১৯৮৪ সালের ৩১ মে পার্বত্য চট্টগ্রামের ভূষণছড়ায় সংঘটিত গণহত্যা বাংলাদেশের ইতিহাসে এক ভয়াবহ ও কলঙ্কিত অধ্যায়। শাবান মাসের শেষ রাতে ফজরের অপেক্ষায় থাকা গ্রামবাসীর উপর নেমে আসে মৃত্যুর বিভীষিকা। ভোর চারটা থেকে সকাল সাড়ে আটটা পর্যন্ত টানা চার ঘণ্টা চলতে থাকে হত্যাযজ্ঞ—নারী, শিশু, বৃদ্ধ কেউ রক্ষা পায়নি। ঘরবাড়ি জ্বালিয়ে দেওয়া হয়, লাশ ফেলে রাখা হয় অরক্ষিতভাবে, বহু পরিবার পুরোপুরি নিশ্চিহ্ন হয়ে যায়।

প্রত্যক্ষদর্শী সাংবাদিকরা ঘটনাস্থলে পৌঁছে যে ভয়ঙ্কর দৃশ্য দেখেছিলেন তা ভাষায় প্রকাশ করা কঠিন। তিন দিন পরও গ্রামে ছড়িয়ে–ছিটিয়ে ছিল শত শত মৃতদেহ। অনেক লাশ কুকুর–শেয়ালের দ্বারা ক্ষতবিক্ষত, অনেক নদীতে ভাসমান। কিছু গণকবর খোঁড়া হচ্ছিল, আর কিছু লাশ দগ্ধ হয়ে ছাই হয়ে গিয়েছিল। সাংবাদিক সৈয়দ মুরতজা আলি তাঁর বিখ্যাত রিপোর্ট Massacre at Dawn–এ লিখেছিলেন, “এক তরুণীর মস্তকহীন দেহ কোলে মৃত শিশু নিয়ে পড়ে ছিল, আরেক শিশুর দুই হাত কেটে নেওয়া হয়েছে, সাত দিনের এক নবজাতককে বেয়নেট দিয়ে হত্যা করা হয়েছে পিতামাতার সামনে।”
গবেষকরা বলছেন, ওইদিন অন্তত চার শতাধিক বাঙালি খুন হয়েছিল। অনেক বডি বিকৃত করা হয় এমনভাবে যে আর শনাক্ত করার উপায় ছিল না। ৩০০–এর বেশি পরিবারে কেউ না কেউ নিহত হয়, শতাধিক পরিবার সম্পূর্ণ নিশ্চিহ্ন হয়ে যায়।
অভিযোগের আঙুল তোলা হয়েছে চাকমা শান্তিবাহিনীর দিকে এবং প্রত্যক্ষ নেতৃত্বে ছিলেন তৎকালীন ফিল্ড কমান্ডার মণি স্বপন দেওয়ান, যিনি পরে বিএনপির এমপি ও মন্ত্রীও হন। প্রত্যক্ষদর্শীরা বলছেন, গণহত্যা শুরু করার প্রথম গুলিটি তিনিই চালিয়েছিলেন। অথচ এই ভয়ঙ্কর অপরাধীর কখনও বিচার হয়নি, বরং তিনি এখনও রাজনীতিতে সক্রিয়।
ভূষণছড়ার গণহত্যা নিয়ে আজ পর্যন্ত কোনো মামলা হয়নি, হয়নি রাষ্ট্রীয় কোনো তদন্ত বা বিচার। পরিবারগুলো বছরের পর বছর ধরে বঞ্চিত থেকেছে ক্ষতিপূরণ ও ন্যায়বিচার থেকে। বরং শান্তিচুক্তির মাধ্যমে খুনিদের দেওয়া হয়েছে রেশন, ব্যাংক ঋণ ও সরকারি সুবিধা। নিহতদের পরিবারগুলোর প্রশ্ন— তাদের প্রিয়জনদের রক্তের মূল্য কি শুধুই পাঁচ হাজার টাকা আর এক বস্তা চাল?
বিশ্লেষকরা বলছেন, ভূষণছড়া হত্যাযজ্ঞ বাংলাদেশের স্বাধীনতার পর সবচেয়ে বড় বাঙালি গণহত্যা, কিন্তু এ নিয়ে রাষ্ট্রের নীরবতা ও বিচারহীনতা ইতিহাসকে কলঙ্কিত করে রেখেছে। শান্তিচুক্তিকে তাঁরা ‘অন্যায়কে প্রশ্রয়’ হিসেবে আখ্যা দিয়েছেন।
ন্যায়বিচারবিহীন এই গণহত্যা কেবল ভুক্তভোগী পরিবার নয়, পুরো জাতিকে আজও তাড়িয়ে বেড়াচ্ছে। ক্ষতিগ্রস্তরা বলছেন, “মণি স্বপন ও তার সহযোগীদের বিচার না হওয়া পর্যন্ত কোনো শান্তি নেই।”







