বন পরিষ্কার করলেই বিপদ শেষ হচ্ছে না। নদীর জোয়ারে নোনা পানি ঢুকে পড়ছে জমিতে। আবাদ শুরু করতে দেরি হলে আবার গজিয়ে উঠছে নলখাগড়া। চারদিকে বাঘের ভয়, জ্বরের প্রকোপ। শ্রমিকদের থাকার জায়গা প্রয়োজন, পান করার জন্য মিঠা পানি প্রয়োজন। অথচ দক্ষিণ বাংলার এই অঞ্চলে প্রকৃতিই যেন একের পর এক বাধা তৈরি করে রেখেছে।
পঞ্চদশ শতাব্দী। এমন এক প্রতিকূল ভূখণ্ডের চেহারা বদলে দেওয়ার উদ্যোগ নিলেন এক দূরদর্শী প্রশাসক ও অসাধারণ নগরনির্মাতা। তাঁর নাম উলুঘ খান জাহান। ইতিহাসে যিনি খান জাহান আলী নামে পরিচিত।
তাঁর সামনে এক বিরাট কর্মযজ্ঞ। নোনা জোয়ার ঠেকাতে হবে। অরণ্য পরিষ্কার করে জমি আবাদযোগ্য করতে হবে। নির্মাণ করতে হবে রাস্তাঘাট, সেতু ও জলাধার। তারপর মানুষের বসতি, মসজিদ এবং প্রশাসনিক প্রতিষ্ঠান।
কাজটি কত কঠিন ছিল, তা বুঝতে হলে ঐতিহাসিক রিচার্ড ইটনের গবেষণার দিকে তাকাতে হয়। বন পরিষ্কারের পর দ্রুত ধানচাষ শুরু না করলে আবার নলখাগড়ায় ছেয়ে যেত জমি। নদীর নোনা পানি ঠেকাতে প্রয়োজন ছিল বাঁধ। পানির জন্য জলাধার, শ্রমিকদের জন্য বসতি। সবকিছুর জন্য বিপুল জনশক্তি ও সুসংগঠিত কর্মপরিকল্পনা।
খান জাহান এই প্রতিকূলতাকেই মোকাবিলা করলেন। তবে তাঁর পরিকল্পনা কেবল কৃষিভূমি উদ্ধারের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকল না।
তিনি নির্মাণ করতে চলেছেন এক নতুন নগর। খলিফাতাবাদ।
১
খান জাহানের প্রাথমিক জীবন সম্পর্কে খুব বেশি তথ্য পাওয়া যায় না। তবে তাঁর কবরের শিলালিপিতে সংরক্ষিত ‘উলুঘ খান-ই-আজম খান জাহান’ উপাধি তাঁর উচ্চ সামরিক ও প্রশাসনিক মর্যাদার পরিচয় বহন করে।
বাংলায় তখন স্বাধীন ইলিয়াস শাহি সালতানাতের শাসন। সুলতান নাসিরুদ্দিন মাহমুদ শাহের সময়ে দক্ষিণ বাংলায় খান জাহানের প্রশাসনিক কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠিত হয়। তাঁর নেতৃত্বে যশোর, খুলনা ও বাগেরহাটের বিস্তীর্ণ অঞ্চলে শুরু হয় এক অভূতপূর্ব কর্মযজ্ঞ।
প্রথম বাধা অরণ্য।
বন পরিষ্কারের সঙ্গে সঙ্গে শুরু হলো জমি আবাদ করার কাজ। নদী ও খালের ধারে বাঁধ দিয়ে আটকানো হলো লবণাক্ত জোয়ারের পানি। খনন করা হলো জলাধার। গড়ে উঠতে থাকল নতুন বসতি।
কিন্তু এখানে খান জাহানের অসাধারণত্ব কেবল বন পরিষ্কার কিংবা জমি আবাদ করার মধ্যে নয়। এতগুলো কাজকে একই পরিকল্পনার অধীনে পরিচালনা করার মধ্যেই ছিল তাঁর সাংগঠনিক ও প্রকৌশলগত দক্ষতার পরিচয়।
একদিকে কৃষিভূমি উদ্ধার হচ্ছে। অন্যদিকে বসতি গড়ে উঠছে। সেই বসতিকে ঘিরে প্রয়োজন হচ্ছে পানি, যাতায়াত এবং নিরাপত্তার।
খান জাহান এবার মনোযোগ দিলেন যোগাযোগব্যবস্থার দিকে।
২
বারোবাজার থেকে মুড়লি কসবা। সেখান থেকে পয়গ্রাম কসবা হয়ে খলিফাতাবাদ।
চারটি গুরুত্বপূর্ণ জনপদকে সংযুক্ত করেছিল এক দীর্ঘ সড়কব্যবস্থা। আধুনিক গবেষণায় এই পথের প্রায় ১১২.৭ কিলোমিটার বিস্তারের সন্ধান পাওয়া যায়।
জলাভূমির ওপর দিয়ে এমন সড়ক নির্মাণ মোটেও সহজ নয়। নিচু জমিতে প্রয়োজন উঁচু বাঁধ। খাল ও জলপ্রবাহ অতিক্রম করার জন্য প্রয়োজন সেতু ও কালভার্ট। আবার বর্ষায় রাস্তা যেন পানিতে ডুবে না যায়, সেদিকেও খেয়াল রাখতে হবে।
খান জাহানের নির্মাণব্যবস্থায় এসব সমস্যার সমাধান উন্মোচিত হলো। উঁচু মাটির বাঁধের ওপর তৈরি হলো রাস্তা। কোথাও বিছানো হলো ইট। জলপ্রবাহ অতিক্রমের জন্য নির্মিত হলো সেতু ও কালভার্ট।
কিন্তু এই প্রাচীন সড়কব্যবস্থার প্রকৃত বিস্ময় প্রকাশ পেল প্রায় ছয় শতাব্দী পর।
২০১৪ সালে ষাটগম্বুজ মসজিদের কাছে একটি প্রাচীন সড়ক খনন করছিল প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর। মাটির নিচ থেকে বেরিয়ে এল পঞ্চদশ শতাব্দীর কালভার্টের ধ্বংসাবশেষ। সঙ্গে পাওয়া গেল নিরাপত্তাচৌকি ও প্রবেশদ্বারের নিদর্শন!
অর্থাৎ শুধু চলাচলের পথই নির্মিত হয়নি। তার সঙ্গে যুক্ত ছিল পানি পারাপার, প্রবেশপথ ও নিরাপত্তার অবকাঠামো।
বিচ্ছিন্ন জনপদগুলোকে এভাবে এক যোগাযোগব্যবস্থার অধীনে আনা হলো। কৃষিপণ্য পরিবহন, বাণিজ্য এবং প্রশাসনিক কার্যক্রমের জন্য তৈরি হলো নতুন সুযোগ।
এটি ছিল সমগ্র অঞ্চলের অর্থনৈতিক ও সামাজিক বিকাশের জন্য এক গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ।
কিন্তু নোনা পানির এই দেশে আরেকটি সমস্যার সমাধান তখনও বাকি।
মানুষ পান করবে কী?
৩
এবার শুরু হলো দীঘি খনন।
ষাটগম্বুজ মসজিদের পশ্চিমে তৈরি হলো ঘোড়াদীঘি। দৈর্ঘ্যে প্রায় দেড় হাজার ফুট, প্রস্থে সাড়ে সাতশ ফুট। খান জাহানের সমাধিসৌধের কাছে খনন করা হলো আরেকটি বিশাল জলাধার, যা খানজাহান দীঘি নামে পরিচিত।
এসব দীঘির প্রয়োজন ছিল অপরিসীম। উপকূলীয় অঞ্চলের নদী ও খালের পানি সব সময় পান করার উপযোগী নয়। তাই বৃষ্টির মিঠা পানি ধরে রাখার জন্য নির্মিত হলো বিরাট জলাধার।
কিন্তু দীঘি খননের সঙ্গে নগর নির্মাণের আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ সম্পর্ক ছিল।
জলাধার খনন করলে উঠে আসে বিপুল পরিমাণ মাটি। সেই মাটি কাজে লাগানো যায় নিচু ভূমি উঁচু করতে, বাঁধ নির্মাণে এবং স্থাপনার ভিত্তি তৈরিতে। খলিফাতাবাদের নগর পরিকল্পনায় জলাধার, উঁচু ভূমি ও বসতির পারস্পরিক অবস্থান এই সমন্বিত প্রকৌশলচিন্তার গুরুত্ব তুলে ধরে।
একদিকে মিঠা পানির সংস্থান। অন্যদিকে জলাবদ্ধ ভূমিতে বসতি স্থাপনের সুযোগ।
এভাবেই পানির সমস্যাকে নগর পরিকল্পনার গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে মোকাবিলা করা হচ্ছিল।
আজও খলিফাতাবাদের বিভিন্ন স্থানে প্রাচীন দীঘি, উঁচু রাস্তা, বসতি ও মসজিদের অবস্থান থেকে এই পরিকল্পনার পরিচয় পাওয়া যায়।
ইউনেস্কোর মূল্যায়নেও খলিফাতাবাদের পানি সরবরাহ, নিষ্কাশনব্যবস্থা, জলাধার, সড়ক ও সেতুর সমন্বয়কে অসাধারণ প্রকৌশলদক্ষতার নিদর্শন হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে।
ধীরে ধীরে ভৈরব নদীর দক্ষিণ তীরে মাথা তুলে দাঁড়াতে থাকল নতুন এক নগর।
কিন্তু নগরীর সবচেয়ে বিস্ময়কর স্থাপনাটি তখনও নির্মিত হয়নি।
৪
খলিফাতাবাদের পশ্চিম প্রান্তে ঘোড়াদীঘির পাশে নির্মিত হলো এক বিরাট মসজিদ।
বিশাল ইটের প্রাচীর। সারিবদ্ধ খিলান। চার কোণে গোলাকার মিনার। ভেতরে পাথরের স্তম্ভের সমাবেশ।
ষাটগম্বুজ মসজিদ।
নাম ষাটগম্বুজ হলেও মসজিদটির ছাদে রয়েছে সত্তরটি গোলাকার গম্বুজ এবং মাঝের অংশে সাতটি চৌচালা ভল্ট। চার কোণের মিনার মিলিয়ে মোট একাশিটি গম্বুজাকৃতির আচ্ছাদন।
বিশাল এই ছাদ বহন করছে ষাটটি স্তম্ভ। কিন্তু এত বড় স্থাপনার ভার কীভাবে বহন করা সম্ভব হলো?
এখানেই দেখা যায় স্থপতিদের অসাধারণ প্রকৌশলজ্ঞান। সারিবদ্ধ স্তম্ভের ওপর নির্মিত খিলানগুলো ছাদের ভার বহন করছে। ভারী ছাদকে একটি বিশাল কাঠামোর ওপর না রেখে বহু স্তম্ভ ও খিলানের মাধ্যমে তার ভার বণ্টনের ব্যবস্থা করা হয়েছে।
কিন্তু বিস্ময় এখানেই শেষ নয়।
মসজিদের মাঝের সাতটি চৌচালা ভল্ট নির্মাণ করা হয়েছে বাংলার নিজস্ব ঘরবাড়ির আকৃতিতে। বাঁশ ও খড়ের তৈরি চৌচালা ঘরের গঠনশৈলীকে ইটের স্থায়ী স্থাপত্যে রূপ দিয়েছেন নির্মাতারা।
অন্যদিকে ভারী দেয়াল, গোলাকার মিনার এবং সামগ্রিক নির্মাণরীতিতে রয়েছে দিল্লির তুঘলক স্থাপত্যের প্রভাব।
এভাবে স্থানীয় বাংলার নির্মাণরীতি ও বহিরাগত মুসলিম স্থাপত্যের অভিজ্ঞতার সমন্বয়ে গড়ে উঠল এক স্বতন্ত্র শৈলী।
পরবর্তী সময়ে যা পরিচিতি পায় ‘খানজাহানী স্থাপত্যশৈলী’ নামে।
তবে শুধু ছাদের ভার বহন কিংবা সৌন্দর্যের জন্যই এই মসজিদের নির্মাণকৌশল ব্যতিক্রমী ছিল না।
নির্মাতাদের সামনে আরও বড় এক প্রতিপক্ষ ছিল।
দক্ষিণ বাংলার জলবায়ু।
৫
এ অঞ্চলের বাতাসে আর্দ্রতা বেশি। মাটিতে লবণাক্ততার প্রভাব রয়েছে। বর্ষায় প্রবল বৃষ্টিপাত হয়। এমন পরিবেশে ইটের স্থাপনা দীর্ঘদিন টিকিয়ে রাখা কঠিন।
খান জাহানের স্থপতিরা সেই সমস্যাও বিবেচনায় রেখেছিলেন।
তাঁর সমাধিসৌধের দেয়ালের নিচের অংশে প্রায় তিন ফুট উচ্চতা পর্যন্ত পাথরের আবরণ ব্যবহার করা হয়েছে। উদ্দেশ্য, মাটির আর্দ্রতা যেন সহজে ওপরের ইটের গাঁথুনিতে প্রবেশ করতে না পারে।
অথচ দক্ষিণ বাংলায় পাথর সহজলভ্য নয়!
তারপরও স্থাপনার স্থায়িত্ব নিশ্চিত করতে পাথর ব্যবহারের ব্যবস্থা করা হয়েছিল।
শুধু তা-ই নয়। বৃষ্টির পানি দ্রুত সরিয়ে দিতে ব্যবহৃত হয়েছে বাঁকানো কার্নিশ এবং পাথরের জলনিষ্কাশন নল। স্থাপনার কোথাও পোড়ামাটির অলংকরণও নির্মাণশৈলীর অংশ হয়ে উঠেছে।
অর্থাৎ প্রতিকূল আবহাওয়া মোকাবিলার প্রয়োজন থেকেই গড়ে উঠেছে স্থাপত্যের বিশেষ বৈশিষ্ট্য।
এখানে খান জাহানের প্রকৌশলদক্ষতার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিকটি স্পষ্ট হয়ে ওঠে। তিনি কেবল বৃহৎ স্থাপনা নির্মাণে মনোযোগ দেননি। স্থাপনাগুলো কীভাবে স্থানীয় পরিবেশে দীর্ঘদিন টিকে থাকবে, নির্মাণব্যবস্থায় সেই প্রশ্নেরও সমাধান খোঁজা হয়েছে।
পঞ্চদশ শতাব্দীর বাংলায় এমন পরিবেশ-উপযোগী স্থাপত্যকৌশল ছিল সেকালের এক অনন্য বিস্ময়। এ বিষয়টা চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে দেয় বাংলা তখন সভ্যতাগত দিক থেকে কতটা অগ্রসর ছিলো।
আর খলিফাতাবাদের এই প্রকৌশলচিন্তা শুধু মসজিদ কিংবা সমাধিসৌধে সীমাবদ্ধ ছিল না।
৬
ভৈরবের তীরে ততদিনে বিস্তৃত হয়েছে এক নতুন নগর।
পশ্চিমে ষাটগম্বুজ মসজিদকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে একটি গুরুত্বপূর্ণ অঞ্চল। পূর্বদিকে খান জাহানের সমাধিসৌধকে কেন্দ্র করে আরেকটি। দুই কেন্দ্রের দূরত্ব প্রায় সাড়ে ছয় কিলোমিটার।
নগরজুড়ে ছড়িয়ে রয়েছে রাস্তা, সেতু, দীঘি, মসজিদ ও বসতি। ইউনেস্কোর হিসাব অনুযায়ী এর বিস্তার ছিল প্রায় পঞ্চাশ বর্গকিলোমিটার।
কিন্তু বিস্ময়কর বিষয় হলো, এত বড় নগরের চারদিকে কোনো বিশাল প্রতিরক্ষাপ্রাচীর ছিল না। দক্ষিণে সুন্দরবনের দুর্ভেদ্য জলাভূমিই প্রাকৃতিক প্রতিরক্ষার সুযোগ করে দিয়েছিল।
নগরের পরিকল্পনায় প্রকৃতির এমন ব্যবহারও ছিল ব্যতিক্রমী।
খান জাহানের কাজের পরিধি যে কত বিস্তৃত ছিল, তার আরও প্রমাণ পাওয়া যায় প্রত্নতাত্ত্বিক খননে।
ষাটগম্বুজ মসজিদের উত্তরে সুন্দরঘোনা এলাকায় মাটির নিচ থেকে উদ্ধার করা হয়েছে প্রাচীন বসতির দেয়াল, মেঝে, পোড়ামাটির পানির পাইপ, পয়োনিষ্কাশনের নালা, তৈজসপত্র এবং নানান ধরনের গৃহস্থালি সামগ্রী।
এসব নিদর্শন একটি গুরুত্বপূর্ণ সত্য সামনে আনে।
খলিফাতাবাদ কেবল কয়েকটি অসাধারণ মসজিদের সমষ্টি ছিল না। এখানে মানুষের বসবাস ছিল। পানির ব্যবহার ও নিষ্কাশনের ব্যবস্থা ছিল। ছিল যোগাযোগব্যবস্থা, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান এবং দৈনন্দিন জীবনের প্রয়োজনীয় অবকাঠামো।
অর্থাৎ খান জাহান ও তাঁর নির্মাতারা বিচ্ছিন্নভাবে কিছু স্থাপনা নির্মাণ করেননি।
তাঁদের কর্মযজ্ঞের মধ্য দিয়ে একটি অঞ্চলের কৃষি, যোগাযোগ, পানি ব্যবস্থাপনা, স্থাপত্য ও সামাজিক জীবনকে নতুনভাবে সংগঠিত করা হয়েছিল।
এই সমন্বিত নগরচিন্তাই খান জাহানের সবচেয়ে বড় অসাধারণত্ব।
৭
১৪৫৯ খ্রিস্টাব্দ।
দক্ষিণ বাংলার এই বিস্ময়কর নগর নির্মাতা ইন্তেকাল করলেন। যিনি একাধারে বড় আলেম, সেনানায়ক, নগরবিদ ও স্থাপত্যের ওপর অগাধ জ্ঞানসম্পন্ন একজন ব্যক্তিত্ব। খানজাহান দীঘির তীরে তাঁকে সমাহিত করা হলো। তাঁর সমাধির শিলালিপিতে সংরক্ষিত রয়েছে মৃত্যুর তারিখ, ৮৬৩ হিজরি।
কিন্তু তাঁর মৃত্যুর সঙ্গে খলিফাতাবাদের ইতিহাস শেষ হয়ে যায়নি।
প্রায় ছয় দশক পরেও নগরটি গুরুত্বপূর্ণ ছিল। ১৫১৬ খ্রিস্টাব্দে খলিফাতাবাদ থেকে মুদ্রা জারি করা হয়। পরবর্তী সময়ে সুলতান গিয়াসউদ্দিন মাহমুদ শাহের আমলেও এখানকার টাঁকশাল চালু ছিল। ১৫৩৫ খ্রিস্টাব্দের মুদ্রাও পাওয়া গেছে।
এত বছর পরেও খলিফাতাবাদের প্রশাসনিক গুরুত্ব বজায় থাকার এটি এক গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণ।
অবশ্য সময়ের সঙ্গে বদলে যায় নগরের ভাগ্য। নদীর গতিপথ পরিবর্তন, জলাবদ্ধতা, লবণাক্ততা ও রাজনৈতিক পরিবর্তনের প্রভাবে হারিয়ে যায় তার পুরোনো জৌলুশ। একসময় অরণ্যে ঢাকা পড়ে বহু স্থাপনা।
কিন্তু পুরো ইতিহাস মুছে যায়নি।
টিকে রয়েছে ষাটগম্বুজ মসজিদ। রয়ে গেছে সিঙ্গাইর, চুনাখোলা, বিবিবেগনী ও নয়গম্বুজ মসজিদ। রয়ে গেছে খান জাহানের সমাধিসৌধ, দীঘি এবং প্রাচীন সড়কের অংশবিশেষ।
খান জাহান আলীর কীর্তির সবচেয়ে বড় মাহাত্ম্য এখানেই।
একজন সেনানায়ক হয়েও তিনি নিজের প্রতিভাকে কেবল সামরিক অভিযানে সীমাবদ্ধ রাখেননি। তাঁর নেতৃত্বে একদল দক্ষ নির্মাতা, কারিগর ও শ্রমিক প্রতিকূল ভূপ্রকৃতিকে মোকাবিলা করে গড়ে তুলেছিলেন মানুষের বসবাসের উপযোগী এক বিস্তীর্ণ জনপদ।
নোনা জোয়ারের বিরুদ্ধে বাঁধ, জলাভূমির ওপর সড়ক, খাল পেরোনোর জন্য সেতু, মিঠা পানির জন্য দীঘি, আর্দ্রতা প্রতিরোধী নির্মাণকৌশল এবং স্থানীয় স্থাপত্যরীতির অনন্য প্রয়োগ।
এসব বিচ্ছিন্ন কোনো কীর্তি নয়। একই বৃহত্তর নগর পরিকল্পনার বিভিন্ন অংশ।
এই সমন্বয়ই খলিফাতাবাদকে তার সময়ের এক অসাধারণ প্রকৌশল ও নগরায়ণ প্রকল্পে পরিণত করেছিল।
যে অরণ্য ও জলাভূমি একসময় মানুষের বসতি সম্প্রসারণের পথে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছিল, সেখানেই মাথা তুলে দাঁড়াল এক সমৃদ্ধ নগরসভ্যতা।
সেই নগরের ইট, পাথর, রাস্তা ও জলাধার আজও সাক্ষ্য দিচ্ছে পঞ্চদশ শতাব্দীর বাংলায় অর্জিত এক বিস্ময়কর প্রকৌশল উৎকর্ষের।
আর সেই মহৎ কর্মযজ্ঞের কেন্দ্রে ছিলেন একজন মানুষ।
উলুঘ খান জাহান।
তথ্যসূত্র:
১. Richard M. Eaton, The Rise of Islam and the Bengal Frontier, 1204–1760, University of California Press, 1993। বিশেষত Charismatic Pioneers on the Agrarian Frontier।
২. UNESCO World Heritage Centre, Historic Mosque City of Bagerhat, World Heritage List, No. 321।
৩. Fatiha Polin ও Dhrubo Alam, “Tracing the Journey of Khan Jahan Ali from Barobazar to Bagerhat,” 2018/2019।
৪. Qazi A. Mowla ও Muhammad Ali Naqi, “An Appraisal of Khan-e-Jahan Style in Architecture,” Khulna University Studies, 1999।
৫. Hafizur Rahaman ও Khandokar Mahfuz-ud-Darain, “A Description of Buildings in Khalifatabad City, Bagerhat,” Protibesh, 2006।
৬. বাংলাপিডিয়া, Khan Jahan’s Tomb, Bagerhat ও Mint Towns।
৭. প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের তথ্যের ভিত্তিতে প্রথম আলো, “সাড়ে ৬০০ বছরের এক ধুলামাখা পথ” এবং “খান জাহান (রহ.)-এর বসতভিটা খনন: উঠে আসছে মধ্যযুগের বসতি”।







