বিএনপি সরকার ক্ষমতায় আসার কয়েক মাসের মধ্যেই দলের দুই নেতার পদত্যাগকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক অঙ্গনে নানা আলোচনা শুরু হয়েছে। প্রথমে রাড্ডা স্বাস্থ্যকেন্দ্র ভাঙার ঘটনায় সমালোচনার মুখে সংসদ সদস্যের পদ ছাড়েন ফেরদৌসী আহমেদ মিষ্টি। এরপর অস্ত্র হাতে মাদকবিরোধী অভিযানে নেমে বিতর্কের মুখে প্রতিমন্ত্রীর পদ থেকে সরে দাঁড়ান ইশরাক হোসেন। দুটি ঘটনাতেই প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নির্দেশের বিষয়টি আলোচনায় এসেছে। যদিও ইশরাক দাবি করেছেন, তিনি নিজেই পদত্যাগের আগ্রহ প্রকাশ করেছিলেন।
পরপর দুই নেতার পদত্যাগের পর প্রশ্ন উঠেছে, দলীয় নেতাকর্মীদের নিয়ন্ত্রণে আনতেই কি কঠোর অবস্থান নিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী? নাকি বিতর্ক এড়িয়ে সরকার ও দলের ভাবমূর্তি রক্ষার চেষ্টা করছেন তিনি? একই সঙ্গে বিতর্কিত কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার ক্ষেত্রে বিএনপির সব নেতার জন্য একই নীতি অনুসরণ করা হচ্ছে কি না, তা নিয়েও আলোচনা চলছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, সাম্প্রতিক ঘটনাগুলো সরকারকে দলীয় নেতাকর্মীদের আচরণ নিয়ন্ত্রণ, জনআকাঙ্ক্ষা পূরণ এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে ওঠা প্রশ্নের জবাব দেওয়ার চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলেছে।
পরপর দুই পদত্যাগ, আলোচনায় প্রধানমন্ত্রীর ভূমিকা
গত ১ অক্টোবর ঢাকার মিরপুরে রাড্ডা মাতৃ ও শিশু স্বাস্থ্যকেন্দ্র এবং পরিবার পরিকল্পনা কর্মসূচির কার্যালয় গুঁড়িয়ে দেওয়ার ঘটনায় তীব্র সমালোচনার মুখে পড়েন সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ সদস্য ফেরদৌসী আহমেদ মিষ্টি। অভিযোগ ওঠে, ওই ঘটনায় স্থানীয় বিএনপির নেতাকর্মীরা জড়িত ছিলেন। দেশজুড়ে সমালোচনার পর প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নির্দেশে সংসদ সদস্যের পদ ছাড়েন মিষ্টি।
এর রেশ কাটতে না কাটতেই নতুন বিতর্কে জড়ান প্রতিমন্ত্রী ইশরাক হোসেন। গত শনিবার অবৈধ মাদক ব্যবসায়ীদের অস্ত্র হাতে ধাওয়া করার একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশ করেন তিনি। ভিডিওটি ছড়িয়ে পড়ার পর সরকারের ভেতরে ও বাইরে তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখা দেয়।
ইশরাকের পদত্যাগের পেছনেও প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশের বিষয়টি আলোচনায় এসেছে। তবে ইশরাক দাবি করেছেন, তিনি নিজেই পদত্যাগের আগ্রহ প্রকাশ করেছিলেন।
অল্প সময়ের ব্যবধানে দুটি পদত্যাগের ঘটনা রাজনৈতিক মহলে এমন ধারণা তৈরি করেছে যে বিতর্কিত কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে দলের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হলে সংশ্লিষ্ট নেতাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে চাইছেন প্রধানমন্ত্রী।
দলীয় নেতাকর্মীদের নিয়ন্ত্রণে কতটা সফল বিএনপি?
২০২৪ সালের আগস্টে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর অন্তর্বর্তী সরকারের সময় থেকেই বিএনপির নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে চাঁদাবাজি, দখলদারত্ব ও সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে জড়িত থাকার অভিযোগ উঠতে থাকে। বিভিন্ন সময়ে দলটি তিন হাজারের বেশি নেতাকর্মীর বিরুদ্ধে সাংগঠনিক ব্যবস্থাও নেয়।
তবে চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে ক্ষমতায় আসার পর দলীয় নেতাকর্মীদের নিয়ন্ত্রণে বিএনপি কতটা সফল হয়েছে, সেই প্রশ্ন আবারও সামনে এসেছে।
বিরোধী দলগুলো আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতির জন্য সরকারের সমালোচনা করে আসছে। তাদের অভিযোগ, ক্ষমতাসীন দলের নেতাকর্মীদের নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থতার কারণেই বিভিন্ন এলাকায় দখল ও চাঁদাবাজির ঘটনা ঘটছে। অন্যদিকে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ এসব অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতি হচ্ছে বলে দাবি করেছেন।
গত ২৪ সেপ্টেম্বর মিরপুরে স্বল্প আয়ের পরিবারের নারী ও শিশুদের স্বাস্থ্যসেবা দেওয়া বেসরকারি প্রতিষ্ঠান রাড্ডার কার্যালয় গুঁড়িয়ে দেওয়ার ঘটনা সরকারকে বিব্রতকর পরিস্থিতিতে ফেলে। এর পরপরই ইউটিউবার সালমান মুক্তাদিরের স্টুডিওতে হামলা ও ভাঙচুরের ঘটনা আলোচনায় আসে। দুটি ঘটনাতেই দখল ও চাঁদাবাজির অভিযোগ ওঠে এবং স্থানীয় বিএনপির নেতাকর্মীদের সম্পৃক্ততা নিয়ে প্রশ্ন দেখা দেয়।
এসব ঘটনার পর দলীয় নেতাকর্মীদের কর্মকাণ্ড নিয়ন্ত্রণে সরকারের সক্ষমতা নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গন ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়।
অস্ত্র হাতে ইশরাকের অভিযান, সরকারের জন্য অস্বস্তি
অবৈধ মাদক ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে অস্ত্র হাতে ইশরাকের অভিযানের ভিডিও নতুন বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। একই সঙ্গে মাদকের বিস্তার রোধে প্রশাসনের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।
ইশরাক প্রকাশ্যে বলেছেন, মাদক নিয়ে পুলিশকে জানিয়েও তিনি প্রতিকার পাননি। তাঁর এই বক্তব্যের মধ্য দিয়ে মাদক নিয়ন্ত্রণে প্রশাসনের কার্যকারিতা নিয়ে সরকারের জন্য অস্বস্তিকর পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
বিএনপির এক নেতার মতে, মাদকের ভয়াবহ বিস্তার একটি বাস্তব সমস্যা এবং এ বিষয়ে ইশরাকের বক্তব্য পুরোপুরি ভুল নয়। পুলিশ ও প্রশাসন কার্যকর ব্যবস্থা নিতে পারছে না—এমন অভিযোগও উড়িয়ে দেওয়া যায় না। সে ক্ষেত্রে ইশরাককে সরাসরি পদত্যাগের পরিবর্তে কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়া যেত বলে মনে করেন তিনি।
ওই নেতার ধারণা, অস্ত্র হাতে অভিযান চালিয়ে ব্যক্তিগত বীরত্ব দেখানোর প্রবণতা যেন দলের অন্য নেতাদের মধ্যেও ছড়িয়ে না পড়ে, সেই বিবেচনা থেকে কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া হয়ে থাকতে পারে।
ইশরাক এর আগেও বিভিন্ন কর্মকাণ্ডের কারণে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সমালোচনা ও বিদ্রূপের মুখে পড়েছেন। প্রতিমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেওয়ার পর প্রধানমন্ত্রীর গাড়ির পেছনে দৌড়ানো, জিয়াউর রহমানের মাজারে ঠেলাঠেলি এবং জাতীয় স্মৃতিসৌধে তিন বাহিনীর প্রধানের সঙ্গে স্যালুট দেওয়ার ঘটনা নিয়েও আলোচনা হয়েছিল।
সাম্প্রতিক অস্ত্র হাতে অভিযানের ভিডিও সেই বিতর্ক আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। তবে মাদকের বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়া এবং আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার মধ্যে পার্থক্য রয়েছে—এমন প্রশ্নও সামনে এসেছে।
‘প্রতীকী ব্যবস্থা’ নিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী?
রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও লেখক মহিউদ্দিন আহমদের মতে, দেশের বিভিন্ন স্থানে তৈরি হওয়া বিশৃঙ্খল পরিস্থিতি সামাল দেওয়া সরকারের জন্য কঠিন হয়ে উঠেছে। এ কারণে প্রধানমন্ত্রী হয়তো প্রতীকী পদক্ষেপ হিসেবে দুই নেতার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিয়েছেন।
তবে ইশরাককে পদত্যাগের নির্দেশ প্রধানমন্ত্রী দিয়েছেন কি না, সে বিষয়ে সরকার স্পষ্টভাবে কিছু জানায়নি বলে উল্লেখ করেন তিনি।
মহিউদ্দিন আহমদ বলেন, দলের কিছু নেতার আচরণ ও পরিমিতিবোধের অভাব দৃষ্টিকটু হয়ে উঠছে। ইশরাক অবশ্য দাবি করেছেন, তিনি কোনো ভুল করেননি। এসব ঘটনা বিএনপির অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতি সম্পর্কে ধারণা দেয়।
তাঁর মতে, ফেরদৌসী আহমেদ মিষ্টির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হলেও রাড্ডা ঘটনায় হামলার পক্ষে বক্তব্য দেওয়া মিরপুরের এক সংসদ সদস্যের বিরুদ্ধে দৃশ্যমান কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। এতে প্রশ্ন উঠছে, দলীয় অভ্যন্তরীণ রাজনীতি কি সিদ্ধান্ত গ্রহণে প্রভাব ফেলছে?
অর্থাৎ, বিতর্কিত কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার ক্ষেত্রে দলের সব নেতার জন্য একই মানদণ্ড অনুসরণ করা হচ্ছে কি না, তা নিয়ে সংশয় রয়েছে।
জনআকাঙ্ক্ষার সঙ্গে সরকারের দূরত্ব
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য ও বিশ্লেষক কামরুল আহসানের মতে, সরকার গঠনের অল্প সময়ের মধ্যেই কিছু অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। প্রধানমন্ত্রীর পদক্ষেপ থেকে বোঝা যায়, তিনি এসব পরিস্থিতির গুরুত্ব উপলব্ধি করতে পারছেন।
তিনি বলেন, গণঅভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে সৃষ্ট রাজনৈতিক পরিবর্তনের সুফলভোগী হিসেবে বিএনপির কাছে মানুষের প্রত্যাশা অনেক। তাই দল ও সরকারকে সেই প্রত্যাশার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে কাজ করতে হবে। কিন্তু রাড্ডার কার্যালয় ভাঙার মতো ঘটনা মানুষের কাছে ভিন্ন বার্তা দেয়।
কামরুল আহসানের মতে, এ কারণেই প্রধানমন্ত্রী কঠোর অবস্থান নিয়েছেন। এর মাধ্যমে তিনি দল ও সরকারের অভিভাবক হিসেবে সীমা লঙ্ঘন না করার বার্তা দিতে চেয়েছেন।
তবে শুধু প্রধানমন্ত্রীর পদক্ষেপ যথেষ্ট নয়। দল হিসেবে বিএনপি এবং এর নেতাকর্মীরা এই বার্তা কতটা উপলব্ধি করেন এবং মাঠপর্যায়ে নিজেদের আচরণে পরিবর্তন আনেন, সেটিই হবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।
‘অন্যায় করলে কেউ রেহাই পাবে না’
বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব সৈয়দ এমরান সালেহ প্রিন্সের মতে, সাম্প্রতিক পদক্ষেপের মাধ্যমে প্রধানমন্ত্রী স্পষ্ট করেছেন যে অন্যায় বা অপরাধ করে কেউ রেহাই পাবেন না।
ইশরাক মাদকের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছেন—এটি ইতিবাচক হলেও অস্ত্র হাতে অভিযানের ধরন নিয়ে বিতর্ক তৈরি হয়েছে বলে মনে করেন তিনি। তাঁর মতে, প্রধানমন্ত্রীর পদক্ষেপের মধ্য দিয়ে আইনের চোখে সবাই সমান—এমন বার্তা দেওয়া হয়েছে।
সামনে বড় চ্যালেঞ্জ
ফেরদৌসী আহমেদ মিষ্টি ও ইশরাক হোসেনের পদত্যাগ বিএনপির জন্য একই সঙ্গে সতর্কবার্তা ও রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে। একদিকে দলীয় নেতাকর্মীদের বিতর্কিত কর্মকাণ্ড নিয়ন্ত্রণ করতে হবে, অন্যদিকে সরকার ও দলের ভাবমূর্তি রক্ষার পাশাপাশি জনগণের প্রত্যাশা পূরণ করতে হবে।
প্রধানমন্ত্রীর পদক্ষেপকে কেউ দেখছেন পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা হিসেবে, আবার কেউ মনে করছেন, এটি দল ও সরকারের ভাবমূর্তি রক্ষার কৌশল। একই সঙ্গে দলের ভেতরে সবার ক্ষেত্রে সমান ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে কি না, সেই প্রশ্নও রয়ে গেছে।
শেষ পর্যন্ত এসব পদক্ষেপ কতটা কার্যকর হবে, তা নির্ভর করবে বিএনপির নেতাকর্মীদের আচরণে বাস্তব পরিবর্তন আসে কি না এবং অভিযোগ ওঠার পর সরকার কতটা নিরপেক্ষভাবে ব্যবস্থা নিতে পারে, তার ওপর।






