ক্ষমতা গ্রহণের মাত্র আট মাসের ব্যবধানে সরকার সামলাতে চরম হিমশিম খাচ্ছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)। একের পর এক বিতর্ক, অভ্যন্তরীণ কোন্দল এবং দায়িত্বহীন আচরণের জেরে মাত্র আট মাসের মধ্যে মন্ত্রিসভার তিন প্রভাবশালী মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রীসহ দলটির এক সংরক্ষিত নারী সংসদ সদস্য পদত্যাগে বাধ্য হয়েছেন। সরকার গঠনের এত অল্প সময়ের মধ্যে শীর্ষ জনপ্রতিনিধিদের এমন ধারাবাহিক বিদায়কে ক্ষমতার চরম অপব্যবহার, অনভিজ্ঞতা এবং সরকারের ভঙ্গুর অবস্থার স্পষ্ট প্রতিফলন হিসেবে দেখছেন রাজনীতি বিশ্লেষক ও সাধারণ জনগণ।
সবশেষ গেন্ডারিয়ায় বৈধ অস্ত্র উঁচিয়ে জনমনে আতঙ্ক সৃষ্টি ও বেপরোয়া মাদকবিরোধী অভিযান চালিয়ে দেশজুড়ে তুমুল বিতর্কের জন্ম দেন মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী ইশরাক হোসেন। ক্ষমতার দাপট দেখিয়ে প্রকাশ্য দিবালোকে অস্ত্র প্রদর্শনের ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে চরম সমালোচনার মুখে পড়েন তিনি। শেষ পর্যন্ত পরিস্থিতি সামাল দিতে সংবাদ সম্মেলন করে তাকে পদত্যাগের ঘোষণা দিতে হয়। রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, একজন প্রতিমন্ত্রীর এমন দায়িত্বজ্ঞানহীন আচরণ প্রমাণ করে যে, ক্ষমতাসীন দলটির নেতাদের ওপর সরকারের কোনো প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ নেই।
ইশরাকের এই কেলেঙ্কারির আগেই অবশ্য সরকারের একের পর এক উইকেট পড়তে শুরু করে। গত ২২ আগস্ট তথ্য ও সম্প্রচারমন্ত্রীর পদ থেকে পদত্যাগ করতে বাধ্য হন জহির উদ্দিন স্বপন। সেখানে কোনো অভিজ্ঞ নেতাকে না বসিয়ে হঠাৎ আন্দালিব রহমান পার্থকে মন্ত্রিত্ব দেওয়া এবং স্বপনকে নামকাওয়াস্তে রাজনৈতিক উপদেষ্টা করে সরিয়ে দেওয়ার ঘটনাকে সরকারের নীতিগত অস্থিতিশীলতা হিসেবেই দেখছেন বিশ্লেষকরা।
এরও আগে, দায়িত্ব নেওয়ার মাত্র সাড়ে তিন মাসের মাথায় গত ১ জুন পার্বত্য চট্টগ্রামবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রীর পদ ছাড়েন দীপেন দেওয়ান। যদিও শারীরিক অসুস্থতার দোহাই দেওয়া হয়েছিল, তবে রাঙামাটি বিএনপির অভ্যন্তরীণ কোন্দল ও সুপারিশ-বাণিজ্যের জটিলতাই যে তাকে পদত্যাগে বাধ্য করেছিল, তা স্পষ্ট হয়ে যায় তার সমর্থকদের রাজপথে নেমে আসার ঘটনায়। ক্ষমতার শুরুতেই দলের অভ্যন্তরীণ অন্তর্দ্বন্দ্ব সামলাতে ব্যর্থ হয়ে মন্ত্রীকে বলির পাঁঠা বানানোর এ ঘটনাটি জনগণের কাছে নীতিগত দুর্বলতা হিসেবেই প্রতিভাত হয়।
মন্ত্রিসভার বাইরে দলীয় ক্যাডারতন্ত্র ও দখলদারিত্বের অভিযোগ উঠে বিএনপি এমপি ফেরদৌসী আহমেদ মিষ্টির বিরুদ্ধে। মিরপুরের রাড্ডা স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রে হামলা ও ভাঙচুরের ঘটনায় নাম আসার পর গত ১ অক্টোবর তাকেও সংসদ সদস্যপদ থেকে পদত্যাগ করতে হয়। জনকল্যাণের প্রতিশ্রুতি দিয়ে ক্ষমতায় আসা দলের সংসদ সদস্যের এমন অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে যুক্ত হওয়া সাধারণ মানুষের আস্থা ও বিশ্বাসের ওপর বড় ধাক্কা দিয়েছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, সরকার গঠনের এত অল্প সময়ে একে একে চারজন হেভিওয়েট জনপ্রতিনিধির বিদায় সুশাসনের লক্ষণ নয়; বরং তা সরকারের সুনির্দিষ্ট নীতি ও দূরদর্শিতার অভাবকেই সামনে নিয়ে এসেছে। মন্ত্রী নির্বাচনে সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে না পারা এবং সরকারে প্রশাসনিক শৃঙ্খলার অভাবের কারণেই আজ এই করুণ পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। কেবল পদত্যাগ করিয়ে দায় এড়ানোর চেষ্টা না করে বিএনপি সরকারের মৌলিক মানসিকতা পরিবর্তন করা না হলে, সরকারের প্রতি জনমনে ক্ষোভ ও নেতিবাচক মনোভাব আরও ঘনীভূত হবে বলেই মনে করছেন দেশের বুদ্ধিজীবী মহল।







