঘটনা ঘটেছে।
সবশেষ গেন্ডারিয়ায় বৈধ অস্ত্র হাতে বিতর্কিত মাদকবিরোধী অভিযান চালিয়ে দেশজুড়ে সমালোচনার মুখে পড়েন ঢাকা-৬ আসনের সংসদ সদস্য ও মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী ইশরাক হোসেন। অস্ত্র উঁচিয়ে অভিযানের দৃশ্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে সরকার ও দলের ভেতর তীব্র অস্বস্তি তৈরি হয়। পরিস্থিতি সামাল দিতে রোববার প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান সরাসরি ইশরাককে পদত্যাগের নির্দেশ দেন, যার ধারাবাহিকতায় সোমবার (১৯ অক্টোবর) জাতীয় প্রেস ক্লাবে সংবাদ সম্মেলন করে ইশরাক আনুষ্ঠানিকভাবে পদত্যাগের ঘোষণা দেন।
ইশরাকের বিদায় প্রসঙ্গে সরকারের কঠোর অবস্থানের কথা পুনর্ব্যক্ত করে আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান জানান, প্রধানমন্ত্রী একটি সুনির্দিষ্ট নীতিগত বার্তা দিয়েছেন—জনগণের প্রত্যাশার বাইরে গিয়ে কোনো ব্যক্তি যতই ঘনিষ্ঠ হন না কেন, অপরাধ বা অসদাচরণের ক্ষেত্রে ছাড় দেওয়ার কোনো সুযোগ নেই। ‘আমরা কেউই আইনের ঊর্ধ্বে নই’ উল্লেখ করে আইনমন্ত্রী বলেন, প্রধানমন্ত্রী তাঁর কঠোর পদক্ষেপে তা ইতোমধ্যে প্রমাণ করে দেখিয়েছেন।
ইশরাক হোসেনের পদত্যাগের আগে গত ২২ আগস্ট তথ্য ও সম্প্রচারমন্ত্রীর পদ থেকে সরে দাঁড়াতে হয় প্রবীণ নেতা জহির উদ্দিন স্বপনকে। ওই দিনই তরুণ নেতা আন্দালিব রহমান পার্থকে তথ্যমন্ত্রীর নতুন দায়িত্ব দেওয়া হয় এবং স্বপনকে মন্ত্রীর পদমর্যাদায় প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টা হিসেবে নিয়োগ দিয়ে মূল মন্ত্রিত্ব থেকে সরিয়ে আনা হয়, যা রাজনৈতিক অঙ্গনে পদাবনতি হিসেবেই চর্চিত হচ্ছে।
এরও আগে, সরকার গঠনের মাত্র সাড়ে তিন মাসের মাথায় ১ জুন পার্বত্য চট্টগ্রামবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রীর পদ থেকে হঠাৎ পদত্যাগ করেন দীপেন দেওয়ান। যদিও পদত্যাগপত্রে তিনি শারীরিক অসুস্থতার কারণ দর্শিয়েছিলেন, তবে পার্বত্য জেলা পরিষদ পুনর্গঠন, রাঙামাটি বিএনপির অভ্যন্তরীণ কোন্দল এবং রাঙামাটিতে সমর্থকদের বিক্ষোভের পেছনে উচ্চপর্যায়ের চাপের বিষয়টিই ব্যাপকভাবে আলোচিত হয়েছিল।
মন্ত্রিসভার বাইরে দলীয় শৃঙ্খলাভঙ্গের কারণে গত ১ অক্টোবর স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদের কাছে পদত্যাগপত্র জমা দিতে বাধ্য হন বিএনপির সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ সদস্য ফেরদৌসী আহমেদ মিষ্টি। মিরপুরের রাড্ডা স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রে হামলা, লুটপাট ও ভাঙচুরের ঘটনায় তাঁর নাম সামনে এলে প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে তাঁর পদত্যাগ নিশ্চিত করা হয় এবং আসনটি শূন্য ঘোষণা করা হয়। মাত্র আট মাসে একাধিক প্রভাবশালী জনপ্রতিনিধির এই ধারাবাহিক বিদায়কে চব্বিশের গণঅভ্যুত্থান-পরবর্তী বিএনপি সরকারের জবাবদিহিতা ও কঠোর সুশাসনের বড় লক্ষণ হিসেবেই দেখছেন দেশের বিশিষ্টজনেরা।







