খুলনার ডুমুরিয়া উপজেলার গুটুদিয়া ইউনিয়নের টিকাবুনিয়া গ্রামসংলগ্ন জুটমিল এলাকায় পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) রক্ষিত বেড়িবাঁধ ছিদ্র করে অবৈধভাবে পাইপ বসানোর মারাত্মক অভিযোগ উঠেছে স্থানীয় দুই বিএনপি নেতার বিরুদ্ধে। ক্ষমতার অপব্যবহার করে মাত্র ৫০০ মিটারের মধ্যে পাঁচটি পাইপ বসানোর কারণে বাঁধের মারাত্মক ক্ষতি হয়েছে।
অভিযুক্ত ব্যক্তিরা হলেন—উপজেলা বিএনপির সাবেক যুগ্ম আহ্বায়ক ও সাহস ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মোল্লা মাহাবুবুর রহমান এবং তাঁর সহযোগী উপজেলা শ্রমিক দলের সাংগঠনিক সম্পাদক সাইফুল ইসলাম। তারা মূলত জমি কেনাবেচার ব্যবসার সাথে জড়িত।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, অভিযুক্ত বিএনপি নেতারা দীর্ঘদিন ধরে ভদ্রা নদীর পলিযুক্ত জোয়ারের পানি বেড়িবাঁধের ভেতর প্রবেশ করাচ্ছেন। এর মাধ্যমে তাদের কেনা ২০ বিঘা নিচু ফসলি জমি উঁচু ও ভরাট করার পাশাপাশি সেখানে বাণিজ্যিক মাছ চাষ করা হচ্ছে।
পাইপ দিয়ে জোরপূর্বক নদীর নোনাপানি ভেতরে ঢোকানোর কারণে পার্শ্ববর্তী গ্রাম ও বিলের প্রায় ৫০ বিঘা জমির ফসল সম্পূর্ণ নষ্ট হয়ে গেছে। এছাড়া অর্ধশতাধিক বসতবাড়িতে পানি ঢুকেছে এবং কয়েক হাজার ফলদ ও বনজ গাছপালা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
নোনাপানির প্লাবন ও এলাকার সাধারণ মানুষের দুর্ভোগের চিত্র তুলে ধরে ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী আব্দুল আজিজ ও হানিফ শেখ জানান, হাঁটুসমান পানি মাড়িয়ে লোকজনকে যাতায়াত করতে হচ্ছে। শিশু, বৃদ্ধ ও গবাদিপশু নিয়ে চরম বিপাকে পড়েছেন স্থানীয় বাসিন্দারা।
এসব অবৈধ কার্যক্রমের প্রতিবাদ করতে গেলে প্রভাবশালী ওই দুই নেতার লোকজনের পক্ষ থেকে বিভিন্ন ধরনের হুমকি-ধমকি দেওয়া হচ্ছে বলে অভিযোগ করেছেন এলাকাবাসী। ভয়ে স্থানীয় কেউ মুখ খুলতে সাহস পাচ্ছেন না।
বেড়িবাঁধের ভেতর নোনাপানি ঢোকানোর ফলে বাঁধের মাটি অত্যন্ত দুর্বল হয়ে ধস শুরু হয়েছে এবং বড় বড় গর্তের সৃষ্টি হয়েছে। যে কোনো মুহূর্তে জোয়ারের পানির চাপে পুরো বাঁধ ভেঙে বিস্তীর্ণ জনপদ প্লাবিত হওয়ার আশঙ্কা করছেন স্থানীয়রা।
এই বেড়িবাঁধটি পাউবোর অধীন হলেও জনগুরুত্ব বিবেচনা করে কয়েক বছর আগে এর ওপর পাকা সড়ক নির্মাণ করে এলজিইডি। কিন্তু বাঁধের মাঝখানে বিশাল গর্ত তৈরি হওয়ায় বর্তমানে সব ধরনের ভারী যানবাহন চলাচল পুরোপুরি বন্ধ হয়ে গেছে।
শরাফপুর গ্রামের মাছ ব্যবসায়ী পরিমল বিশ্বাস ও হাফিজুর রহমান জানান, খুলনার কয়রা ও পাইকগাছা উপজেলাসহ ডুমুরিয়া সদর, শরাফপুর, মাগুরখালী, সাহস ও ভান্ডারপাড়া—এই পাঁচ ইউনিয়নের হাজার হাজার মানুষ এবং জুটমিলের শ্রমিকবাহী বাস এই পথ দিয়ে যাতায়াত করত।
সড়কটি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় স্থানীয় উৎপাদিত মাছ, শাকসবজিবাহী ট্রাক-পিকআপ, অ্যাম্বুলেন্স এবং জরুরি ওষুধবাহী গাড়িগুলোকে এখন ১৫ থেকে ২০ কিলোমিটার পথ ঘুরিয়ে গন্তব্যে যাতায়াত করতে হচ্ছে।
গুটুদিয়া ইউপির ৮ নম্বর ওয়ার্ডের সদস্য মেহেদী হাসান মিন্টু জানান, গত বৃহস্পতিবার হঠাৎ সড়কের ভেতর বিশাল গর্তের সৃষ্টি হয়ে বাঁধের অংশ ধসে পড়ে। বর্তমানে অত্যন্ত ঝুঁকির মুখে বাঁধের পাশ ঘেঁষে কেবল হালকা যানবাহন ও পথচারীদের চলাচলের ব্যবস্থা করা হয়েছে।
সাংবাদিকদের উপস্থিতি টের পেয়ে শ্রমিক দল নেতা সাইফুল ইসলাম দ্রুত মোটরসাইকেলে করে ঘটনাস্থল ত্যাগ করায় তাঁর বক্তব্য নেওয়া সম্ভব হয়নি। তবে অপর অভিযুক্ত বিএনপি নেতা ও ইউপি চেয়ারম্যান মোল্লা মাহাবুবুর রহমান বেড়িবাঁধে পাইপ বসানোর সত্যতা স্বীকার করেছেন। তিনি দাবি করেন, পাউবো থেকে কোনো অনুমতি নেওয়া না হলেও ক্ষতিগ্রস্ত সড়কটি তিনি দ্রুত মেরামতের ব্যবস্থা করবেন।
এ বিষয়ে খুলনা পাউবোর (বিভাগ-১) নির্বাহী প্রকৌশলী মো. আশরাফুল আলম ঘটনাটিকে অত্যন্ত ন্যক্কারজনক বলে উল্লেখ করেছেন। তিনি জানান, ইতোমধ্যে ঘটনাস্থল পরিদর্শন করা হয়েছে এবং এই অবৈধ কাজের সাথে জড়িত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) সবিতা সরকার জানিয়েছেন, বেড়িবাঁধ কেটে জনদুর্ভোগ সৃষ্টির দায়ে অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে দ্রুত ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য সংশ্লিষ্ট দপ্তরের কর্মকর্তাদের সঙ্গে আলোচনা করা হচ্ছে।







