বিএনপির আনুষ্ঠানিক ও সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন ফেসবুক পেজ থেকে নির্বাচনী প্রচারণায় বিপুল অর্থ ব্যয়ের তথ্য সামনে এসেছে। বিশেষ করে নির্বাচনী প্রচারণার শেষ ২৩ দিনে দলটির মূল পেজগুলোর তুলনায় বিভাগীয় ও সহযোগী পেজগুলোতে বিজ্ঞাপনের ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছিল বলে দাবি করা হয়েছে। পাশাপাশি কিছু অপ্রাতিষ্ঠানিক পেজ থেকেও বিএনপির পক্ষে এবং ১১-দলীয় জোটের বিপক্ষে প্রচারণায় বড় অঙ্কের অর্থ ব্যয়ের তথ্য তুলে ধরা হয়েছে।

প্রাপ্ত হিসাব অনুযায়ী, জুলাই-পরবর্তী সময়ে বিএনপি-সংশ্লিষ্ট পেজগুলোতে ফেসবুক বিজ্ঞাপনে মোট ব্যয় ৩ কোটি টাকার বেশি। এর মধ্যে সারা বছর নিয়মিত বিজ্ঞাপন চালানো তিনটি পেজের ব্যয়ের হিসাবও উল্লেখ করা হয়েছে। বিএনপির মূল পেজে প্রায় ৪০ লাখ টাকা, বিএনপি মিডিয়া সেল পেজে ২৮ লাখ টাকা এবং তারেক রহমানের পেজে প্রায় ২০ লাখ টাকা ব্যয় হয়েছে বলে দাবি করা হয়েছে।
তবে নির্বাচনী প্রচারণার সময় এসব মূল পেজের বিজ্ঞাপন ব্যয়ের চিত্র ছিল ভিন্ন। ২২ জানুয়ারি থেকে ১৩ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত ২৩ দিনে বিএনপির মূল পেজ, বিএনপি মিডিয়া সেল এবং তারেক রহমানের পেজ মিলিয়ে বিজ্ঞাপন ব্যয় হয়েছে মাত্র ৭ লাখ ১০ হাজার টাকা বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
অন্যদিকে, একই সময়ে বিএনপি মিডিয়া সেলের বিভিন্ন বিভাগীয় পেজে বিজ্ঞাপন ব্যয় হঠাৎ বেড়ে যায়। এসব বিভাগীয় পেজ মিলিয়ে ২৩ দিনে প্রায় ১ কোটি টাকার বিজ্ঞাপন প্রচার করা হয়েছে বলে দাবি করা হয়েছে। অর্থাৎ কেন্দ্রীয় পেজগুলোতে ব্যয় তুলনামূলক কম থাকলেও বিভাগীয় পেজগুলোর মাধ্যমে ব্যাপক প্রচারণা চালানো হয়েছিল বলে হিসাবটিতে উঠে এসেছে।
এ ছাড়া ‘সবার আগে বাংলাদেশ’ এবং ‘আমার ধান—আমার প্রাণ’ নামের দুটি পেজ থেকেও নির্বাচনী প্রচারণায় বিজ্ঞাপন দেওয়া হয়। ২৩ দিনে এই দুই পেজের সম্মিলিত বিজ্ঞাপন ব্যয় প্রায় ৪৩ লাখ টাকা বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
এই হিসাব অনুযায়ী, বিএনপির সঙ্গে আনুষ্ঠানিকভাবে সংশ্লিষ্ট পেজগুলো থেকে নির্বাচনী প্রচারণার শেষ ২৩ দিনে ফেসবুক বিজ্ঞাপনে প্রায় দেড় কোটি টাকা ব্যয় হয়েছে।
তবে আলোচনার আরেকটি বড় বিষয় হলো, বিএনপির পক্ষে এবং ১১-দলীয় জোটের বিপক্ষে প্রচারণা চালানো কয়েকটি অপ্রাতিষ্ঠানিক পেজের বিজ্ঞাপন ব্যয়। প্রাপ্ত হিসাব অনুযায়ী, ‘বঙ্গলীলা’ পেজে প্রায় ৩৩ লাখ টাকা, ‘গণসার্কাস’ পেজে ২১ লাখ টাকা, ‘FPB News’ পেজে ১২ লাখ টাকা এবং ‘Bangladesh Live’ পেজে ৫ লাখ টাকার বিজ্ঞাপন দেওয়া হয়েছে।
এই চারটি পেজের সম্মিলিত বিজ্ঞাপন ব্যয় প্রায় ৭১ লাখ টাকা। এসব পেজের মালিকানা, অর্থের উৎস এবং বিএনপির সঙ্গে তাদের সাংগঠনিক বা আর্থিক সম্পর্ক কী—তা স্বাধীনভাবে নিশ্চিত করা যায়নি। তবে প্রচারণার ধরন ও বিজ্ঞাপনের ব্যয়ের হিসাব সামনে আসায় পেজগুলোকে ঘিরে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।
সব হিসাব একত্র করলে দেখা যায়, নির্বাচনী প্রচারণার শেষ ২৩ দিনে বিএনপি-সংশ্লিষ্ট আনুষ্ঠানিক পেজ এবং দলটির পক্ষে প্রচারণা চালানো বলে দাবি করা অপ্রাতিষ্ঠানিক পেজগুলো মিলিয়ে ফেসবুক বিজ্ঞাপনে প্রায় ২ কোটি ২০ লাখ টাকা ব্যয় হয়েছে বলে হিসাবটিতে দাবি করা হয়েছে।
অন্যদিকে, নির্বাচন কমিশনে বিএনপি দল হিসেবে নির্বাচনী প্রচারণায় মোট ৩ কোটি ৮১ লাখ টাকা ব্যয়ের হিসাব জমা দিয়েছে বলে উল্লেখ করা হয়েছে। নির্বাচনে দলীয় ব্যয়ের নির্ধারিত সীমা ছিল ৪ কোটি ৫০ লাখ টাকা।
এখানেই তৈরি হয়েছে বড় প্রশ্ন। ফেসবুক বিজ্ঞাপনে শুধু ২৩ দিনে প্রায় ২ কোটি ২০ লাখ টাকা ব্যয়ের হিসাব সামনে এলে, এই অর্থের কতটুকু বিএনপির জমা দেওয়া নির্বাচনী ব্যয়ের হিসাবের মধ্যে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে? বিজ্ঞাপনের পুরো ব্যয় কি নির্বাচন কমিশনে জমা দেওয়া হিসাবের মধ্যে রয়েছে, নাকি কিছু পেজের বিজ্ঞাপন ব্যয় আলাদা উৎস থেকে বহন করা হয়েছে?
বিশেষ করে বিএনপির সঙ্গে আনুষ্ঠানিকভাবে সংশ্লিষ্ট নয়—এমন পেজগুলো থেকে দলীয় প্রচারণায় অর্থ ব্যয় হয়ে থাকলে সেই অর্থের উৎস ও ব্যয়ের দায় কার, তা নিয়েও প্রশ্ন উঠছে। এসব পেজের সঙ্গে দলের কোনো আনুষ্ঠানিক সম্পর্ক রয়েছে কি না, বিজ্ঞাপনের অর্থ কারা দিয়েছে এবং ব্যয়গুলো নির্বাচনী হিসাবের মধ্যে অন্তর্ভুক্ত হয়েছে কি না—এসব বিষয়ে স্পষ্ট ব্যাখ্যা প্রয়োজন।
উল্লেখ্য, দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড ৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৬-এ প্রকাশিত এক বিশ্লেষণে Meta Ad Library ও Who Targets Me-এর তথ্য ব্যবহার করে জানায়, ২০২৫ সালের ৫ নভেম্বর থেকে ২০২৬ সালের ২ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত বিএনপি ও সংশ্লিষ্ট সংগঠনগুলোর বিভিন্ন পেজ থেকে প্রায় দেড় কোটি টাকার অনলাইন বিজ্ঞাপন প্রচার করা হয়। দ্য ডেইলি স্টার ১১ ফেব্রুয়ারির এক বিশ্লেষণে বিএনপি-সংশ্লিষ্ট ১৩৬টি পেজের মাধ্যমে বিজ্ঞাপন প্রচারের তথ্য তুলে ধরে। এসব প্রতিবেদনে নির্বাচনী প্রচারণায় ফেসবুক বিজ্ঞাপনের ব্যাপক ব্যবহারের বিষয়টি উঠে এসেছে।
তবে এখানে উল্লেখ করা ২২ জানুয়ারি থেকে ১৩ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত নির্দিষ্ট পেজভিত্তিক ব্যয়ের হিসাব, বিজ্ঞাপনদাতাদের পরিচয় এবং নির্বাচন কমিশনে জমা দেওয়া ব্যয়ের সঙ্গে তার মিল—এসব বিষয়ে পূর্ণাঙ্গ স্বাধীন যাচাই প্রয়োজন। বিএনপির আনুষ্ঠানিক বক্তব্য এবং নির্বাচন কমিশনের নথি পাওয়া গেলে বিষয়টি আরও পরিষ্কার হবে।
নির্বাচনী প্রচারণায় ডিজিটাল বিজ্ঞাপনের ব্যয় এখন রাজনৈতিক স্বচ্ছতার গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হয়ে উঠেছে। বিশেষ করে বিজ্ঞাপনের অর্থের উৎস, প্রচারণার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট পেজগুলোর পরিচয় এবং নির্বাচন কমিশনে জমা দেওয়া ব্যয়ের হিসাবের সঙ্গে বিজ্ঞাপনের তথ্যের সামঞ্জস্য—এসব বিষয়ে সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর ব্যাখ্যা প্রত্যাশিত।







