ভারতের হায়দরাবাদে ড. মারি চান্না রেড্ডি হিউম্যান রিসোর্স ডেভেলপমেন্ট ইনস্টিটিউটে ‘সাংবাদিকতা ও জনসংযোগ’ বিষয়ে সাত দিনের একটি বিশেষ প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেছেন বাংলাদেশের ৪২ জন সাংবাদিক। ইন্ডিয়ান টেকনিক্যাল অ্যান্ড ইকোনমিক কোঅপারেশন প্রোগ্রাম (আইটেক)-এর আয়োজনে গত ২৫ থেকে ৩১ অক্টোবর (২০২৬) পর্যন্ত এই প্রশিক্ষণ অনুষ্ঠিত হয়।
প্রশিক্ষণটির মূল বিষয়বস্তুর মধ্যে ছিল—সাংবাদিকতা ও জনসংযোগ, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ব্যবহার, এবং বিশেষ করে অর্থনীতি, বাণিজ্য ও জ্বালানি খাতের সংবাদ সংগ্রহ। বাংলাদেশ থেকে অংশ নেওয়া সাংবাদিকদের একটি বড় অংশই ছিলেন অর্থনীতি, বাণিজ্য ও জ্বালানি বিষয়ক রিপোর্টার।
জানা গেছে, বাংলাদেশে ফ্যাসিবাদী আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে ২০২০ সাল থেকে সাংবাদিকদের ভারতের এই আইটেক প্রশিক্ষণে পাঠানো শুরু হয়। এর আগে আইটেকের আওতায় বাংলাদেশি সাংবাদিকদের এ ধরনের প্রশিক্ষণে পাঠানোর কোনো ইতিহাস নেই।
সম্প্রতি বাংলাদেশে নিযুক্ত ভারতীয় হাইকমিশনের অফিসিয়াল ফেসবুক পেজে এ বিষয়ক এক পোস্টে বিষয়টি বেশ সাধারণভাবে উপস্থাপন করা হয়। তবে তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, আইটেক কোনো বেসরকারি সংস্থা নয়; এটি সম্পূর্ণ ভারত সরকারের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অধীনস্থ ডেভেলপমেন্ট পার্টনারশিপ অ্যাডমিনিস্ট্রেশন (ডিএপি) উইং দ্বারা পরিচালিত ও অর্থায়িত একটি উদ্যোগ।
ভারতের এই পদক্ষেপে প্রশ্ন উঠেছে এর মূল উদ্দেশ্য নিয়ে। প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত ৪২ জন সাংবাদিকের ঢাকা-হায়দরাবাদ যাতায়াতের বিমানভাড়া, আবাসন, প্রশিক্ষণ ফি এবং দৈনিক ভাতাসহ যাবতীয় খরচ সম্পূর্ণ বহণ করেছে ভারত সরকার। অংশগ্রহণকারীদের জন্য একমাত্র শর্ত ছিল সংশ্লিষ্ট খাতে ৫ থেকে ১০ বছরের পেশাগত অভিজ্ঞতা।
বিশেষজ্ঞ ও বিশ্লেষকদের মতে, আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে একটি রাষ্ট্র যখন অন্য একটি সার্বভৌম রাষ্ট্রের সাংবাদিকদের নিজ অর্থায়নে প্রশিক্ষণ দেয়, তখন তাকে কেবল ‘পেশাগত দক্ষতা বৃদ্ধি’র মধ্যে সীমাবদ্ধ রেখে দেখার সুযোগ থাকে না। একে আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে রাষ্ট্রীয় ‘সফট পাওয়ার’ ও ‘পাবলিক ডিপ্লোম্যাসি’র অংশ হিসেবে বিবেচনা করা হয়।
সাংবাদিকরা সমাজে জনমত তৈরি ও রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক ভাবধারা গঠনে মুখ্য ভূমিকা পালন করেন। বাংলাদেশ-ভারত দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক ও ভূরাজনৈতিক স্বার্থের সবচেয়ে সংবেদনশীল খাত—অর্থনীতি, বাণিজ্য ও জ্বালানি সেক্টরের সাংবাদিকদের এই প্রশিক্ষণের জন্য বেছে নেওয়াকে কৌশলগত পদক্ষেপ হিসেবে দেখছেন সচেতন মহল। তাঁদের আশঙ্কা, এ ধরণের প্রশিক্ষণপ্রাপ্তরা ভবিষ্যতে প্রতিবেদন বা বিশ্লেষণের ক্ষেত্রে ভারতীয় পররাষ্ট্রনীতির বয়ান বা স্বার্থকে অগ্রাধিকার দিতে পারেন।
এই প্রেক্ষাপটে প্রশ্ন উঠেছে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত ওই ৪২ জন সাংবাদিকের পরিচয় নিয়ে। দেশের সচেতন নাগরিক সমাজ ও সংশ্লিষ্ট মহল থেকে দাবি উঠেছে, বাংলাদেশ সরকারের উচিত আইটেকের এই প্রশিক্ষণে অংশ নেওয়া ৪২ জন সাংবাদিকের নাম, পদবি, কর্মস্থল ও বিস্তারিত তথ্য জনসমক্ষে উন্মুক্ত করা।
বিশ্লেষকদের বক্তব্য, প্রশিক্ষণ নেওয়া কোনো অপরাধ নয় কিংবা কাউকেই এককভাবে অন্য দেশের এজেন্ট হিসেবে অভিযুক্ত করা হচ্ছে না। তবে বিদেশি সরকারি অর্থায়নে পরিচালিত এ জাতীয় প্রশিক্ষণের ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা থাকা বাঞ্ছনীয়, যাতে দেশের গণমাধ্যমের নিরপেক্ষতা অক্ষুণ্ন থাকে এবং জাতীয় স্বার্থ সুরক্ষিত হয়।







