জনগণের অধিকার আদায় না হওয়া পর্যন্ত লড়াই চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন বিরোধীদলীয় নেতা ও বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান।
তিনি বলেছেন, জনগণের সব অধিকার তাদের হাতে ফিরিয়ে না দেওয়া পর্যন্ত এই সংগ্রাম অব্যাহত থাকবে।
মঙ্গলবার (৩ নভেম্বর) দুপুরে রাজধানীর মিন্টো রোডে বিরোধীদলীয় নেতার সরকারি বাসভবনে সদ্য কারামুক্ত বীর মুক্তিযোদ্ধা মেজর (অব.) আখতারুজ্জামানের সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে তিনি এসব কথা বলেন। গত ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনের আগে বিএনপির সাবেক এই সংসদ সদস্য জামায়াতে ইসলামীতে যোগ দেন।
ডা. শফিকুর রহমান বলেন, ‘আমাদের সহযোদ্ধা মেজর (অব.) আখতারুজ্জামান দেশবাসী ও প্রবাসীদের অধিকার আদায়ের জন্য যেভাবে লড়াই করেছেন এবং কারাবরণ করেছেন, আমরাও প্রতিশ্রুতি দিচ্ছি—জনগণের প্রতিটি অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য একইভাবে লড়াই চালিয়ে যাব। যত দিন জনগণের অধিকার তাদের হাতে ফিরে না আসবে, তত দিন আমাদের সংগ্রাম অব্যাহত থাকবে, ইনশাআল্লাহ।’
সরকারকে সতর্ক করে জামায়াত আমির বলেন, তার সহকর্মী প্রমাণ করেছেন যে তারা কোনো রক্তচক্ষুকে ভয় পান না। তাদের ভয় কেবল মহান আল্লাহকে।
তিনি অভিযোগ করেন, সরকারের ব্যাপক ব্যর্থতা, অযোগ্যতা ও অদক্ষতা আড়াল করতে বিরোধী দলকে অপপ্রচারের লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত করা হচ্ছে। এ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘যে সাপ আপনারা নাচাচ্ছেন, সেই সাপই একদিন ছোবল দেবে। সাপ পালিয়ে যাবে, আপনাদের লাশ পড়ে থাকবে।’
বিরোধীদলীয় নেতা বলেন, সংসদেও তারা সতর্ক করেছেন যে, সুসময়ের সঙ্গী হিসেবে যারা এখন সরকারের পাশে রয়েছে, দুঃসময়ে তাদের খুঁজে পাওয়া যাবে না। বসন্তের পর গ্রীষ্ম কিংবা বর্ষাকাল এলে এসব সুবিধাবাদী মানুষ সরে পড়বে।
তিনি সরকারকে বিরোধী দলের চরিত্রহনন বন্ধ করে নিজেদের ব্যর্থতা কাটিয়ে ওঠার আহ্বান জানান। তার মতে, জনগণের দুর্ভোগ লাঘব করতে পারলে মানুষ সরকারকে সমর্থন করবে। কিন্তু অতীতের মতো স্বৈরাচারী কায়দায় প্রতিবাদী কণ্ঠ দমনের চেষ্টা করলে তা আর বাংলাদেশে সম্ভব হবে না।
তিনি আরও বলেন, বাংলাদেশের মানুষ আর ফ্যাসিবাদ মেনে নেবে না কিংবা তার কাছে মাথা নত করবে না। ঐক্যবদ্ধ জনগণ অন্যায়ের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়িয়েছে এবং ভবিষ্যতেও এই প্রতিরোধ আরও শক্তিশালী হবে।
মেজর (অব.) আখতারুজ্জামানের এক মাস তিন দিন পর কারামুক্তিতে মহান আল্লাহর কাছে শুকরিয়া আদায় করেন জামায়াত আমির। তিনি বলেন, হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে দীর্ঘদিন ধরে চলা অনিয়ম, দুর্নীতি ও যাত্রীদের ভোগান্তি নিয়ে কথা বলার কারণেই তাকে কারাগারে যেতে হয়েছে।
ডা. শফিকুর রহমানের ভাষ্য অনুযায়ী, বিমানবন্দরে তিনি কারও গায়ে হাত দেননি। অথচ তার বিরুদ্ধে সরকারি কাজে বাধা দেওয়া এবং সরকারি কর্মকর্তাকে শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত করার অভিযোগে মামলা করা হয়, যা সম্পূর্ণ মিথ্যা।
তিনি বলেন, মামলা হওয়ার খবর পাওয়ার পরপরই তারা প্রতিবাদ জানিয়েছিলেন। আগাম জামিনের পরামর্শ দেওয়া হলে মেজর আখতারুজ্জামান জানিয়েছিলেন, তিনি কোনো অন্যায় করেননি, তাই আত্মসমর্পণ করবেন না। প্রয়োজনে গ্রেপ্তার হয়ে কারাগারে যাবেন।
বিমানবন্দরের অনিয়মের প্রসঙ্গ তুলে জামায়াত আমির বলেন, যাত্রীদের ট্রলি পেতে আগে লটারির মতো টানাটানি করতে হতো। একজন ট্রলি পেতেন, অন্যজন পেতেন না। অথচ এখন দুই দফায় ৩০০টি নতুন ট্রলি যুক্ত করা হয়েছে। তার মতে, এই উদ্যোগই প্রমাণ করে যে বিমানবন্দরে ট্রলি ব্যবস্থাপনায় দুর্বলতা ছিল।
এ ছাড়া লাগেজ কাটা ও চুরির অভিযোগের পর গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিং কর্মীদের শরীরে বডি ক্যামেরা সংযুক্ত করা হয়েছে। বর্তমানে যাত্রীরা ১৫ থেকে ২০ মিনিটের মধ্যে লাগেজ হাতে পাচ্ছেন বলেও উল্লেখ করেন তিনি।
মেজর আখতারুজ্জামানকে ধন্যবাদ জানিয়ে ডা. শফিকুর রহমান বলেন, তার প্রতিবাদের সুফল এখন বিমানবন্দরের যাত্রীরা পাচ্ছেন। দীর্ঘদিন ধরে ভোগান্তির শিকার হওয়া মানুষ এখন কিছুটা স্বস্তি পাচ্ছেন।
একজন বীর মুক্তিযোদ্ধার বিরুদ্ধে মামলা, গ্রেপ্তার, রিমান্ড এবং নিম্ন আদালতে চোখ বেঁধে, হেলমেট ও সেফটি জ্যাকেট পরিয়ে হাজির করার ঘটনাকে লজ্জাজনক বলে মন্তব্য করেন জামায়াত আমির। তিনি বলেন, এসব ঘটনায় একের পর এক অবমাননাকর পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। অথচ যাদের লজ্জিত হওয়ার কথা, তাদের মধ্যে কোনো অনুশোচনা দেখা যাচ্ছে না।
মেজর আখতারুজ্জামানের গ্রেপ্তারের পর দেশবাসী ও প্রবাসীদের সহানুভূতি, সমর্থন ও ভালোবাসার জন্য কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন তিনি। বিশেষ করে প্রবাসীদের ধন্যবাদ জানিয়ে বলেন, জামায়াতে ইসলামী ও দেশের মানুষ প্রবাসীদের পাশে রয়েছে। সত্যের বিজয় না হওয়া পর্যন্ত তাদের লড়াই অব্যাহত থাকবে।
কারামুক্তির পর যা বললেন মেজর আখতারুজ্জামান
সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে মেজর (অব.) আখতারুজ্জামান দেশবাসীকে ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা জানিয়ে বলেন, তিনি কেন কারাগারে গিয়েছেন, সেটি বড় বিষয় নয়। অন্যায়ের প্রতিবাদ করলে কারাবরণ করতে হতে পারে, সেটাই স্বাভাবিক। তবে তার কারাবাসের মধ্য দিয়ে বর্তমান সরকারের ভেতরের চিত্র এবং প্রতিহিংসার রাজনীতি প্রকাশ পেয়েছে।
তিনি বলেন, বিমানবন্দরে প্রবাসীদের সঙ্গে দুর্ব্যবহার, অব্যবস্থাপনা ও দীর্ঘদিনের ভোগান্তির প্রতিবাদ করেছিলেন। এ কারণে সরকার তাকে গ্রেপ্তার করতে পারে, এমনকি মামলা করতেও পারে। কিন্তু ঘটনার পরদিন মালপত্র বাড়িতে পৌঁছে দেওয়ার পর গভীর রাতে তার বিরুদ্ধে মামলা দায়েরের বিষয়টি নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।
মেজর আখতারুজ্জামান বলেন, ঘটনার পরদিন সন্ধ্যা সাড়ে ৫টার দিকে গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) সদস্যরা তার বাসায় যান। অথচ মামলার নথি আদালতে জমা দেওয়ার পর আদালত তদন্ত করে প্রতিবেদন দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছিলেন। এ অবস্থায় ডিবি কেন তার বাসায় গেল, তা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন তিনি।
তিনি জানান, ডিবি যাওয়ার প্রায় এক ঘণ্টা আগে জামায়াত আমির তাকে ফোন করে মামলার বিষয়ে খোঁজখবর নিয়েছিলেন এবং আদালতে হাজির হওয়ার পরামর্শ দিয়েছিলেন। তবে তিনি জানিয়েছিলেন, প্রয়োজনে গ্রেপ্তার হবেন, কিন্তু আত্মসমর্পণ করবেন না।
ডিবি সদস্যরা বাসায় যাওয়ার পর তাদের সঙ্গে কথোপকথনের বর্ণনা দিয়ে তিনি বলেন, একাত্তরে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীও তাদের দমাতে পারেনি, এখন ডিবি-পুলিশ কীভাবে দমাবে। এ সময় তার বাসায় বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার ছবি দেখে ডিবি সদস্যরা প্রশ্ন করেছিলেন, তিনি কেন দল ছেড়েছেন।
মেজর আখতারুজ্জামান বলেন, তিনি গ্রেপ্তারি পরোয়ানা দেখতে চেয়েছিলেন। পরে ক্যান্টনমেন্ট থানার ওসি তাকে ডিবি কার্যালয়ে যাওয়ার কথা বলেন। শেষ পর্যন্ত মাগরিবের আজানের পর তাকে গাড়িতে তুলে ডিবি কার্যালয় এবং সেখান থেকে বিমানবন্দর থানায় নেওয়া হয়।
রিমান্ডে নেওয়া এবং চোখ বেঁধে জামায়াতে ইসলামী সম্পর্কে বিভিন্ন প্রশ্ন করার বিষয়েও ক্ষোভ প্রকাশ করেন তিনি। তার প্রশ্ন, একটি রাজনৈতিক দলের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে তথ্য জানার অধিকার পুলিশকে কে দিয়েছে?
প্রবাসীদের অধিকার আদায়ে কাজ চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দিয়ে মেজর আখতারুজ্জামান বলেন, জামায়াত আমির তাকে এ বিষয়ে কথা বলার অনুমতি দিয়েছেন। প্রবাসীদের সহযোগিতায় ঢাকা মহানগর উত্তর এলাকায় একটি রিসেপশন সেন্টার স্থাপনের পরিকল্পনাও রয়েছে।
তিনি জামায়াতে ইসলামী, দলের আমির এবং তার পাশে দাঁড়ানো দেশবাসীর প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন। বক্তব্যের শেষ পর্যায়ে তিনি বলেন, আল্লাহর শাসন ও ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠিত হবেই, ইনশাআল্লাহ।
নেতাকর্মীদের ফুলেল সংবর্ধনা
অনুষ্ঠানে জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ারসহ কেন্দ্রীয় ও মহানগর পর্যায়ের নেতারা উপস্থিত ছিলেন।
এর আগে মঙ্গলবার সকাল ১০টার দিকে কেরানীগঞ্জ কেন্দ্রীয় কারাগার থেকে জামিনে মুক্তি পান বীর মুক্তিযোদ্ধা মেজর (অব.) আখতারুজ্জামান।
কারামুক্তির পর তাকে ফুল দিয়ে শুভেচ্ছা জানান জামায়াতের কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদ সদস্য ও ঢাকা মহানগরী উত্তরের আমির মোহাম্মদ সেলিম উদ্দিন, কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদ সদস্য মোবারক হোসেন, ঢাকা মহানগরী দক্ষিণের সেক্রেটারি ও সংসদ সদস্য ড. শফিকুল ইসলাম মাসুদ, ঢাকা মহানগরী উত্তরের সহকারী সেক্রেটারি মাহফুজুর রহমান, ঢাকা জেলা আমির দেলোয়ার হোসেন, ঢাকা দক্ষিণের সহকারী সেক্রেটারি ও সংসদ সদস্য কামাল হোসেন, সংসদ সদস্য জয়নাল আবেদীন, উত্তরের প্রচার ও মিডিয়া সম্পাদক আতাউর রহমান সরকার এবং আইনজীবী রুকন রেজাসহ বিভিন্ন পর্যায়ের নেতারা।
অনুষ্ঠানে মেজর (অব.) আখতারুজ্জামান ছাড়াও মোহাম্মদ সেলিম উদ্দিন, মোবারক হোসেন ও ড. শফিকুল ইসলাম মাসুদ বক্তব্য দেন।







